থেমে নেই গোপন জঙ্গি তৎপরতা

14

যুগবার্তা ডেস্কঃ গোপনে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে নিষিদ্ধ-ঘোষিত সংগঠনের সদস্যদের। এরই মধ্যে প্রায় ২০ জনেরও বেশি যুবক-যুবতী পথভ্রষ্ট হয়ে হিজরত (ঘর ত্যাগ) করেছে বলে তথ্য এসেছে গোয়েন্দাদের কাছে। হিজরতকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স্ট্যাটাস দিয়ে অবহিত করেছে তাদের বন্ধুদের। যদিও বেশ কিছুদিন ধরে জঙ্গিদের তৎপরতা কমে যাওয়ায় অনেকটা তৃপ্তি ঢেঁকুর তুলেছিলেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। তবে সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জে মুক্তচিন্তার লেখক ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু হত্যা, অনেক যুবকের হিজরত ও গাজীপুরের মাওনায় দম্পতি গ্রেফতারের পর বিষয়গুলো নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে গোয়েন্দাদের। এ ছাড়া নুতন করে আফগানিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইমারতে ইসলামী আফগানিস্তানের আমির শায়খুল হাদিস হেবুতুল্লাহ আখুন্দজাদাহ হাফিজাহুল্লাহর পক্ষ থেকে বাংলা ভাষায় একটি ঈদবার্তাও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ঘুরছে।
গত ১১ জুন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের কাকালদী গ্রামের নিজ বাড়ির পাশের ছোট্ট একটি বাজারে খুন হন মুক্তচিন্তার লেখক-প্রকাশক ও সাবেক সিপিবি নেতা শাহজাহান বাচ্চু। অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা তাকে কাছ থেকে গুলি করে এবং বোমা ফাটিয়ে পালিয়ে যায়। তদন্ত-সংশিøষ্টরা বাচ্চু হত্যার নেপথ্যে নিষিদ্ধ-ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম জড়িত বলে ধারণা করছেন। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, আনসার আল ইসলামের অন্যান্য হত্যাকান্ডের সঙ্গে বাচ্চু হত্যার মিল রয়েছে। বাচ্চুকে হত্যার পর সিটিটিসির দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। হত্যার আলামত পর্যালোচনা, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ও নিহত বাচ্চুর প্রোফাইল ঘেঁটে এটিকে জঙ্গিগোষ্ঠীর হত্যা বলেই মনে হয়েছে। আনসার আল ইসলামই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে আমরা সন্দেহ করছি।
একাধিক সূত্র বলছে, ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর ধারাবাহিক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়া জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতাসহ অনেক নেতা-কর্মী গ্রেফতার ও অভিযানে নিহত হলেও এখনো বেশ কয়েকজন নেতা আত্মগোপনে থেকে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া জেএমবির পুরনো দলের কথিত আমির সালাউদ্দিন সালেহীন ও মিজানুর রহমান ওরফে বোমা মিজান ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর ভারতে গিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। সেখান থেকেই তারা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি রাজশাহী ও বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় ছিনতাই ও ডাকাতি করে পুরনো জেএমবি অর্থ সংগ্রহ করছে বলে প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ময়মনসিংহের প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া পুরনো জেএমবির শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন সীমান্তের কাছাকাছি এসে জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। সূত্র আরও বলছে, গত চার মাসে রাজধানী এবং দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ জনের বেশি যুবক-যুবতী হিজরত করেছে। তাদের কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিয়ে তাদের মতা এরই মধ্যে অবহিত করেছে। কেউ কেউ কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে তৎপরতা চালাচ্ছে। হিজরত করা যুবকদের বেশির ভাগই নব্য জেএমবির অনুসারী। ৩০ এপ্রিল র‌্যাব-১০-এর কো¤পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দীন ফারুকীর নেতৃত্বে একটি দল পুরান ঢাকা থেকে কারি মাহমুদ নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে। মাহমুদ শীর্ষ নেতাদের নির্দেশে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প গিয়েছিল বিশেষ অ্যাসাইনম্যান্ট বাস্তবায়ন করতে। এ বিষয়টি নিয়ে র‌্যাব কাজ করছে বলে জানিয়েছেন মহিউদ্দীন ফারুকী।
গত বছরের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল এই সংগঠনটিই, যারা ইসলামিক স্টেট (আইএস) নামের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বহুজাতিক জঙ্গি সংগঠনের মতাদর্শ ও সন্ত্রাস-কৌশল অনুসরণ করে। ওই হামলার পর জঙ্গিবাদের ব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থান গ্রহণ ও দেশব্যাপী ব্যাপক জঙ্গি দমন অভিযান শুরু হলে সংগঠনটির বেশ কিছু সদস্য নিহত হন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি অভিযানে তামিম চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন নেতা নিহত ও গ্রেপ্তার হওয়ার খবরে এমন একটা ধারণা জন্মে যে নব্য জেএমবির নেতৃত্ব ছত্রভঙ্গ ও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপর আর কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে কিছুটা স্বস্তুি ফিরে এসেছিল বলেও খবর পাওয়া যায়। কিন্তু সে রকম স্বস্তির অবকাশ যে বাস্তবে নেই, তা গত কয়েক দিনের কয়েকটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠল। জঙ্গি দমন অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকা অবস্থায় কথিত নব্য জেএমবি বা অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর গোপন তৎপরতা কীভাবে ও কিসের জোরে চলতে পারছে, তা গভীরভাবে জানার চেষ্টা করা দরকার। জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তাদের জনবল সংকটও কখনো স্থায়ী হয়নি। এ দুটো বিষয়ের পেছনে কিছু বাস্তবিক প্রণোদনা আছে; উগ্র, অসহিষ্ণু ও জবরদস্গতমুলক ধর্মীয় মতাদর্শের সঙ্গে রাজনীতির যোগ এবং তার প্রতি কিছুসংখ্যক তরুণ-যুবকের তীব্র আকর্ষণ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কঠোর দমন-অভিযান, গ্রেপ্তার-বিচার-শাস্তি প্রদান ইত্যাদি অবশ্যই আরও জোরদার করতে হবে; কিন্তু শুধু এভাবেই এ গভীর সমস্যার সমাধান মিলবে না। এ জন্য ব্যাপক ও গভীর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি।