বিশ্ব কাপের উষ্ণ তাপে, প্রৌঢ় যুবা সবাই কাঁপে!!!

16

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ কিছু কিছু জিনিস আছে, দেখতে যা মোটেই ভাল্লাগে না। অসহ্য রকমের বিশ্রী লাগে। মেজাজটা টনটন করে ওঠে। কিছুদিন ধরে এমনই মেজাজ টনটন করা বিশ্রী ঘটনা পূরো দেশজুড়েই ঘটে চলেছে। থামাথামি নেই। ছোটবেলায় গাঁওগেরামে অহরহ নানা ধরনের টনটন করা ঘটনা দেখতাম। দেখতাম, রাস্তার পাশে শিশুরা নয়; দাদা টাইপের বড় মানুষেরাই লোকচক্ষুর মোটামুটি সামনে হাগু করতে বসেছেন। কোন রাগঢাগ নেই; মুখে বিড়ি পুরে পরনের লুঙ্গি দুহাতে পূরোটা জাগিয়ে ভীষন আগ্রহ নিয়েই বসেছেন। সামান্য লাজলজ্জার বালাই নেই।

বালাই আমাদেরও ছিল না। আমরাও ততধিক আগ্রহে দাদাকে আড়চোখে দেখতাম আর হাসতাম। বড় ব্যাঙ্গ করে হাসতাম এবং কোরাসের সুরে গাইতাম, ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের দাদা; বইসা বইসা আগুন খায়, হাগে গাদা গাদা। এসবে দাদার কিছুই হতো না। তার কোন ভ্রুক্ষেপই ছিল না। তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে আনমনে প্রাকৃতিক কর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। আর আমরা থাকতাম আমাদের কোরাস নিয়ে। এসব করার জন্যে একটা দল ছিল আমাদের। হেন কাজ নেই যা করতাম না। তবে সবারটাই সবার কাছে কেমন যেন সয়ে গিয়েছিল।
ঠিক তেমনি বিশ্বকে কাঁপিয়ে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে কিছুদিন ধরে দেশজুড়ে যা হচ্ছে তাও সয়ে গেছে। খেলা শুরুর আগে থেকেই এর উম্মাদনায় সারা বাংলায় তথাকথিত ভক্তদের কীর্তিকলাপ না সয়ে উপায়ও নেই। শুধু আমার নয়, সবারই সয়ে গেছে। সেই যে গেল মে মাস থেকে বাঙালী শুরু করলো, এখনো চলছে। অসহ্য রকমের খারাপ এবং বিশ্রী লাগার বিষয়টি ঘটেই চলেছে এবং অদ্ভূত রকমের সত্যি হলো, বিষয়টি একেবারে গা সওয়া হয়ে গেছে। নাহলে প্রতিবাদ দেখতাম, প্রতিরোধ দেখতাম।
প্রতিবাদ-প্রতিরোধ তো এদেশে আর কম দেখি না। জন্মের পর থেকেই দেখছি। আজাইরা কর্মেও প্রতিবাদের অভাব নেই। প্রতিবাদ নেই কেবল এই একটি বিষয়ে। বরং সবাই একাট্টা। কে কার চেয়ে বড়ভাবে করতে পারে তার জন্যে একাট্টা। এখানে কোন বিভক্তি নেই। বিভক্তি আছে দেশ ভিত্তিক সাপোর্ট করা নিয়ে। সবাই একদেশকে সাপোর্ট করে না। বলা যায় বাঙালী এখন আর বাঙালী নেই। ব্রাজিলিয়ান, আর্জেন্টাইন কিংবা জার্মান হয়ে গেছে।
আওয়ামী-বিএনপির মত আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। এরাই দলে ভারী। সবচেয়ে একটিভ; সবচেয়ে পাওয়ারফুল। দেশকে একেবারে ফাটিয়ে ফেলছে। হাটে মাঠে কিংবা ঘাটে; কোথায় নেই! আছে আড্ডায়, আছে ঠাট্টায়। আছে মুখে মুখে, আছে ফেসবুকে। পাশাপাশি আছে সংখ্যালঘু জার্মানী। অনেকটা জাতীয় পার্টির মত। এদের কোন শত্রুপক্ষ, মানে পক্ষবিপক্ষ নেই। সংখ্যায় কম কিন্তু মোটামুটি সক্রিয়। একজন আছেন কঠিন পাগল। জমিজমা সব বিক্রি করে গত দুইটি বিশ^কাপে জার্মানীর দীর্ঘ আকৃতির পতাকা বানিয়ে পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছেন।
তার টার্গেট প্রতিবার অধিকতর লম্বা পতাকা বানাবে। লম্বার শেষ নেই। এবার বানিয়েছেন পাঁচ কিলোমিটার লম্বা পতাকা। আগামী ২২ সালের বিশ্ব্ কাপে টার্গেট করেছে ২২ কিলোমিটার। এরপর নিশ্চয়ই চাইবে দেশের এমাথা ওমাথা লম্বা পতাকা বানাতে। মাতামাতি আর কাকে বলে! এ হলো জার্মানীর প্রেমে অন্ধভক্তের মাতামাতির উপখ্যান। বাংলার মাটিতে বসে জার্মানীর পতাকা বানাবার পাগলামির উপখ্যান। যে মানুষটি ভিন্ন কোন দেশের প্রেমে পড়ে সে দেশের পতাকা বানাবার জন্যে নিজ দেশের সহায় সম্পদ সব বিক্রি করতে পারে, তার মনে আদৌ বাংলাদেশ প্রেম বলতে কিছু থাকতে পারে কি না, কিংবা বিষয়টি দৃষ্টিকটু কিনা এই প্রশ্নটা অমূলক নয় মোটেও।

তবে বিষয়টি শুরুতে মোটেও দৃষ্টিকটু ছিল না। বিশ্বকাপের মত একটা আনন্দময় বিষয় নিয়ে একটু মাতামাতি হতেই পারে। কোন না কোন দেশকে সাপোর্ট করে আনন্দ হৈহুল্লোর করতেই পারে। না হলে খেলা দেখার মজা কিংবা আকর্ষণটাই থাকে না। এদেশে মজা করার আইটেমই তো নেই। যা আছে সবই তো রাজনীতি। দিনভর রাজনীতি নিয়ে গসিপ করার চেয়ে বিশ^কাপ নিয়ে পড়ে থাকা উত্তম। অতীব উত্তম।

আপত্তির জায়গাটি কেবল বাড়াবাড়ি করা নিয়ে। এই পৃথিবীতে সীমা ছাড়িয়ে করা কোন কিছুকেই কেউ গ্রহণ করে না। গ্রহণীয় ছিল শুরুর মজাটা। মজাটা ছিল পতাকা ওড়াবার প্রতিযোগীতা। সর্মথকদের বাড়ীর আঙিনায় ওড়াতে গিয়ে শুরু হলো পতাকা বড় করার প্রতিযোগীতা। যে যত পারে বড় করেই চলেছে। পরে শুরু হলো পতাকা মিছিল, পতাকার রঙে টিশার্ট গায়ে র‌্যালি এবং ইফতার পার্টি। আনন্দটা আর নিছক আনন্দ থাকলো না। বাড়াবাড়ি করতে করতে ফাজলামোর পর্যায়ে চলে গেল। স্বজাতির সব ভাই মিলে বিজাতির বন্দনায় নেমে পড়লো।
হয়ত এ পর্যন্তও ঠিক ছিল। তবে এরপর যা শুরু হলো তাকে আর ঠিক বলার কোন উপায় নেই। সব বেঠিক হতে শুরু করলো। বলা যায় বাঙালীর আসল খাসিলত দেখাবার প্রতিযোগীতা শুরু হলো। এ এক ভয়ানক প্রতিযোগীতা। অপরপক্ষকে খাটো করার বা পচানোর প্রতিযোগীতা। শুরু হলো সবকিছুকে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকায় সাজানোর অশুভ প্রতিযোগীতা। বিয়ে কিংবা মেলার প্যান্ডেলও বদলে গেল দুদেশের পতাকার আদলে। একজন ব্রাজিলিয়ান ভক্ত তার বাড়ীর বাইরের পূরো দেয়াল রং করে ব্রাজিলের পতাকার আদলে রাঙালেন।
বাদ যাবে কেন গঁফরগায়ের আর্জেন্টাইন ভক্ত! তাদেরও তো দেখাবার আছে। তাদের ইঞ্জিনিয়ার আছে। সরকারী ইঞ্জিনিয়ার। সরকারী টাকায় সুযোগ পেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি তিনতলা ভবনের চার দেয়ালকে রং করে পূরোপুরি আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়ে ফেললেন সেই ইঞ্জিনিয়ার সাহেব। কার বাবার টাকায় বানালেন একটিবারও ভাবলেন না। ভাবলেন না, এহেন কাজটি একই স্কুলের কিংবা এলাকার বাদবাকী মানুষের অনুভূতিতে কতটা আঘাত দিতে পারে।

অবশ্য এতো ভাবার ক্ষমতা তাদের থাকলে তো! থাকলে তো তারা নোংরামীটা চরম পর্যায়ে নিতে পারতেন না। জেদাজেদি করতে করতে পরাভূত করার প্রতিহিংসামূলক মানসিকতা এমন পর্যায়ে নামালেন যে তারা অপরপক্ষের পতাকা দিয়ে নিজেদের টয়লেট বানানো শুরু করলেন। পাশাপাশি দুই বাড়ীর দুই টয়লেট; ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকায় মোড়ানো টয়লেট। বিশ্রী রুচীর বিশ্রী টয়লেট। ব্যাখ্যাহীন এক বিষয়! বিষয়টি করাই হয়েছে এমন ভাবে যেন একপক্ষ হাগু করছে অপরপক্ষের অনুভূতির মুখে।

এখানে খুবই তাচ্ছিল্য করে অনুভূতির গায়ে বিষ্ঠা মাখানো হয়েছে। বাকী ছিল পতাকার গায়ে বিষ্ঠা মাখানো। শেষমেষ তাই করলো। এক আর্জেন্টিনা ভক্ত ব্রাজিলের পতাকার উপর জিপার খুলে আটঘাট করে বসেছে। পায়ের জুতা জোড়াও সেথায় রেখেছে। এরপর মনের সুখে শরীর নির্গত দূর্ষিত মূত্র দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে ব্রাজিলের পতাকা। এটির ছবি ফেসবুকে দিতে দেরী হয়েছে, কিন্তু কাপড় খুলে আর্জেন্টিনার পতাকায় বসে হাগু করতে ব্রাজিলীয় ভক্তদের একটুও দেরী হয়নি। বসার ভঙ্গিটি অবিকল সেই ছেলেবেলায় দেখা তালগাছ তলার বিড়ি মুখের দাদার মতই লাগছিল।

হায়রে বাঙালী! হায়রে মোদের খাসিলত! নিজেদের অজান্তেই নিজেদের খাসিলত নির্লজ্জের মত প্রকাশ করছি। প্রকাশ করছি মনের আসল চেহারা; আসল নোংরামী। দলবেঁধে করছি। এসব নোংরামী দেখে আমজনতা চুপ থাকলেও সরকারের চুপ থাকার তো উপায় নেই। পতাকা ওড়ানোর ব্যাপারটায় ঐসব দেশের কর্তৃপক্ষ খুশীতে নিশ্চয়ই গদগদ হয়েছে। আর আমাদের সরকারও চুপ থেকেছে। কিন্তু তাদের পতাকার অবমাননায় তারা কতটা বিব্রত হয়েছে সেটা তো দেখা এবং জানার বিষয় সরকারের।
সরকার আদৌ জানে কি না জানি না। আমরা জেনেছি ফেসবুকের কল্যাণে। ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে এসেছি সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ; মানে সমাজের আয়না। সমাজটা যেমন, সংবাদপত্রে তার প্রতিচ্ছবিটা ঠিক তেমন। এখন দিন বদলেছে। সংবাদপত্রের জায়গা দখলে নিয়েছে ফেসবুকের মত স্যোসাল নেটওয়াকিং দুনিয়া। ফেসবুক এখন সমাজের দর্পণের ভূমিকায়। তাই সমাজটা এখন আসলে যেমন, তার সঠিক রূপটা ফেসবুকে ঠিক তেমন। ফেসবুক বাঙালীর জন্যে আর কিছু করতে না পারুক, বাঙালীর আসল চেহারাটা তুলে ধরতে পেরেছে।

আর মনে করিয়ে দিতে পেরেছে সেই ছোট্ট বেলার বিড়ি মুখের দাদার কথা। চল্লিশ বছরেও বাঙালী স্বভাবটা পাল্টাতে পারলো না। তখন হাগু করতে বসতো জমির আইলে, আর এখন বিদেশী পতাকায়। দেখে দুঃখ না পেয়ে কি পারা যায়! কিন্তু এতে ওদের কিচ্ছু যায় আসে না। যত বিশ্রীই লাগুক, যত অসভ্যতামিই হোক, ওরা করেই যাচ্ছে। করেই যাবে। এ থেকে ওরা বের হতে পারবে না। শত চেষ্টা করলেও পারবে না।-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।