ক্ষতি ৫২ হাজার কোটি টাকা

5

যুগবার্তা ডেস্কঃ ঢাকা শহরে যানজটের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক স্টাডিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকায় যানজটে বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর্থিক হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। যানজটের ক্ষতি পরিমাপে সময় ও জ্বালানি তেলের অপচয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও শহরমুখী প্রবণতা বৃদ্ধিকে বিবেচনা করেছে এডিবি। ব্রিটেনে জিডিপির ক্ষতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ফ্রান্সে জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ, জার্মানিতে দশমিক ৯ ও আমেরিকায় দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে যানজটে ক্ষতি জিডিপির ৩ শতাংশ।
ঢাকার যানজট নিরসনে সরকারের নেয়া কোনো উদ্যোগেই সফলতা আসেনি। গত কয়েক বছরে যানজট নিরসনে ৯টি ফ্লাইওভার, ৬৬টি ফুটওভার ব্রিজ, ৩টি আন্ডারপাস নির্মাণ, ২০ জোড়া ডেমু ট্রেন, ৯টি ওয়াটার বাস, বিআরটিসির ৪২টি আর্টিকুলেটেড এবং ৩০৩টি ডাবল ডেকার বাস কেনা হয়েছে। চালু করা হয়েছিল অটোমেটিক সিগনালিং ব্যবস্থা ও লেন পদ্ধতি। এতে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ যানজটের উন্নতি হয়নি। বরং দিন যতো যাচ্ছে যানজটের ভয়াবহতা ততোই বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান এবং নগর পরিকল্পনাবিদ প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, যানজট নিরসনে মহাপরিকল্পনার আওতায় যে সব সুপারিশ করা হয়েছিল সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। সরকার অতি উৎসাহী হয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সেগুলোতে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার অভাব ছিল। যে কারণে সমস্যা দিন দিন সমস্যাটি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।
রাজধানীর যানজট নিরসনে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ ফ্লাইওভার নির্মাণ। ৯টি ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এগুলো হলো, মহাখালী ওভারপাস, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, বিজয় সরণি-তেজগাঁও লিংক রোড ওভারপাস, টঙ্গী ওভারপাস, বনানী ওভারপাস, মিরপুর-এয়ারপোর্ট রোড ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার ও মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভার। যানবাহনের অতিরিক্ত চাপে ফ্লাইওভারের দুদিকেই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। যানজট হচ্ছে ফ্লাইওভারের উপরেও। যানজট নিরসনে রাজধানীতে সর্ব প্রথম ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ৬৬টি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকা হলো, বাংলামোটর, পরীবাগ, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, মালিবাগ, টিকাটুলী ও ফার্মগেইট। কিন্তু এসব ফুট ওভারব্রিজ পথচারীরা ব্যবহার করেন না বললেই চলে। বরং পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে যানবাহন চলাচলের বাধা সৃষ্টি হয়। এদিকে, প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে বনানী ও বিমানবন্দর সড়কের ফুট ওভারব্রিজে সংযোজন করা হয়েছে চলন্ত সিঁড়ি। পথচারীদের অভিযোগ এগুলো বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। ব্যস্ত এলাকা গাবতলী, কারওয়ান বাজার ও গুলিস্তানে নির্মাণ করা হয়েছে তিনটি আন্ডারপাস। এর মধ্যে কারওয়ান বাজারের আন্ডারপাসটি দিয়ে পথচারী পারাপার হলেও বাকী দুটি কাজে আসছে না। ভুতুড়ে পরিবেশে গাবতলীর আন্ডারপাসটি মাদকসেবীদের দখলে। আর গুলিস্তানের আন্ডারপাসটিতে মার্কেট নির্মাণ করে ভাড়া দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, যানজট নিরসনে গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) রাস্তায় নামায় আর্টিকুলেটেড ও ডাবল ডেকার বাস। বিআরটিসির তথ্যমতে, বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় ৪২টি আর্টিকুলেটেড বাস চলছে। ডাবল ডেকার বাসের সংখ্যা ৩০৩। নি¤œমানের হওয়ায় বিআরটিসির বাসগুলো বেশিরভাগই বিকল থাকে। নিয়মিত না চলায় বিআরটিসির বাসের উপর যাত্রীদের আস্থা কম।
যানজট নিরসনে রাস্তার উপর চাপ কমাতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ডেমু ট্রেন চালু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরবর্তিতে ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর, ঢাকা-নরসিংদী রুটে চালু করা হয় ডেমু ট্রেন। ২০১০ সালে ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে আনা হয় ২০ জোড়া ডেমু ট্রেন। অপ্রতুল যাত্রী ধারণক্ষমতা, আরামদায়ক না হওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি ও রেলওয়ে অবকাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ডেমু ট্রেনগুলো এখন রেলের বোঝায় পরিণত হয়েছে।
অপরদিকে, যানজট নিরসনে ঢাকার চারিদিকে সার্কলার নৌপথ চালু সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে প্রায় ২ কোটি টাকায় ২০১০ সালে দুটি ওয়াটার বাস কেনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডবিøউটিসি)। পরবর্তীতে কেনা হয় আরো সাতটি ওয়াটার বাস। প্রতিটির পেছনে ব্যয় হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। শুরুতে ওয়াটার বাস নিয়ে যাত্রীরা বেশ আগ্রহী ছিল। তবে অব্যবস্থাপনা, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, সমন্বয়হীনতা ও ড্রেজিংয়ের অভাব ও ১৪টি সেতুর কারণে এটি আর জনপ্রিয়তা পায় নি। বর্তমানে সদরঘাট-গাবতলী-বাদামতলী ও নারায়ণগঞ্জ-কাঁচপুর-টঙ্গী রুটে ওয়াটার বাস চললেও ঢাকার যানজট কমাতে তা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এদিকে, যানজট নিরসনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উদ্যোগে অটোমেটিক সিগনালিং ব্যবস্থা চালু করা হয়। এজন্য নেয়া হয় একটি প্রকল্প। সেই উদ্যোগও ভেস্তে গেছে। এখন ঢাকার রাস্তার মোড়গুলোতে সিগনাল বাতি জ্বললেও গাড়ি চলে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। এতে প্রায়ই দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। বাড়ে যানজট। উল্টো পথে গাড়ি চলাচল এড়াতে ভিআইপি সড়কে কাঁটাযুক্ত প্রতিরোধযন্ত্র বসিয়েছিল পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কয়েক দিন চললেও শেষ পর্যন্ত এ উদ্যোগও সফল হয়নি।
এর আগে যানজট নিরসনে বিভিন্ন যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ উদ্যোগের ফলাফলও শূন্য। যানজট নিরসনে ঢাকার ফুটপাতগুলোকে হকারমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। উত্তরে ফুটপাত থেকে হকারমুক্ত করা গেলেও দক্ষিণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে চুটিয়ে ব্যবসা করছে হকাররা।
যানজট নিরসনে সব উদ্যোগ ব্যর্থ কেনো হচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞ প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পিতভাবে কাজ না করলে কোনো উদ্যোগই কাজে আসবে না। তিনি বলেন, রাজধানীতে ৩০/৪০ ভাগ মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করে। তাদের জন্য ফুটপাতকে আরও প্রসারিত করা উচিত ছিল। কিন্তু ফুটপাতগুলো দখলে রেখেছে হকাররা। প্রায় ৪০ ভাগ মানুষের নিজস্ব কোনো যান বা পরিবহণ নেই। তাদের জন্য গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা দরকার। তিনি বলেন, গণপরিবহণ যা আছে সেগুলোকে সুশাসনের মধ্যে আনতে পারলেও যানজটের ভয়াবহতা অনেকটাই কমানো যেতো।-ইনকিলাব