এমপিওর দাবিতে আবারও শিক্ষদের অনশন নজর নেই সরকারের

5

যুগবার্তা ডেস্ক: নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন করছে শিক্ষকরা। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের ব্যানারে ১০ জুন থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন তারা। গত সোমবার তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে উত্তর পাশে আমরণ অনশনে নেমেছেন। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দফায় দফায় এর আগে কর্মসূচি পালন করলেও এমপিওভুক্তির দাবি পূরণ হয়নি শিক্ষক-কর্মচারীদের। দীর্ঘদিন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বেতন-ভাতা না পেয়ে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের পরিবারের সদস্যরা। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা বলেন, এর আগে বিভিন্ন সময় দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিলাম। কিন্তু দাবি মেনে নেওয়া হয়নি। তাই এবার দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা ছাড়া আমরণ অনশন প্রত্যাহার করব না। শিক্ষক নেতারা জানান, সারা দেশে ৫ হাজার ২৪২টি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি চান তারা। ফেডারেশনের নেতৃত্বে এমপিওভুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলনে শতাধিক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবে তাদের আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সাড়া পাননি বলে জানান আন্দোলনরত শিক্ষক-কমচারীরা। শিক্ষকরা বলছেন, দাবি আদায়ে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। আমরা আর কোনো টালবাহানা মেনে নেব না। আমরা শিক্ষক হয়েও দিন মজুরের ন্যায় পরিশ্রম করছি কিন্তু কাক্সিক্ষত বেতন পাচ্ছি না।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, আমরা ১৮ দিন ধরে প্রেস ক্লাবের সামনে কর্মসূচি পালন করছি। অনশনে অনেক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমরা চাই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হোক। আমরা ক্লাসে ফিরতে চাই। বেতন-ভাতার জন্য রাস্তায় আন্দোলন করতে যাতে না হয় সে বিষয়টি সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই। তিনি বলেন, সারাদেশ থেকে ৭ হাজারের বেশি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। আমাদের নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা ৯৮ শতাংশ বেসরকারি ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে চলছে। দীর্ঘ ১৫-২০ বছর ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছি, বিনা বেতনে শিক্ষাশ্রম দিয়ে যাচ্ছি -এমতাবস্থায় আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। তিনি আরও বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় অভিনś সিলেবাসে আমরা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। শিক্ষার্থীরা পাস করছে, সার্টিফিকেট পাচ্ছে কিন্তু শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছে না। আমাদের দাবি মেনে না নেয়া হলে কঠোর কর্মসূচি দেব। আমরা তো বিশৃঙ্খলা করতে পারি না। কিন্তু প্রয়োজনে নিজেদের ক্ষতি করে আন্দোলন চালিয়ে যাব। তিনি আরো বলেন, আমরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদসহ সকল পেশার মানুষ ˆতরি করি। অথচ যুগ যুগ ধরে শিক্ষাকতা করলেও আমাদের এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে না। অর্থাভাবে নন-এমপিও শিক্ষকরা মানবেতর জীবন যাপন করলেও শুধু আশ্বাস আর প্রত্যাশা ছাড়া কিছুই পায়নি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আমরা খালি হাতে বাড়ি ফিরবো না। জীবন গেলেও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আন্দোলনে অংশ নেয়া ঠাকুরগায়ের পীরগঞ্জের সিন্দাঘর আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সামাদ বলেন,আমি ১৭ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। না সরকারের কাছ থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছি, না পাচ্ছি স্কুল থেকে। ঘরে দুটি সন্তান, স্ত্রী। কীভাবে সংসার চলে? জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে শ্রমিকের কাজ করি। শিক্ষক হয়েও আমাদের শ্রমিকের জীবন। বেতন-ভাতা না দিলে এবার ঘরে ফিরে যাব না। তিনি আরও বলেন, আমার দুটি মেয়ে। একজনের বয়স ৫ বছর, আরেকজনের বয়স ২ বছর। বালিকা বিদ্যালয়ে এমনিতেই ছাত্রীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেয়া হয় না। তাই স্কুলের কোনো আয় উপার্জনই নেই। তাই স্কুল থেকে কোনো টাকা পাই না আমরা। আর কতদিন বিনা বেতনে বেগার খাটব। পাশেই পত্রিকা বিছিয়ে বসেছিলেন রাজশাহীর বাঘার ইসলামিয়া একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয় ও কারিগরি কলেজের প্রভাষক শহীনুর নাসিম। তিনি বলেন, আমার তিন বছরের একটি ছেলে, স্ত্রী ও বাবা-মা রয়েছেন। মাসে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা খরচ। কিন্তু স্কুল কিংবা সরকার থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাই না। আমি ২০১২ সাল থেকে শিক্ষকতা করছি। সংসার চালাতে আমের সময় আম, পাটের সময় পাট বিক্রি করি। শহীনুর বলেন, তিন হাজার টাকা ধার করে ঢাকা এসেছি। ভাবছি কীভাবে সেই টাকা পরিশোধ করব। দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। দাবি পূরণ হওয়া ছাড়া ঘরে ফিরে যাওয়া কোনো সুযোগ আমাদের নেই। বছরের পর বছর বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষক মানবেতর জীবন-যাপন করছেন জানিয়ে এই শিক্ষক আরও বলেন, কোনো কোনো শিক্ষক সবজি বিক্রি, সিএনজি চালিয়ে ও শ্রমিকের কাজ করে জীবন ধারণ করছেন।
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সারাদেশের ৭ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। ৭ হাজারের বেশি নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।