দেশজুড়ে ভুয়া ডাক্তার:খেলছে প্রাণ নিয়ে ,নির্বিকার প্রশাসন

35

রফিকুল ইসলাম জাহিদঃ রাজধানীসহ সারাদেশেরে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর স্বাস্থ্যসেবা চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। নিন্মমানের সেবা ও ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্মে সে ঝুঁকি প্রতিদিনই বাড়ছে। প্রথম শ্রেণীর অনেক হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকও ঝুঁকির বাহিরে নয়। যার কারনে চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন কমছে। রোগীর পাশাপাশি তাদের আত্মীয়স্বজনদের মনে সৃষ্টি হচ্ছে আতংক। ফলে দূরত্ব বাড়ছে চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগে ভাংচুর, শারীরিক আঘাত-প্রতিঘাত এবং মামলা-মোকদ্দমার মতো ঘটনাও ঘটছে বেশ অহরহ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখাশোনার জন্য দেশে শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায়ী। কেউ কারও দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেন না। আবেদন করলেই লাইসেন্স দেয়া হয়ে থাকে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের গুণাগুণ যাচাই করে দেখা হয় না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের চিকিৎসা সেবার মান অনেক নিচে নেমে যেতে পারে বলেও আশংকা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীসহ দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের নামে মানুষ মারার কারখানা। ওই ভুয়া চিকিৎসালয়ের চেয়ারে বসে থাকেন ভুয়া ডিগ্রীধারী ডাক্তার। ওই সব চেয়ারে বসলেই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার হয়ে যান এ্যালোপ্যাথিক। হাসপাতালের নার্স, টেকনিশিয়ান, পিয়ন, ম্যানেজার, প্রশাসক সকলেই চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখেন এবং জটিল অপারেশনে অংশ নেন। অভিযোগ উঠেছে, এক বিভাগের চিকিৎসক সব ধরনের রোগী দেখে থাকেন। এতে রোগ নির্ণয় ও প্রেসক্রিপশনে ত্রুটি রয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাসপাতালে গত কয়েকমাসের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এ সম্পর্কে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠে। পাশাপাশি সারাদেশের চিকিসার অবস্থাও প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে।
দেশজুড়ে ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তারের দৌরাত্ব্য এখন আশংকাজনক পর্যায়ে। বিভিন্ন বাহারি ডিগ্রি সংবলিত সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে নিরীহ রোগীদের প্রতারিত করছেন তারা। ফলে চিকিৎসাসেবায় চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রোগীদের জীবন। গত জুন পর্যন্ত দুই বছরে সারা দেশে ভুল চিকিৎসা ও ভুয়া ডাক্তারের কবলে পড়ে সাড়ে চার শতাধিক রোগীর করুণ মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে রাজধানীর নামিদামি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের ভুল ও গাফিলতিতে ৬৭ জন এবং ঢাকার বাইরে আরও প্রায় ৪০০ রোগী মারা যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তাদের ভুল চিকিৎসায় রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়েছে, অল্প সময়েই নিভে গেছে তাদের জীবন প্রদীপ। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) হিসেবে শুধু রাজধানীতেই আড়াই সহস্রাধিক ভুয়া ডাক্তার রয়েছে, সারা দেশে এ সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। তবে বাস্তবে বিএমডিসির দেওয়া পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি ভুয়া ডাক্তার দেশজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ভুয়া ডাক্তারের পাশাপাশি জাল ডিগ্রীধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যাও কম নয়। তারা এমবিবিএস পাসের পর নামের আগে পিছে দেশ-বিদেশের ভুয়া উচ্চতর ডিগ্রি ব্যবহার করে বছরের পর বছর রোগী দেখছেন, হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের ফি।ভুয়া ডাক্তার-দালালদের দৌরাত্ব্য, ভুল চিকিৎসা, অবহেলা আর চিকিৎসা বাণিজ্যের নির্মমতায় একের পর এক রোগী মারা যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের উদ্যোগে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অর্ধ শতাধিক ভুয়া ডাক্তারকে আটক এবং তাদের জেল-জরিমানা করা হয়।
সম্প্রতি ভুল চিকিৎসার নির্মম বলি হয়েছে সাংবাদিক রুবেলের দুই বছর বয়সী মেয়ে রাইফা। ঠান্ডাজনিত সামান্য সমস্যা থেকে হাসপাতালে ভর্তি। এরপর ডাক্তার-নার্সের হেয়ালি ইনজেকশন কেড়ে নিল আড়াই বছরের ফুটফুটে মেয়েটিকে। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে প্রায়ই মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে হাতুড়ে ডাক্তার হয়েও সাইনবোর্ডে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয়ে রাজধানীসহ সর্বত্রই প্রতারণা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে অনেকে। সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফার্মেসিতে মোবাইল কোর্টের অভিযানকালেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পরিচয়ধারী ৩১ জনকে আটকের ঘটনাও ঘটে। শতকরা ৯০ ভাগ ভুয়া ডিগ্রীধারী ডাক্তার দ্বারাই বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-নার্সিং হোমের চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে। বাণিজ্যের লক্ষ্যে ভুয়া ডাক্তাররা নামের পেছনে এফআরএসএইচ, এমএসিপি, এফআরসিপি, পিজিটি, এমডি ও এফসিপিএস (ইনকোর্স) ও পার্ট-১ অথবা পার্ট-২সহ বিভিন্ন ডিগ্রি উল্লেখ করে। শুধু তাই নয়, ভুয়া ডিগ্রির সঙ্গে লন্ডন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নামও উল্লেখ করা হয়। এ কারণে সাধারণ রোগীরা এসব ডাক্তারকে বিদেশি ডিগ্রিপ্রাপ্ত বলে মনে করেন। এ সুযোগে ভুয়া ডাক্তাররা রোগীপ্রতি ফি নেন পাঁচশ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। দেশে ভুয়া ডিগ্রির অভাব নেই, টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে সব মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের জাল সনদপত্র। এটাও অজ্ঞ-অদক্ষ চিকিৎসক সৃষ্টিতে দৃষ্টান্ত রাখছে বলে মনে করছেন বিএমডিসি কর্তৃপক্ষ। সামান্য কিছু টাকা খরচ করলেই যে কেউ হতে পারেন সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত ডাক্তার। পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত থাকলেও চলবে। খরচের পরিমাণও নাগালের মধ্যেই। ভারত বা অন্য দেশের সার্টিফিকেট পেতে ১৫/২০ হাজার টাকা খরচ করলেই হয়। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যা¤পাসঘেঁষা এলাকা থেকে এসব সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে সব মিলিয়ে ৫/৬ হাজার টাকা লাগে। ডেন্টাল কলেজের সার্টিফিকেটের জন্য চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা হলেই চলবে। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সার্টিফিকেট পেতে হলে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা গুনতে হয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন প্রদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নীরব দর্শকের ভ‚মিকায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
রাজধানীর উত্তরার একটি অভিজাত হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয়ে দায়িত্ব পালন করতেন ডা. মোহাম্মদ শহিদুর রহমান। তার ভুল চিকিৎসার বিষয়টি সন্দেহজনক হলে শহিদুর রহমানের সার্টিফিকেট যাচাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিত করে, ওই নামের কোনো শিক্ষার্থী ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেনি। অবশেষে প্রতিষ্ঠানটি স্বঘোষিত ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে বরখাস্ত করলেও আর কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শহিদুর রহমানের মতো হাতুড়ে ডাক্তার হয়েও সাইনবোর্ডে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয়ে রাজধানীসহ সর্বত্রই রমরমা প্রতারণা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। ঢাকার বিখ্যাত একটি হাসপাতালেও জাল সনদধারী ভুয়া ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদানের দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভুয়া ডাক্তারি সনদপত্র নিয়ে বিশেষায়িত ওই হাসপাতালে দীর্ঘ চার বছর ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত ছিলেন কাজী তানভীর জামান। একপর্যায়ে তার চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র অনুসন্ধানী শাখা ও মেডিকেল কাউন্সিল কাজী তানভীর জামানের সনদপত্র জাল প্রমাণ করে। এসব জাল সনদপত্রের ভিত্তিতে টানা চার বছর তিনি চিকিৎসা প্রদান করছিলেন। কুমিল্লার লাকসামে সজল কর্মকার নামে এক ভুয়া ডাক্তারকে রোগী দেখা অবস্থায় আটক করে তার ব্যবস্থাপত্র জব্দ করেন কুমিল্লার সিভিল সার্জন। খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতে র‌্যাব-৬, খুলনা, র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এইচ এম আনোয়ার পাশা এবং খুলনার সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মাসুদ সাত্তারের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্টের অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় এমবিবিএস ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পরিচয়ে রোগী দেখার সময় সাতজনকে হাতেনাতে আটক করে তৎক্ষণাৎ জরিমানা ছাড়া কারাদন্ড প্রদান করে খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। দন্ডিত ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তাররা স্বীকার করেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ সারা দেশে তাদের মতো আড়াই শতাধিক ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার রয়েছেন। তারা প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করেন এবং কৌশলে সহজ-সরল মানুষকে ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন।
র‌্যাবের এক অভিযানে ঢাকার গাবতলী থেকে মেডিকেল ডিপ্লোমা ট্রেনিং একাডেমি নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ভুয়া ডাক্তারি সার্টিফিকেটসহ মিসেস জলি (৩৫) ও ডা. মো. জাহাঙ্গীরকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ওই ট্রেনিং একাডেমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এমবিবিএস, ডেন্টাল ডিপ্লোমা, বিডিএস কোর্স, নার্সিং ডিপ্লোমা, রেডিওলজি ডিপ্লোমা ইত্যাদি কোর্সে ছাত্র ভর্তি করে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে আসছিল। শতকরা ৯০ ভাগ ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তার দ্বারাই বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-নার্সিং হোমের চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে। বিএমডিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এমবিবিএস পাস করার পর তিন বছর ট্রেনিং ও এক বছর কোর্স করার পর এফসিপিএস শেষ হয়। কিন্তু অনেক ডাক্তার এফসিপিএস পার্ট-১ শেষ হওয়ার পর তা নামের পেছনে ডিগ্রি হিসেবে সংযুক্ত শুরু করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে এফসিপিএস (চ‚ড়ান্ত পর্ব) লেখাও থাকছে নামের পেছনে। পাশাপাশি ওই ডিগ্রিধারীদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ রয়েছে তা জানা নেই দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।
ভুয়া ডাক্তাররা এমন সব পরিচয় ব্যবহার করেন, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। একইভাবে বিএমডিসি আইনে অনুমোদন করে না এরকম পদ-পদবি ও ডিগ্রির ব্যবহারও করছেন। এক্স-অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, এক্স-প্রফেসর সংযুক্তি প্রসঙ্গে বিএমডিসির সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. আবু শফি আহমেদ আমিন বলেন, এরকম কোনো পদ নেই। এটা বাণিজ্যিক প্রয়োজনে লেখা হয়। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের মেধা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে ঘাটতির কারণে এসব ঘটনা বাড়ছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হলে কথিত ওই চিকিৎসকের সনদ বাতিলের এখতিয়ার আমাদের রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হয়। এসব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে বিএমডিসি। বিএমডিসির নতুন আইনে অভিযুক্ত চিকিৎসকদের শাস্তির মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অভিযুক্তকে ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা তিন বছর জেল অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে।