৬ মাসে ২০৯ জন আদিবাসী ও ১২৫ পরিবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার

7

যুগবার্তা ডেস্কঃ চলতি ২০১৮ সালে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের উপর কমপক্ষে ৭০টি ঘটনায় ২০৯ জন আদিবাসী ও ১২৫ পরিবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। কাপেং ফাউন্ডেশনের ছয় মাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এই ৭০টি ঘটনারর মধ্যে ১২ জন আদিবাসী শিশু ও ২৩ আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুসহ ২০৯ জন আদিবাসী ব্যক্তি এবং ৭৪টি বাড়ি/পরিবার তল্লাসীসহ ১২৫টি আদিবাসী পরিবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। বিগত ছয় মাসে হত্যা, গণধর্ষণ, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন, অবৈধ গ্রেফতার ও আটক, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন ও অবৈধভাবে ঘরবাড়ি তল্লাসী ইত্যাদি ঘটনার প্রত্যক্ষ করা গেছে।

বিগত ছয় মাসে আদিবাসীদের অবৈধভাবে গ্রেফতার, আটক ও ঘরবাড়ি তল্লাসী ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগে আদিবাসী অধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা দায়ের বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব অভিযোগে অবৈধ গ্রেফতার, জেলে প্রেরণ, ক্যাম্পে সাময়িক আটক ও নির্যাতন, ঘরবাড়ি তল্লাসী ইত্যাদি সংঘটিত হচ্ছে। বিগত ছয় মাসে ৯৬ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তল্লাসীর কোন আইনী দলিল বা কোন অভিযোগ ছাড়াই মধ্যরাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে ৭৪টি ঘরবাড়ি তল্লাসী করা হয়েছে।

অপরদিকে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের অবস্থা খুবই নাজুক। বিগত ছয় মাসে মোট ২৩ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি ইত্যাদি শিকার হয়েছে। তার মধ্যে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ময়মনসিংহ, রাঙ্গামাটি ও ঢাকায় ২ জন আদিবাসী কিশোরীকে ধর্ষণের হত্যা ও অপর আরো ৪ নারীকে খুন, ২ জনকে দলগতভাবে ধর্ষণ, ৭ জনকে ধর্ষণ, ৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা এবং ৩ জনকে যৌন হয়রানি ও শারীরিক হামলা করা হয়। মে মাসে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড দুই আদিবাসী ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার লোমহর্ষক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া এপ্রিল ও জুন মাসে যথাক্রমে বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পৃথক দুটি ঘটনায় দুই জন ত্রিপুরা কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয়। সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনার অভিযোগ উঠেছে গত জানুয়ারি মাসে রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়িতে দুই আদিবাসী মারমা বোনের মধ্যে একবোনকে ধর্ষণ ও আরেক বোনকে যৌন হয়রানির ঘটনা। জানুয়ারিতে ঘটনার পর আজ অবধি পিতামাতাসহ তাদেরকে রাঙ্গামাটি পৌরসভার ভেদভেদী এলাকার একটি ঘরে পুলিশ প্রহরায় অনেকটা অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে।

অপরদিকে দীর্ঘ ২২ বছর পরও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমার অপহরণের কোন হদিশ মেলেনি। তাকে নিরাপত্তা বাহিনী সদস্য কর্তৃক রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ির নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নারী অধিকার কর্মীরা কল্পনা চাকমাকে অপহরণের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার উচ্চপর্যায়ে তদন্ত দাবি করেছেন।

আদিবাসীদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতল অঞ্চলে আদিবাসীদের উপর ভূমি বেদখল, উচ্ছেদ ও জাতিগত সংঘাত ইত্যাদি হরহামেশাই ঘটে চলেছে, যা আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকার উপর চরম দুর্গতি সৃষ্টি করে চলেছে। রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার নয়াহাটা মহানানাখাল আদিবাসী গ্রামের ৪০ পরিবার আদিবাসী উরাও চরম উচ্ছেদ আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। ১৭ জানুয়ারি ২০১৮ এক সংবাদ সম্মেলনে উরাও গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেন যে, ভূমিখেকো হুমকিদাতার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকার করে। অন্যদিকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার জন্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সাতগজ্যাই চাক পাড়ার চাক গ্রামবাসীর উপর অবৈধ ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র বাঙালি দুর্বত্তরা হুমকি দিয়ে চলেছে। ফলে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ চাক গ্রামবাসীরা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

আরো বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, গত বছর জুন মাসে রাঙ্গামাটি জেলার লংগদুতে অগ্নিসংযোগ ও সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার আদিবাসী পরিবারসমূহকে এখনো পুনর্বাসন প্রদান করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত তিন গ্রামের অধিবাসীরা ঝুঁপড়ি টাঙিয়ে কোন রকমে দিনাতিপাত করছে। ২০১৭ সালে ২ জুন তারিখে লংগদু উপজেলার তিনটিলা, মানিকজোড়ছড়া ও বাত্যাপাড়ায় আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে সেটেলার বাঙালিদের সংঘবদ্ধ হামলায় আদিবাসীদের কমপক্ষে ২৫০টি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে ভস্মিভূত হয় এবং এক বৃদ্ধ মহিলা আগুনে পুড়ে খুন হয়। গত ২ জুন ২০১৮ লংগদুতে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে ক্ষতিগ্রস্তরা এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী গ্রামবাসীদেরকে তাদের ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য সরকার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তারা ঝুঁপড়িতে এক দুর্বিষহ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে বলে মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন।

উল্লেখ্য যে, গত ৩ মে ২০১৮ রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা এবং তারপর দিন ৪ মে তার দাহক্রিয়ায় যাওয়ার পথে তপন জ্যোতি চাকমাসহ ৫ জন খুন হওয়ার ঘটনার পর থেকে যৌথবাহিনী রাঙ্গামাটি জেলার রাঙ্গামাটি সদর, নানিয়ারচর, বাঘাইছড়ি, লংগদু ইত্যাদি উপজেলায় অভিযান জোরদার করেছে। তারপর থেকে তিন পার্বত্য জেলায় কমপক্ষে ১৫ জনকে গ্রেফতার এবং কমপক্ষে ২৪ জনকে সাময়িক আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক ঘরবাড়ি তল্লাসী চালানো হয়েছে। ফলে জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আদিবাসী অধিকার কর্মী ও আদিবাসী সংগঠনের সদস্যদেরকে, যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের জন্য সোচ্চার, তাদেরকে অপরাধী হিসেবে পরিচিহ্নিত করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যৌথ বাহিনীর এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।