যে কৌশলে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখছে বিএনপি

2

যুগবার্তা ডেস্কঃ হ্যাঁ’ ‘না’র মধ্যে থেকেই জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে পরাজয় জেনেও স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলটি। এর মাধ্যমে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ের সব নেতাকর্মীকে চাঙ্গা রাখছে দলটি। পাশাপাশি দলের ভাঙন ঠেকাতেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। একই কারণে জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নেবে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, বর্জনের পথে আর হাঁটবে না বিএনপি। খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরেও ৩ সিটির আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোটের মাঠে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার পক্ষে সব মতভেদ ভুলে এখন একাত্ম দলটির নেতারা। তাদের মতে, নির্বাচনের অংশ নিয়ে সরকারের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন ও নির্বাচন কমিশনের অযোগ্যতা ও পক্ষপাতিত্বের চিত্রগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারলে আগামীতে সরকার পতন আন্দোলনে জনসমর্থন পাওয়া সহজ হবে। দলটির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে এমন আভাস পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে সব মতভেদ ভুলে বিএনপির নেতারা এখন একাত্ম। এবার সরকারকে খালি মাঠ ছেড়ে দিতে নারাজ তারা। দলীয় নেতাকর্মীদের শান্ত থেকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন আরো বেগবান করার পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশ নেয়ারও প্রস্তুতি নিতে বলেছেন কারাগারে অবস্থানরত দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে তার মুক্তির জন্য আইনি লড়াই, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা, সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবিতে অনড় থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

এমনকি নির্বাচনে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এরই মধ্যে সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ দিয়েছেন। শুভাকাক্সক্ষী প্রভাবশালী বিদেশি বন্ধুরাও দলটির নীতিনির্ধারকদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে প্রতিবেশী ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনের মতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন দলটির নেতারা। গণতন্ত্র চর্চা এবং আইনের শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই দেশগুলো আগামী নির্বাচনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ‘পজেটিভ’ ইঙ্গিত পেয়েছে বিএনপি। সব হিসাব মিলিয়ে বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বিএনপি। তবে জাতীয় নির্বাচনের হিসাব কষতে আরেকটু নেবেন বলে জানিয়েছেন দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা।

এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান ‘জনবিচ্ছিন্ন সরকারের প্রকৃত চেহারা’ উন্মোচন ও নির্বাচন কমিশনের ‘অযোগ্যতা ও পক্ষপাতিত্ব’ এই নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হচ্ছে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ও সরকারের নির্লজ্জ গণবিরোধী চরিত্র উন্মোচনের জন্য এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশ নিচ্ছি।

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে বহুমুখী লাভ ক্ষতির হিসাব কষছেন তারা। তাদের মতে, নির্বাচনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। মামলা হামলা উপেক্ষা করে তারা নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি আন্দোলনের জন্যও চাঙ্গা হচ্ছে তারা। তারা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে টিকে থাকতে পারলে নির্বাচনে এর ‘ইতিবাচক প্রভাব’ পড়বে। তা ছাড়া এই সুযোগে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তোলে জনগণের সমর্থন আদায়ও সহজ হবে।

এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন যদি খুলনা ও গাজীপুরের মতো হয়, তাহলে বিএনপি মানুষের কাছে প্রমাণ করতে পারবে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো দিন নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে নতুন করে চিন্তা করতে হবে সাধারণ নির্বাচনে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে দলটি নির্বাচন করবে, নাকি করবে না। তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না এটা খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনের প্রমাণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা তিন সিটি নির্বাচনে কেন অংশগ্রহণ করেছি? এর উত্তর একটাই। উত্তর হলো আমরা বারবার প্রমাণ করতে চাই।

অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নিচ্ছে না বিএনপি। তবে ভিতরে ভিতরে নির্বাচনের পুরো প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। এরই মধ্যে ৩০০ আসনে তিন স্তরের প্রার্থী তালিকাও তৈরি করেছে দলটি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতেও প্রার্থী তালিকা রয়েছে। এগিয়ে চলছে ইশতেহার তৈরির কাজও।

সূত্র জানায়, হাইকমান্ডের নির্দেশনা মোতাবেক সম্ভাব্য সব প্রার্থীই নিজ নিজ এলাকায় খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ লক্ষ্যে দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলবেন নেতাকর্মীরা। এ কারণে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেও রাজপথে ‘নরম’ কর্মসূচি দিচ্ছে দলটি।

বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচন বর্জন কোনো রাজনীতি হতে পারে না। তবে রাজনীতিতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৌশল নিতে হয়। সেখানে বিএনপি কতটুকু সফল বা ব্যর্থ সেদিকে যাব না। কিন্তু এবার বিএনপিকে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, নির্বাচনে না গেলে ভবিষ্যতে দলটিকে আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।-আমাদের সময়.কম