আগাম বন্যার আশংকা

1

যুগবার্তা ডেস্ক ॥ বন্যার পদধ্বনি সারাদেশে। ক্রমেই ফুঁসে উঠছে নদ-নদীর পানি । প্রবলবেগে ধেয়ে আসা বন্যার পানি প্রবাহের শব্দে কাঁপছে মানুষের বুক। দিন দিন বাড়ছে সেই কাঁপন আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বন্যা বিশ্লেষকরা বলছেন এবারও রয়েছে বড় বন্যার আশংকা। ভারি বর্ষণ আর উজানের ঢল তারই ঈঙ্গিত দিচ্ছে।
উত্তর থেকে পূর্ব কিংবা দক্ষিণ থেকে পশ্চিম-সর্বত্র শোনা যাচ্ছে বন্যার পদধ্বনি। বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে মধ্যাঞ্চল। গত মাসে উজানের ঢলে পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ-মৌলভীবাজারে ব্যাপক বন্যা হয়। তার ক্ষয়ক্ষতির দাগ এখনো শুকায় নি। গৃহহারা পরিবারগুলো বাড়ি না ফিরতেই আবারও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সুনামগঞ্জে সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি ক্রমশ বাড়ছে। বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বান্দরবানের সাঙগু নদীর পানি। উত্তরে বাড়ছে প্রায় সব নদীর পানি। কোথাও কোথাও তা বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চরাঞ্চলে পানি প্রবেশ করছে। কুড়িগ্রামে তিস্তা ছাড়াও ধরলা, দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত গতিতে বাড়ছে। প্লাবিত হয়েছে নদী পারের চরগুলোর নিম্নাঞ্চল। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা পানি বৃদ্ধিতে বন্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে মধ্যাঞ্চলেও। টানা বর্ষণ আর উজানের ঢলে এই বন্যা হচ্ছে। এটা অব্যাহত থাকলে এবারেও বন্যা ভয়াবহ রুপ নিবে। ইতোমধ্যে পানি বন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। অনেক স্থানে কাঁচা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ভেঙ্গে পড়েছে যাতায়াত ব্যবস্থা। তলিয়ে যাচ্ছে পটল, ঢেঁড়শ, মরিচ শসাসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেত। উত্তরের চরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে। এই অঞ্চলের বেশকিছু এলাকার ঘরবাড়ি এখন পানির নিচে। বন্যা আক্রান্ত পরিবারগুলো সবকিছু ফেলে জীবন বাঁচাতে ছুটছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের লক্ষণ এখনও দেখা না গেলেও অচিরেই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু স্থানে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও নতুন বিপদ ভাঙনের মুখে পড়ছে নদী পারের মানুষ। যারা এখনো ভাঙনকবলিত এলাকায় রয়েছে তারা আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙনের ভয়ে অনেকেই কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত। ভিটেমাটি হারা এসব পরিবারের চোখের পানি থামছে না। বানের জল আর চোখের জল একাকার।
ভয়াবহ বন্যার আশংকা দেখা দিলেও পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের প্রস্তুতি ও তৎপরতা তেমন চোখে পড়ছে না। এখনো বন্যাদুর্গত এলাকায় তেমনভাবে শুরু হনি ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। বন্যা পরবর্তী জরুরি সার্ভিসসমূহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে কিনা তাও জানা যাচ্ছে না। পরিকল্পনাও কত দূর তা নিয়ে রয়েছে ধোয়াশা। বন্যাজনিত সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হলেও পানি উনśয়ন বোর্ডের তোড়জোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
এলোমেলো আবহাওয়ার ˆবরী আচরণ অব্যাহত রয়েছে। যার সক্রিয় বিরƒপ প্রভাব শুরু গত মার্চ মাস থেকে। বাংলাদেশে এবার মৌসুমি বায়ুর আগমনও বেশ আগেভাগে হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে চলতি জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ) মাসে ঢল-বন্যা অব্যাহত থাকার এবং আরো কিছু এলাকায় বন্যা বিস্তৃত হওয়ার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞমহল। তাদের আশংকা এরই মধ্যে সত্যি হতে চলেছে। সারাদেশেই বন্যা শুরু হয়েছে। ক্রমেই তা বাড়ছে। কোথাও কোথাও ভয়াবহ রুপ নিচ্ছে। উত্তরে কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ধরলা নদীর পানি কমলেও এখনো বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের পানি বাড়ছেই। এসব নদীর অববাহিকায় ৩০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম, চর গ্রাম ও দ্বীপচর প্লাাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে আছে ৬০ হাজার পরিবার। ৩৪৪টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিনś এলাকায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। গাইবান্দায় নদী পাড়ের আড়াই শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙনের মুখে আরো বেশ কিছু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। ভিটেমাটি হারা এসব পরিবারের চোখের পানি থামছে না। নিঃস্ব রিক্ত কয়েক শ মানুষ সব হারিয়ে ছুটছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দিকে। তাদের ক্ষোভের তীর ছুটছে গাইবান্ধা পানি উনśয়ন বোর্ডের দিকে।
রংপুরের তিস্তাপারে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও চরাঞ্চলের পরিবারগুলোর দুর্ভোগ পিছু ছাড়ে নি। তিস্তার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হওয়ার আতংকে লোকজন ঘড়বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জেলার গঙ্গাচড়ার ২৭টি চরগ্রামের প্রায় সাত হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
বন্যাকবলিত এলাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। বন্ধ হয়েগেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কারণ অনেক এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। অফিস-আদালতের কাজকর্মও কোথাও কোথাও বন্ধ রয়েছে। এভাবে ভারি বর্ষণ আর উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে বন্যার পানি বাড়বে ˆব কমবে না। ফলে বিগত বছরের ন্যায় এবারেও ভয়াবহ বন্যার আশংকা রয়েছে। সেই ভয়াবহতা মোকাবেলায় সরকার ও সংশিøষ্ট মন্ত্রণালয় কতটা প্রস্তুত সেই প্রশś সকলের মনে। জনজীবনে দুর্ভোগ যাতে না বাড়ে, ঘরবাড়ি-ফসলি জমি ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি কম হয় তার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে খুব দ্রুত। এখনই পদক্ষেপ নেয়া না হলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। বন্যার প্রকোপে মানুষ ও গোবাদি পশুর মৃত্যু রোধ কঠিন হবে। তাই বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্টরা দ্রুত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে এটাই প্রত্যাশা করছেন বন্যা কবলিত ও ঝুঁকিপ্রবণ এলাকার মানুষ।