ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কি সাহারা মরুভূমি!

9

যুগবার্তা ডেস্ক ॥ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু দখল-দূষণে বিপর্যন্ত বাংলাদেশের নদীগুলো। সাথে রয়েছে প্রতিবেশি দেশগুলোর নদীর পানি প্রবাহ নিয়ে ˆবরি আচরণ। ভাটির দেশ হওয়ায় প্রধান নদীগুলোতে প্রতি বছর ১২০ কোটি ঘনমিটার পলি প্রবাহিত হয়। এর বড় অংশই নদীর তলদেশে জমে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করছে। ৪৭ বছরে নদীগুলোতে পলি জমেছে প্রায় ১৭৮ কোটি টন। ’৭১-এর আগে এ দেশে নদী পথের ˆদর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার। এখন সে ˆদর্ঘ্য পাঁচ হাজারেরও নিচে নেমে এসেছে। নদ-নদী খনন না করায় পলি পড়ে অস্তিত্ব হারাচ্ছে নদীগুলো। ইতোমধ্যে পলির কারণে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৩০০ নদী। অস্তিত্ব সংকটের মুখে বাকি অধিকাংশ নদীই। পলি জমে কমপক্ষে আরো ৯৫টি নদী বিলুপ্তির অপেক্ষায় ধুঁকছে। একদিকে উজানে পানি প্রত্যাহার, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে নদীখেকোদের অবৈধ দখলবাজি, ভরাট এবং অপরিকল্পিতভাবে নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে দেশের অধিকাংশ নদীবক্ষ ধু ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে। নদ-নদীর এমন বেহাল দশায় নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ভূ-প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আশংকা রয়েছে।
নদীর নাব্যতা হারানো, শুকিয়ে যাওয়া অথবা মারাত্মক দূষণ প্রক্রিয়া দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, জীববৈচিত্র্য, নৌপরিহন ব্যবস্থা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি। বাংলাদেশের সীমান্ত নদীগুলো এখন ভয়াবহ আগ্রাসনের শিকার। এসব নদীর উজানে বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। আর বাঁধের কারণে বিপর্যয় নেমে এসেছে ভাটির বাংলাদেশে। সীমান্ত নদী উজানে বাধার কারণে শুকনো মৌসুমে প্রবাহহীন হয়ে পড়ে। বর্ষায় স্লুইসগেটগুলো খুলে দিলেই দু’কূল ছাপিয়ে বন্যা দেখা দেয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফলে এদেশের মানুষ যেমন পানিতে মরে, তেমনি নদীর পানিশূন্যতায় ধুকে। দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অববাহিকা বাদে গঙ্গা-পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা- এ তিন প্রধান নদীর অববাহিকাতেই বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে এই নদীগুলোর সীমান্ত গতিপথে প্রতিবেশি দেশগুলো বাধা প্রয়োগ করলে এদেশে মারাত্মক সĽট সৃষ্টি হয়। তা বর্ষায় হোক কিংবা খরায়।
লবণাক্ততা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে সুন্দরবনসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর ও রাজশাহী অঞ্চলে দেখা দিয়েছে খাবার পানির ভয়াবহ সংকট। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। মরুভূমি হতে চলেছে রাজশাহী অঞ্চলসহ গঙ্গা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশ। উজানে বাঁধ ও ছোট ছোট ব্যারাজ নির্মাণ করেছে ভারত। এর ফলে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় অঞ্চলের নদীগুলো এখন ধু ধু বালুচর, নয়তো মরা গাড়। লালমনির হাটে তিস্তা ব্যারাজের ভাগ্য নির্ভর করছে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ওপর। জানা যায়, ব্রহ্মপুত্রের উৎসমুখে বাঁধ দেয়ার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে চীন। চীন ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী শুকনো মৌসুমে প্রবাহহীন হয়ে পড়ার আশংকা বেশি।
মেঘনা নদীর পানি প্রবাহের মূল উৎস বরাক নদী। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলসীদ সীমান্তে বরাক দুটি ভাগ হয়ে সুরমা-কুশিয়ারা নাম নিয়েছে। অমলসীদের ১০০ কিলোমিটার উজানে মণিপুর রাজ্যের টিপাইমুখ নামক স্থানে বরাক নদীতে বাঁধ নির্মাণ করছে ভারত। ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ ও ফুলেরতল ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুকিয়ে যাবে পূর্বাঞ্চলে নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়গুলো। কুমিল্লার কাছে গোমতি ও হাওড়া নদীর উজানেও বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশে নদীর অস্তিত্বই খুজে পাওয়া কঠিন হবে। সে সাথে এদেশের নদীখেকোরা দাপটের সাথে চালাচ্ছে নদী দখল ও দূষণ। যেনো দেখার কেউ নেই। যে সব শহরের ভিতর কিংবা পাশ দিয়ে নদী আছে তা বেশির ভাগই এখন মৃত। প্রথমে বর্জ্য ফেলানো হয় এর পর নির্মাণ করা হয় স্থায়ী স্থাপনা। নদী হয়ে যায় গতিপথ শূন্য। নদ-নদী খননে প্রায়ই কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও তাতে জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ঘটছে। ড্রেজিং করে নদীর গভীরতা বাড়ানোর বদলে কর্তাব্যক্তিদের পকেট পূর্তি আসল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠায় প্রায় প্রতিটি প্রকল্প প্রহসনে পরিণত হয়।
এ হুমকি মোকাবিলার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আমাদের সার্বিক অর্জন, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। যৌথ নদী কমিশনকে সক্রিয় করতে হবে। অভ্যন্তরীণ নদী দখল ও দূষণরোধের সরকারি তৎপরতায় আরো বাড়াতে হবে। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় কঠোর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। দখলমুক্ত নদী তীর সংরক্ষণের জন্য নদী তীরবর্তী এলাকা দখলমুক্ত রাখতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে অথবা সামাজিক বনায়নের আওতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নদী দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা দ্রুত করা দরকার। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশন রয়েছে। দেশকে বাঁচাতে হলে নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। দেশিয় নদীখেকোদের হাত থেকে নদী দখলমুক্তকরা, নাব্যতা ফেরাতে ডেজ্রিং এবং পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে কার্যকর এবং কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ মহা সংকটে পড়বে। কয়েক কোটি মানুষ ভয়Ľর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ হতে পারে নতুন সাহারা মরুভূমি। হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুনতে হবে একদা এদেশে নদী ছিলো। সেই ভয়াবহতার আগেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিবেন-এ প্রত্যাশা দেশবাসির, এ প্রত্যাশা আমাদের।