বিষণ্ন রাশিয়া

2

পবিত্র কুন্ডু, মস্কো থেকেঃ সামারা থেকে মস্কোর দমোদেদোভো বিমানবন্দরে নামতেই জড়িয়ে ধরল বৃষ্টি। বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়েই বৃষ্টির আলিঙ্গন, শাটল বাসে উঠতে উঠতেই ভিজে একশা

বৃষ্টির সঙ্গে বিষণ্নতার যোগ থাকে। বৃষ্টি কখনো কখনো কান্নার প্রতীক। আগের রাতে সোচিতে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হৃদয়ভাঙা পরাজয়ের পর রাশিয়াও কাঁদছে। বিমানবন্দরে সব শ্রেণির কর্মীদের মধ্যেই কেমন থমথমে ভাব। কাজে কর্তব্যের দায়বদ্ধতা, কেমন যান্ত্রিক তৎপরতা। মুখগুলো থমথমে। রুশদের মুখে যে আগেও হাসি লেগে থাকত এমন নয়, তবে রাশিয়ার স্বপ্নযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে গাম্ভীর্যের মুখোশটা সরে গিয়েছিল।

তানিয়া নামের পরিবহন স্বেচ্ছাসেবী যে মেয়েটি লুঝনিকিগামী শাটলের দিকে নিয়ে এল, তার পা আড়ষ্ট। জিজ্ঞেস করি, মন খারাপ? বিষণ্ন সেতারের কোনো একটি তারে যেন ছোঁয়া পড়ল, ‘ভীষণ মন খারাপ। সারা রাত কেঁদেছি। ঈশ্বরকে বলেছি, আমাদের তো খুব বেশি আশা ছিল না। এত দূর এনে কেন কোয়ার্টার ফাইনালেই শেষ করে দিলে!’

আন্দ্রেই নামের এক তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে পরিচয় সেন্ট পিটার্সবার্গে। তাঁর শ্বশুরের নামও আন্দ্রেই। শ্বশুর-জামাতা যাঁর যাঁর চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে খেলা দেখে বেড়ান দুই বন্ধুর মতো। এর আগেও তিনটি ম্যাচ দেখেছেন, সোচিতে গিয়েছিলেন রাশিয়ার ইতিহাস গড়া দেখবেন বলে। এবার সঙ্গী আন্দ্রেইর মেয়ে এবং আন্দ্রেইয়ের স্ত্রী আলিসেশোঙ্কোও। হোয়াটসঅ্যাপে ছোট আন্দ্রেই খেলার আপডেট দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেনিস চেরশেভের গোলে রাশিয়া এগিয়ে যেতে আন্দ্রেইয়ের বার্তা, ‘কোনো দলই রাশিয়াকে এত সহজে ঘরে ফেরাতে পারবে না।’ ক্রোয়েশিয়া পেনাল্টি শুটআউটে জিতে যাওয়ার পর আন্দ্রেইয়ের বার্তা, ‘একি হলো! আমি কখনো কাঁদি না। কিন্তু আমার চোখেও জল। আমার স্ত্রীকে গ্যালারি থেকে নিয়ে যেতে পারছি না। শুধু কাঁদছে আর কাঁদছে।’

শুধু আন্দ্রেই আর আলিসেসোঙ্কো কেন, গোটা রাশিয়াই ৭ জুলাই কেঁদেছে। এখনো কাঁদছে। ভেতরে ভেতরে। সোচি থেকে সামারা, সামারা থেকে কাজান, কাজান থেকে মস্কো। কান্নার রং লাল-নীল-সাদা।

এমনিতে নিরাবেগ রুশ জনমানসে ফুটবল অদ্ভুত এক মায়ার জাল বিছিয়েছিল হঠাৎ করেই। এরা ‘রাশিয়া’ ‘রাশিয়া’ বলে স্লোগান দিতে শিখেছিল। এরা লাল-নীল-সাদা পতাকা গায়ে জড়িয়ে পথ চলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। একটা স্বপ্নমাখা পথ হঠাৎ করেই এসে দাঁড়িয়েছিল সামনে। সেই পথটা হারিয়ে গেল।

মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা রাত কান্নাকাটি চলেছে রাশিয়ার পরাজয়ে। ক্রোয়েশিয়ার জয়ের উল্লাসের সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তায় জাতীয় সংগীত স্তব্ধ হয়ে গেছে জনতার কণ্ঠে, ড্রামের বিট গেছে থেমে।

রুশ মিডফিল্ডার জবনিন সেদিন বলেছিলেন, রাশিয়া যে এত দূর এগোল, এটির শতকরা ৯৫ ভাগই রুশ ভক্তদের অবদান। সবার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা পেয়েই দল হয়েছে উদ্দীপ্ত। শেষ আটে স্বপ্নভঙ্গের পর রাশিয়ার কোচ স্তানিস্লাভ চেরচেশভ প্রথমেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন সমর্থকদের।

আসলেই কি তাই? প্রেক্ষাপটটাই এমন ছিল যে রাশিয়া দলকে নিয়ে গ্রুপ পর্ব পেরোনোরই স্বপ্ন দেখা যেত না। একে তো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কম র‍্যাঙ্কিংয়ের দল। তার ওপর টানা সাত ম্যাচে জয়হীন থেকে মাঠে পা ফেলা। চোট আঘাতেও জর্জরিত ছিল দল। সেই দলটিই মাঠে নেমে ম্যাজিক দেখানো শুরু করল, যা সমর্থনের শক্তিতে হয় না। কিছু করে দেখাতে হয়। রুশ খেলোয়াড়েরা সেটি দেখিয়েছেন। এক হয়ে, কোচের রণকৌশলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মাঠে অনুবাদ করেছেন পারফরম্যান্স। রুশ দলটির খেলায় ছিল গতি। রক্ষণটা ছিল দুর্দান্ত। আর যে কজন খেলোয়াড় ছিলেন বলার মতো, তাঁরা সবাই জ্বলে উঠেছিলেন। যে জন্য সোভিয়েত আমলের পর নতুন রাশিয়া লাল কালির দাগ দিতে পারল অর্জনের খাতায়।

সমর্থক ও দলের খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানিয়ে কোচ বলেছেন, ‘এটা দুঃখের যে হেরে গেলাম। আমাদের আরও কিছু প্রাপ্য ছিল। আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেছি। কিন্তু যে গোল খেয়েছি, খাওয়া উচিত ছিল না। কিন্তু এটাই ফুটবল।’
চেরচেশভ একেবারে রুশবিপ্লবের নায়কদের মতো। আবেগ তাঁকে কমই ছুঁয়ে যায়, ব্যর্থতার পর তাঁর প্রথম মনে আসে কোথায় ভুলটা ছিল। রুশ কোচের আত্মসমালোচনা, ‘আবেগ দিয়ে চললে হবে না। আমরা অনেক ভুল করেছি।’ তবে শেষ পর্যন্ত সত্যটা তিনি জানিয়ে দিয়েছেন পুরো বিশ্বকেই, ‘বিশ্বকাপে আমাদের হাতে সেরা সেরা খেলোয়াড় হয়তো ছিল না। তবে আমরা ছিলাম একটি দল।’ স্থানীয় পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে পাঠকের যে মন্তব্যের মন্তাজ, তাতে বেশির ভাগই বীরের বন্দনা। তবে অনেকে বলেছেন, রাশিয়া ভালো খেলেছে, শুধু বল নিয়ন্ত্রণ ও পাসিংয়ে আরেকটু দক্ষতা দরকার, তাহলেই সামনে সুদিন।

রাশিয়ার স্ট্রাইকার আরতিয়ম জিউবা তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। ৩ গোল করে দৃষ্টি কেড়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, জিউবা যেন ছিলেন দলের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। দীর্ঘদেহী এই স্ট্রাইকার কান্না মুছে গোটা ফুটবল-বিশ্বকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘আমরা দেখিয়ে দিয়েছি রাশিয়ার ফুটবল বেঁচে আছে।’

ইউরোপে থেকেও যেমন ইউরোপের বাইরের এক অচেনা ভুবন রাশিয়া, তেমনই রাশিয়ার ফুটবলকেও পাতে তোলার মতো বিবেচনা করত না ইউরোপ। জিউবারা এই বিশ্বকাপে সেটি অন্তত দেখানোর সুযোগ পেলেন যে একদা রাশিয়ারও ফুটবল ঐতিহ্য ছিল এবং নতুন ঝান্ডা হাতে সেটি ফিরে আসছে।

১২টি স্টেডিয়ামের মধ্যে ৯টিতেই বিশ্বকাপ স্মৃতির ধুলো উড়িয়ে দিয়েছে। দুটি মাত্র স্টেডিয়ামই এখন বাকি বিশ্বকাপের প্রাণ। মস্কোর লুঝনিকি ও সেন্ট পিটার্সবার্গ। আগামীকাল সেন্ট পিটার্সবার্গ ফ্রান্স-বেলজিয়াম প্রথম সেমিফাইনালের আয়োজক, ১৪ জুলাই সেখানেই হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। ১১ জুলাই লুঝনিকিতে ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া দ্বিতীয় সেমিফাইনালের পর ১৫ জুলাই সেখানেই হবে ফাইনাল। তারপর সবকিছু থেমে যাবে। শূন্য হয়ে পড়বে বিশ্বকাপের উৎসবমঞ্চ। সেখানে থাকবে শুধু স্মৃতি। উড়বে বিজয়ীর পতাকা। কিন্তু রাশিয়ার বিশ্বকাপ একটু আগেই শেষ হয়ে গেল নিজেদের স্বপ্নরথের চাকা থেমে যাওয়ায়। গোরোবিয়োভয় গোরের ফ্যান ফেস্টে উৎসব হবে আরও চার দিন। সংগীতের তালে নাচানাচি হবে। কিন্তু রুশ জনতার প্রাণের সাড়া তাতে থাকবে না।

রাশিয়া বিষণ্ন। রাশিয়ার চোখে কান্না। তবে বাষ্পরুদ্ধ চোখ আর বিষণ্ন মুখে রাশিয়া ফুটবলের পৃথিবীকে বলে দিয়েছে আয়োজনের মতো মাঠের খেলায়ও তারা যোগ্য।-প্রথমআলো