সঞ্চয়পত্রে আগ্রহ নেই বাণিজ্যিক ব্যাংকের

9

যুগবার্তা ডেস্কঃ একদিকে আমানতের সুদহার কমিয়ে আনার ঘোষণা, অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর আশঙ্কা। এই নিয়ে উভয় সংকটে রয়েছে সঞ্চয়ীরা।

এ কারণে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর আগে এ খাতে বিনিয়োগের হিড়িক পড়েছে সঞ্চয়ীদের মধ্যে। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে অনীহার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ক্রেতারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে সঞ্চয়পত্র কেনার দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমিয়ে আনা হতে পারে—এমন আশঙ্কা কাজ করছে তাদের মধ্যে। এ ছাড়া ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় সঞ্চয়পত্র কেনার চাপও বেড়েছে। এদিকে গত বুধবার আমানতের সুদহার কমিয়ে আনার বিষয়ে ব্যাংক মালিকদের সিদ্ধান্তে তারা আরো বিচলিত হয়ে পড়েছে।

উপস্থিত ক্রেতাদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শুনলাম আমানতের সুদহার কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হবে জুলাই থেকে। তাহলে আর ব্যাংকে টাকা রেখে লাভ কি? কিছু টাকা ছিল জমানো। এটা দিয়ে কিছু সঞ্চয়পত্র কিনে রাখি।কবে আবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে আনা হবে তার তো কোনো ঠিক নেই। ’

গত ৮ জুন বাজেট প্রস্তাবের পরের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদের হার দুই-তিন বছর পর পর পর্যালোচনা করা হয়। এবার একটু দেরি হয়েছে। এটা বাজেটের মাস বা পরের মাসে পর্যালোচনা করা হবে। ’

এদিকে গত বুধবার বেসরকারি ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) এক জরুরি সভায় আগামী ১ জুলাই থেকে আমানতের ওপর ৬ শতাংশের বেশি সুদ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে এ সিদ্ধান্ত নেন সংগঠনটির নেতারা।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগের পরও বিনিয়োগকারীদের পুরোপুরি আস্থা ফিরে আসেনি পুঁজিবাজারের ওপর। এভাবে দিন দিন ক্ষুদ্র সঞ্চয়ীদের বিনিয়োগের পথ সংকুচিত হয়ে আসায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনীহার কারণে এই চাপ সামলাতে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এ নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস।

সূত্র জানায়, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন তার অর্ধেক রয়েছে। এ কারণে বাড়তি চাপ পড়ছে কর্মকর্তাদের ওপর।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের নির্বাহী পরিচালক ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘প্রতিদিনই সঞ্চয়পত্রের ক্রেতারা এসে অভিযোগ করছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে তারা সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছে না। এমনকি সরকারি ব্যাংকগুলোতে গিয়েও নাকি সঞ্চয়পত্রের ফরম পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু নানা অজুহাতে তারা এই কাজে অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। ’

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে মোট বিনিয়োগ এসেছে ৬৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। এর মধ্য থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল মুনাফা পরিশোধেই ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। মূল ও মুনাফা বাদ দিয়ে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা।

সম্প্রতি কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক শাখায় গিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই ব্যাংক শাখাগুলোতে সঞ্চয়পত্রের জন্য কোনো ক্রেতা গেলে কর্মকর্তারা নিজ ব্যাংক থেকে সঞ্চয়পত্র কিনতে নিরুৎসাহিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সঞ্চয়পত্র কেনার পরামর্শ দেন। এতে অনেক ক্রেতা সঞ্চয়পত্র কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।-কালেরকন্ঠ