সড়কে আর কত মৃত্যুর মিছিল

17

এম এইচ নাহিদঃ সড়ক যেন এক মৃত্যুপূরী। আর এই মৃত্যুপুরীর দানব বেপরোয়া চালক। এই দানবের দৌরাত্ম্য অসহায় মানুষ। প্রতিদিনই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছেন নতুন প্রাণ। শিশু থেকে তরুণ, যুবক থেকে বৃদ্ধ কেউই বাদ যাচ্ছে না ঘাতকদের মৃত্যুফাঁদ থেকে। বাড়ি থেকে বের হলে নিরাপদে আবার বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা নেই কারই। কেবল যাত্রা পথেই নয়, প্রাণ দিচ্ছেন পথচারিও। নিরাপদে রাস্তা হাঁটার নিশ্চয়তা নেই। এই বুঝি দুই চালকের অসুস্থ নোংরা প্রতিযোগিতায় প্রাণটা গেল। আবার না জানি কোন বেপরোয়া গতির দানব এসে জীবন প্রদীপই নিভিয়ে দেয়। এই রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রতিদিন রাস্তায় বের হচ্ছেন কর্মব্যাস্ত মানুষ, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকবেই না বা কেনো ? প্রতিদিন প্রতি মহুর্তেই তো সড়কে মৃত্যু অতবা পুঙ্গত্ব বরণ করতে হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। এইতো মাত্র ক’দিন আগে রাজধানী ঢাকায় বিমানবন্দর গোলচক্করে বিআরটিসির বেপরোয়া একটি বাস মাথা পিষে কেড়ে নিলো পাঠাও’র এক মোটরসাইকেল যাত্রীর প্রাণ। তার আগের দিন মিরপুরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিইউবিটির ছাত্রকে চাপা দিয়ে হত্যা করে দিশারী পরিবহনের একটি বাস। সেই ঘটনার আগের দিন বনানী-কালশী ফ্লাইওভারে বাস চাপায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্র প্রাণ হারান। গত মাসের শেষদিকে মহাখালী ফ্লাইওভারে এক এমপির স্ত্রীর গাড়িতে চাপা পড়ে প্রাণ হারান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক চালক। ওই এমপি’র গাড়ি চালাচ্ছিলেন তারই প্রবাসী পুত্র। কয়েক মাস আগে দুই বাসের রেষারেষিতে কলেজ ছাত্র রাজীবের একহাত বিচ্ছিন্ন এবং পরে তার করুণ মৃত্যু কথা এখনো ভুলেন নাই কেউ। ওই মৃত্যুতে কেঁদেছেন রাজিবের চিকিৎসক, কেঁদেছেন দেশবাসি। কেবল কাঁদে নি ঘাতক চালক আর তাদের প্রশ্রয় দেয়া মালিকরা। তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ঢাকাসহ সারাদেশের সড়কে দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। তবে এই মৃত্যুর মিছিল আরো পুরোনো। সাম্প্রতিক সময়ে তা ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। এবারে ঈদ আনন্দ বহু পরিবারেই নিরানন্দে পরিণত হয়েছে। ঈদ খুশিতে আনন্দের পরিবর্তে এসব পরিবারে কান্নার বন্যা বইছে। তাদের সে শোক এখনো কাটে নি।
এভাবে সড়ক দুঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ২ হাজার ৩৫৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৭১ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩১৭ নারী ও ৩২৬ শিশু। একই সময়ে ৩৬৮ নারী ও ১৬৮ শিশুসহ আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৯৭৫ জন। জাতীয় মহাসড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এসব প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা ঘটে। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের চিত্র এই জরিপের বাইরে। বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা আরো বেশি।
ঈদ যাত্রায় যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানকে অস্বীকার করেছে সংগঠনটি। এবারের ঈদ-যাত্রায় ১৩ দিনে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত ও ১,২৬৫ জন আহত হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তাদের এই তথ্য মিথ্যে বলছে এনসিপিএসআরআর। তবে তাদের পরিসংখ্যান যাই হোক সড়কে হাজারো প্রাণের মৃত্যু মিথ্যে নয়।
এই মৃত্যুর দায় নিচ্ছে না কেউই। প্রতিদিন-প্রতিমূহুর্তে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেও কেই সড়কে নিরাপদ যাত্রার দায়িত্ব নিচ্ছে না। নেই জীবনের গ্যারান্টি। এ এক অদ্ভ’ত বাংলাদেশ। যে দেশে সড়কের নিরব ঘাতক পরিবহন চালক। আর এই ঘাতকদের কাছে জিম্ম সাধারণ মানুষ। চালক,পরিবহন শ্রমিক ও মালিকপক্ষের নিকট অশহায় সরকার ও সংশিøষ্ট মন্ত্রণালয়। মালিক- শ্রমিকদের ভয়ে তাদের মুখে তালা। তাইতো দুর্ঘটনায়
মৃত্যু নয়, নিরব হত্যার পরেও তাদের কিছুই হচ্ছে না। কদিন পরেই আবার ঘটায় নতুন দুর্ঘটনা। প্রাণ যায় মানুষের। কান্নায় বুক ভাসায় স্বজনরা।