এ মাসেই আসন সমঝোতার তাগিদ ১৪ দলে

4

যুগবার্তা ডেস্কঃ দু:সময়ে পাশে থাকার প্রতিদান চায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক অন্য দলগুলো। পাওয়া না পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ বিরাজ করছে তাদের মধ্যে।

দলগুলোর নেতাদের মতে, টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও বেশির ভাগ শরিক দলের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং পরে সরকার গঠনের সময় আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ অবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে মূল্যায়নের দাবি জানাবে সংশ্লিষ্ট দলগুলো। শুধু তাই নয়, আসন বণ্টন নিয়ে চলতি মাসেই তারা সমঝোতার দাবিও জানাবে। জোটের শরিক দলগুলোর বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
ওই নেতারা বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন। সব দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, এখনো আছেন। হেফাজতে ইসলামকে মোকাবেলা, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস প্রতিরোধ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে পুরোপুরি সমর্থন দিয়েছেন। রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশাকে মনোনয়ন দিয়ে পরে ফিরিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ।

ঐক্যের স্বার্থে বিষয়টি মেনে নেওয়া হয়। এরপর সব সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে শরিকরা। বিগত দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশ কয়েকটি দলকে আসন না দিয়ে অন্যভাবে মূল্যায়ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১০ বছরেও সে আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি। শরিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে তিন-চারজন ছাড়া অন্যরা উপেক্ষিতই রয়েছেন।
দলগুলোর কয়েকজন নেতা জানান, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সব সুযোগ-সুবিধা একাই ভোগ করছে আওয়ামী লীগ। শরিকদের কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না। এ নিয়ে ১৪ দলের একাধিক সভায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নেতারা। তখন আবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তা সত্ত্বেও জোটে আছেন তাঁরা। মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের পাশে থেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতেও পাশে থাকতে চান তাঁরা। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে জোটের মুখপাত্র, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম শরিক দলগুলোর সাংগঠনিক প্রয়োজনে পাশে থেকে নেতাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে তাঁরা স্বীকার করেন।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, শরিকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা জোটবদ্ধ নির্বাচন করব। তিনি ১৪ দলের শরিকদের কথা ভোলেননি, তাই এ কথা বলেছেন। ’ আসন বণ্টন নিয়ে নাসিম বলেন, ‘এটা নির্বাচনী কৌশলের বিষয়। তবে এটুকু নিশ্চিত করতে পারি, যে আসনে যে উপযুক্ত সেখানে তাকেই নমিনেশন দেওয়া হবে। ’

১৪ দলে বর্তমানে ১৩টি দল আছে। সেগুলো হলো আওয়ামী লীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, ন্যাপ, জাতীয় পার্টি (জেপি), তরীকত ফেডারেশন, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণ আজাদী লীগ, বাসদ (রেজা) ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি। বর্তমানে সংসদে আওয়ামী লীগ ছাড়া ১৪ দলের শরিক চারটি দলের ১৫ জন সংসদ সদস্য আছেন—ওয়ার্কার্স পার্টির ছয়জন, জাসদের পাঁচজন এবং জেপি ও তরীকত ফেডারেশনের দুজন করে। এ ছাড়া জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও ন্যাপের একজন করে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আছেন।

গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সংসদে যেতে পারা। অন্য কোনো মূল্যায়ন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা এবার জোটের কাছে মনোনয়নের জোরালো দাবি জানিয়েছি। ’

ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আগের দুই নির্বাচনেও আমরা বিভিন্ন আশ্বাস পেয়েছি। এবার আমাদের মূল্যায়ন কিভাবে হয় সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে আমরা পাশে থেকেছি। এখন দেখার পালা তারা কী করে। ’

বাসদের আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান বলেন, ‘জোটের প্রত্যেকটি শরিক দলের মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। আমরা আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এরই মধ্যে জানিয়েছি, আগামী নির্বাচনে সব শরিককেই আসন ছেড়ে দিতে হবে। ’

জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে দ্রুত আসন সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন। আমরা জোট নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে বিষয়টি জানিয়েছি। দ্রুত আসন সমঝোতা হলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হবে। ’

তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘আমরা একবার আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে বসেছি। সেখানে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন দ্রুত আসন সমঝোতার জন্য আবার নেত্রীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে বসা প্রয়োজন। ’

বাংলাদেশ জাসদ সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে যেন সেক্যুলার শক্তি ক্ষমতায় থাকে আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। আসন বণ্টনের বিষয়ে আমাদের প্রত্যাশার কথা আওয়ামী লীগকে জানিয়েছি। আশা করি এটার একটা যৌক্তিক সমাধান হবে। ’

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, জেপি ও তরীকত ফেডারেশনকে কয়েকটি আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ন্যাপ, সাম্যবাদী দল, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণতন্ত্রী পার্টি, বাসদ, গণ আজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টিকে কোনো আসন দেওয়া হয়নি। পরে ন্যাপকে জাতীয় সংসদে একটি সংরক্ষিত আসন দেওয়া হয়। বঞ্চিত দলগুলো আগামী নির্বাচনে একটি করে হলেও আসন চায়।

১৪ দলের শরিক দলগুলোর নেতারা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চলতি মাসের মধ্যেই আসন সমঝোতা প্রয়োজন। বেশির ভাগ দলই প্রত্যাশিত আসনের তালিকা তৈরি করেছে। এখন যে চারটি দলের ১৫ জন এমপি আছেন সে দলগুলো বর্তমান আসনগুলো ছাড়া আরো কয়েকটি আসনের জন্য দর-কষাকষি করবে। সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকা শরিকদের কেউ একটি, কেউ বা দুটি আসনের জন্য জোর দাবি জানাবে। বিশেষ করে যেসব আসনে আওয়ামী লীগের এমপিরা বেশি বিতর্কিত এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে সেই আসনগুলো শরিকদের ছেড়ে দিতে দাবি জানানো হবে।

২০০৫ সালে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২৩ দফা দাবি নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপ ও তৎকালীন বাম প্রগতিশীলদের জোট ১১ দলকে নিয়ে হয়েছিল ১৪ দল। তবে শুরুর দিকেই ১১ দলের শরিক সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি দল বেরিয়ে যায় জোট থেকে। পরে জোট ছাড়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় ১৪ দলে যুক্ত হয় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জেপি এবং নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর নেতৃত্বাধীন তরীকত ফেডারেশন।-কালেরকন্ঠ