বাণিজ্য যুদ্ধ: আরেকটি অর্থনৈতিক মন্দা আসন্ন!

7

যুগবার্তা ডেস্কঃ চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি মন্দার আশংঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন শক্তিশালী পর্যায়ে রয়েছে, তারপরেও ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পাল্টা শুল্কের হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাদের ব্যবসা নিয়ে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে বিখ্যাত মোটর সাইকেল উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান হার্লে ডেভিডসন বলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চালু হওয়া পাল্টা শুল্ক নীতির কারণে তাদের মুনাফা বছরে ১০ কোটি ডলার কমে যাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কিছু কারখানা নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাণিজ্য যুদ্ধ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি পর্যায়ক্রমে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে। ৩ হাজর ৪শ’ কোটি ডলারের চীনা পণ্যের উপর এ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর জবাবে ৫৪৫টি মার্কিন পণ্যের ওপর সমহারে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে চীন। চীন বলছে, বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য যুদ্ধের শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের উপর কর বসালে এর উত্পাদনের প্রভাব সংশ্লিষ্ট সব দেশেই পড়বে। বিবিসির সংবাদে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, যেমন, আইফোনের ডিজাইন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এটা তৈরি হয়েছে চীনে। শুধু তাই নয়, এর যে নানান যন্ত্রাংশ, সেগুলো আবার তৈরি হয়েছে জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অন্য কোনো তৃতীয় দেশে। ফলে চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব এসব তৃতীয় দেশেও পড়বে।

সিএনএস এর সংবাদ অনুযায়ী গেলো মাসে ব্যাংক অব আমেরিকার মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল মায়ার বলেছিলেন, বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব অর্থনীতি আবার মন্দার দিকে চলে যাবে। এর যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, শুল্ক আরোপের ফলে ব্যবসায়ের খরচ বেড়ে যাবে। ফলে ব্যবসায়িক আস্থাও কমে যাবে। তবে পরিস্থিতি যতটা খারাপ হবে ভাবা হচ্ছিলো তার চেয়েও বেশি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় পড়ে যাবে। তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হতে পারে। মার্কিন প্রশাসন এরই মধ্যে আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিন এবং সোলার প্যানেলের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন এবং কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মেক্সিকো থেকে আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক কার্যকর করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে চীনে মার্কিন প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্বের অবৈধ পাচার বন্ধ হবে এবং মার্কিন কর্মবাজার সুরক্ষিত হবে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মরগান স্ট্যানলি এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, মার্কিন শুল্কের ফলে এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যের শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ১ শতাংশের মতো প্রভাব পড়বে। ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরো বেশি হতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপরই উল্টো আঘাত হানতে যাচ্ছে। হার্লে ডেভিডসন জানিয়েছে, মোটরসাইকেলের জন্য ইউরোপের রপ্তানি শুল্ক ছিল ৬ শতাংশ, নতুন শুল্কারোপের সিদ্ধান্তে শুল্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশ। ফলে প্রতি বাইক রপ্তানি করতে ২২০০ ডলার বেশি খরচ হবে। কিন্তু কোম্পানিটি পাইকারি এবং খুচরা বিক্রেতাদের জন্য দাম বাড়াতে চায় না। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাদের কোম্পানি সরিয়ে নেবার চিন্তা করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের আগ্রাসী বাজার ধরার প্রক্রিয়া থামাতে ট্রাম্প প্রশাসন এই উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে হোয়াইট হাউজের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে বিভক্তিও রয়েছে। এক পক্ষ চাইছে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই বিশাল পরিবর্তন হোক। আরেকপক্ষ তাতে মৌন সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক আগ্রাসন বন্ধে এই যুদ্ধ কাম্য নয়।

এদিকে চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। বেইজিংয়ের তরফ থেকে বলা হয়, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ ডব্লিউটিও’র নীতির লঙ্ঘন। এটা বৈশ্বিক শিল্পখাতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এর কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং বহুজাতিক বিশ্ববাজারকে অস্থিরতার মধ্যে ফেলবে।

গেলো মার্চে আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক কার্যকর করার পর পাল্টা শুল্ক আরোপের কবলে পরছে মার্কিন পণ্য। বিবিসির সংবাদ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়াও। রাশিয়া চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি না করে নিজ দেশে সেই পণ্য উত্পাদন বাড়াতে। বিশেষ করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যবহূত প্রযুক্তি, তেল-গ্যাস ও খনিতে ব্যবহূত প্রযুক্তি পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি না করে নিজ দেশে উত্পাদন বাড়াচ্ছে রাশিয়া।

ইইউর সাথে জোট গড়বে চীন

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধের যে পরিস্থিতি চলছে তা সামাল দিয়ে নিজেদের বাণিজ্য সুসংহত রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করবে চীন। সম্প্রতি চীন ও ইইউর অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যে মিত্রতার আহ্বান জানিয়ে নিজেদের বাজারকে আরো উম্মুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। তবে চীনের অবরুদ্ধ বাজার এবং বৈশ্বিক বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্বেগের সঙ্গে একমত ইইউ। ফলে এ জোটবদ্ধতা আদৌ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন রয়েছে।-ইত্তেফাক