তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সক্রিয় চোরাচালান চক্র

3

যুগবার্তা ডেস্কঃ সন্ধ্যার পর দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় সক্রিয় থাকে চোরাচালানের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মাদক, স্বর্ণ চোরাচালান, মুদ্রা পাচার সবই অবাধে ঘটছে সেখানে। ঘোষণা দেওয়া হয় এক পণ্যের, আসে অন্য পণ্য। এই ঘটনা ঘটে কার্গো কমপ্লেক্স এলাকায় বেশি। ঘোষিত পণ্যের নামে আসে মাদক, সোনা, নিষিদ্ধ ওষুধসহ অবৈধ পণ্যসামগ্রী। জাল ভিসায় মানব পাচার করা হয়। এমন কোনো চোরাচালান নেই যা সেখানে ঘটে না। বিষয়টি যেন অনেকটা ওপেন সিক্রেট। বিমানবন্দরে নিয়োজিত প্রতিটি সংস্থার এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী চোরাচালানের ভাগ পায়। চোরাচালানে জড়িত একজন কর্মচারী জানান, ‘রাতেই সব কারবার। আমরা মাঝেমধ্যে ময়লার মধ্য দিয়ে চোরাচালান বহন করি, আমরা ভাগ পাই কম। কিন্তু এর সঙ্গে বড় মাফিয়া জড়িত। কোটি কোটি টাকা আয় করছে তারা। রাতেই চোরাকারবারিদের আনাগোনা বেশি। এই সময়কে তারা নিরাপদ মনে করে। এ সময় দুইটা লাগেজ ধরলেই যথেষ্ট।’

জানা গেছে, গত ছয় মাসে বিমানবন্দর পুলিশ ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রায় ৫০ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য আটক করেছে। এর মধ্যে স্বর্ণের বার, হীরা ও বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়াও রয়েছে কোকেনের মতো মাদক। তবে যা ধরা পড়েছে তা খুবই নগণ্য। প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিনই বহু টাকার চোরাচালান হচ্ছে। বিমানবন্দরের একাধিক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। চোরাচালান বন্ধের উপায় হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের ব্যাগেজ ডগস্কোয়াড দিয়ে সুইপিং (পরীক্ষা) করালে চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব। কারণ হিসেবে তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও মাদকদ্রব্য চিহ্নিত করার জন্য ডগস্কোয়াড দিয়ে সুইপিং করানো হয়। আর যেসব দেশের বিমানবন্দরে ডগস্কোয়াড আছে সেসব দেশের বিমানবন্দর চোরাচালানিরা ব্যবহার করেন না বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওই সব কর্মকর্তা জানান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অনেকটা নিরাপত্তাহীন থাকে। চোরাচালানের সিন্ডিকেটে প্রত্যেকটা সদস্য তাদের ওপর দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করে। জিয়ার আমলে বিমানবন্দরে সাড়ে চার শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। যাদের অধিকাংশ বিএনপি-জামায়াতপন্থি। এরা এখন চোরাচালানে বেশি সক্রিয়। এসব লোকের কারণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে। বিমানবন্দরে শুধু নিরীহ যাত্রীদের ল্যাগেজ তল্লাশির নামে হয়রানি করা হয়। আর চোরাকারবারিদের ব্যাগেজ নিরাপদে চলে যায়। এক শ্রেণির কর্মকর্তা চোরাকারবারিদের ব্যাগেজ পার করে দিতেও সহযোগিতা করেন। এমন তথ্য পাওয়া যায়।

শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্মরত আরেকজন কর্মচারী জানান, কীভাবে চোরাচালান হচ্ছে আমরা সবই জানি। আমরাও ভাগ পাই, তবে তা খুবই কম। যারা চোরাচালানির জিনিসপত্র নিয়ে আসে তারা তো কোটি কোটি টাকা আয় করছে। এদিকে বিমানবন্দরে বাইরের অংশে খুবই কড়াকড়িভাবে চেকপোস্টে চেক করা হলেও ভেতরে নোংরা পরিবেশ। বিশেষ করে বাথরুমগুলোতে দুর্গন্ধ থাকে।

অপরদিকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সিএএবি’র এরোড্রাম কর্মকর্তা আবু মোহাম্মদ ওমর শরীফ দীর্ঘদির ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত এবং ক্ষমতা অপব্যবহার করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করে। তদন্তে সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি প্রতিবদেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হলেন যুগ্ম সচিব (বিমান) মো. হাবিবুর রহমান। কমিটির দুই সদস্য হলেন সিএটিসি’র পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান মিয়া ও হশাআবি’র সহকারী পরিচালক আবু সাহে মো. খালেদ। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিএ-১ অধিশাখা থেকে একটি আদেশও জারি করা হয়। তবে রহস্যজনক কারণে এই তদন্তের কোনো আলোর মুখ এখনো পর্যন্ত দেখেনি।

এ ব্যাপারে আবু মোহাম্মদ ওমর শরীফ জানান, ‘আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।’ এদিকে ঢাকার বিমানবন্দরে একজন হাবিলদারের নাম সবাই জানে। রাতের বেলায় চোরা কারবারিরা তাকেই খোঁজে। এভাবে প্রতিটি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে অবাধে চলছে চোরাচালান।

রাজধানীর কাওরান বাজারের লা ভিঞ্চি হোটেল থেকে তিন কেজির বেশি কোকেনসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গোয়েন্দার হাতে ধরা পড়েন পেরুর নাগরিক পাবলো। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিতে চোরাচালান নেপথ্যের কাহিনী বর্ণনা দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, পেরুর রাজধানী লিমার একটি ডিস্কোতে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করতেন। সেখানেই এক নারী তাকে মাদক পাচারের প্রস্তাব দেন। রাজি হলে তার ব্যাগে বিশেষভাবে পুরে দেওয়া হয় মাদক। সেই ব্যাগ নিয়ে তিনি প্রথমে পাশের দেশ ইকুয়েডর যান। সেখান থেকে কোপা এয়ারলাইন্সের বিমানে করে যান পানামায়। পানামা থেকে একই সংস্থার বিমানে চড়ে যান ব্রাজিল। এরপর সেখান থেকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সে করে দুবাইয়ে, সেখান থেকে একই এয়ারলাইন্সে ঢাকায় আসেন। পাবলো তার জবানবন্দিতে আরো জানান, লিমা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাদকদ্রব্য শনাক্ত করতে ব্যবহূত হয় কুকুর, আর কুকুরগুলো খুবই দক্ষ। তাই ওই বিমানবন্দর এড়াতে তিনি ইকুয়েডর বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন। তার ব্যাগটি ইকুয়েডর থেকেই ঢাকার জন্য বুকিং করা হয়। ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া ছিল তার কাজ।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, যাত্রীদের ব্যাগজে তল্লাশির জন্য বিমানবন্দরগুলোতে স্থাপিত এক্সরে স্ক্যানিং মেশিন, ডুয়েল ভিউ স্ক্যানিং মেশিন এবং এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (এলইডিএস) ধাতব ও বিস্ফোরকদ্রব্য শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও মাদকদ্রব্য শনাক্ত করতে সক্ষম নয়। এ সুযোগ নিয়ে কোকেন, আফিম, হিরোইন, চেতনানাশক ইনজেকশন, অ্যালকোহলযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ, সীসার মতো সহজে বেশি পরিমাণ বহনযোগ্য মাদকদ্রব্য সীমান্ত এলাকা ছাড়াও বিমানবন্দরের মাধ্যমে আসছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে ইয়াবার পাচারের ঘটনাও বাড়ছে। আকারে ছোট হওয়ায় শরীর বা ব্যাগে লুকিয়ে শত শত পিস ইয়াবা ট্যাবলেট বহন করা সম্ভব। বিমানের এক শ্রেণির ক্রু’রাও ইয়াবা পাচারে জড়িত-এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। ক্যাপ্টেন-ক্রু’দের অনেকে ইয়াবায় আসক্ত বলে অভিযোগ এসেছে।

এদিকে বাংলাদেশকে চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক সোনা চোরাকারবারীরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে এসব সোনা হযরত শাহজালাল (র.) বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম শাহ আমানত ও সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আসে। এরপর নানা হাত ঘুরে সোনা যায় তার গন্তব্য ভারতে। সোনা গলিয়ে স্বর্ণালঙ্কার বানিয়ে সেগুলো আবার পাঠানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। বেশির ভাগ সোনা আসে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে। এর মধ্যে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ সোনা ধরা পড়ে। দুবাই থেকে চোরাচালান সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও সোনা চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে। দিনের বেলায় সিভিল এভিয়েশনসহ বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের আনাগোনা থাকে বিমানবন্দরে। তদারকিও তারা করেন। সন্ধ্যার পর শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই তদারকি থাকে না। ফায়ার অফিসার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের থাকার কথা ফায়ার স্টেশনে। অথচ তাদের বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ চোরা কারবারির সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। এমন অভিযোগ আসছে। তাদের ডিউটিও রাতের বেলায়।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক (গ্রুপ ক্যাপ্টেন) আব্দুল্লাহ আল ফারুক জানান, বিমানবন্দরে সন্ধ্যার পর যে বিষয়গুলো হয়, তা অনুসন্ধান করছি। সব অব্যবস্থাপনা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।-ইত্তেফাক