পিইসি পরীক্ষা কোমল শিশুদের শৈশবকে ধ্বংস করছে

7

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিঃ পিইসি পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে করণীয় বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে শনিবার ডিআরইউ ভবনের সাগর-রুনি মিলনায়তনে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংগঠনের সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক স্নেহাদ্রি চক্রবর্তী রিন্টুর সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, ঝিগাতলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ইসহাক সরকার, শিশু ও শিক্ষা রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক লেখক রাখাল রাহা,প্রযুক্তিবিদ দিদারুল ভূইয়া, স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতনের সমন্বয়কারী ধ্রুবজ্যোতি হোড়, বেইলি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল হক, ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের অভিভাবক দিলারা চৌধুরী, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগারের সভাপতি আলী মোঃ আবু নাঈম, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি ও প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমন্বয়ক গোলাম মোস্তফা, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবীর প্রমুখ।

ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন,‘মানুষকে নানান টোটকা দাওয়াই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আসল কারণ হলো স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি এদেশে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না। স্বৈরাচারী শাসকরা শোষণ-জুলুমকে আড়াল করতে ভবিষ্যত দৃষ্টিহীন প্রজন্ম তৈরি করছে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। প্রতিবাদ, অন্যায় এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বন্ধ করতেই প্রশ্নফাঁস করছে।’

মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘পিইসি পরীক্ষা কোমল শিশুদের শৈশবকে ধ্বংস করছে। ফলে এই পরীক্ষা বাতিলের দাবি যথার্থ। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার অধিকাংশই ব্যয় হয় অবকাঠামো খাতে। প্রাথমিক মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন খুব কম। তাদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যদিকে এধরনের শিক্ষা – শিক্ষার নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করছে। শিক্ষা সম্পূর্ণ সার্টিফিকেটমুখী হয়ে পড়েছে।’

অভিভাবক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘একজন মা কতটা অসহায় হলে প্রতিবাদী হয়। স্কুলেতো আজ শিক্ষা দেয়া হয় না, ব্যবসা হচ্ছে। স্কুলে পড়ানো হচ্ছে না বলে বাধ্য হয়ে কোচিং-এ দেই। বারবার সিলেবাস পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তগুলো নেবার আগে তো একবার বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবা দরকার। কোচিং, পরীক্ষার চাপ সবসময় – এটা শিশুর জীবন নাকি কারাগার।’

বক্তারা আরো বলেন, পিইসি পরীক্ষা চালুর ফলে প্রাথমিক শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রাইভেট ও কোচিং ব্যবসা তো বেড়েছেই। সাথে সথে বেড়েছে ‘পাঠ্যবই সহায়ক পুস্তিকার’ নামে গাইড বই এর ব্যবসা। গাইড বই, নোটবই বের করা হচ্ছে বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন ধরনের উপকরণ নিয়ে। এই পরীক্ষার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ছাত্র- শিক্ষক সম্পর্কের উপর। স্কুলের শিক্ষকরা স্কুলের কোচিং এ যেতে বাধ্য করছে। আবার নিজের কাছে বাসায় গিয়ে পড়তে যেতেও নানা ভাবে চাপ দিচ্ছে। সৃজনশীল প্রশ্ন করার ফলে শিক্ষকরা নানা রকমের প্রশ্ন পরীক্ষায় দেবার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় রকমের কঠিন প্রশ্নও স্কুলের পরীক্ষায় দেওয়া হচ্ছে যাতে তার কাছে প্রাইভেটে পড়তে বাধ্য হয় শুধু শিশুদের নয়, এই পরীক্ষা অভিভাবকদেরও এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এমনিতেই ভবিষ্যতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগের অনিশ্চয়তা, চাকুরীর অনিশ্চয়তা বাবা মাকে ছোটবেলা থেকেই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তার উপর এই পরীক্ষা আগুনে ঘি ঢেলেছে। প্রতি বছর পরীক্ষায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ‘এ প্লাস’ পাচ্ছে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে। শেষ অব্দি পরীক্ষায় ভালো করা শিশুদের শেখার থেকে মনযোগ সড়িয়ে দিচ্ছে। ছাত্রদের শুধুমাত্র কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নের উত্তর করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। কিন্তু গণিত, বিজ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজী ভাষার ব্যাকরণের মৌলিক বিষয়গুলোই চর্চার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর প্রভাব ছাত্রদের পরবর্তী শিক্ষা জীবনে পড়ছে। ৫ম শ্রেণির একটা শিশুর পরীক্ষাভীতি তৈরি করে তাকে দিয়ে পড়ানো যায়- একথা সত্য। কিন্তু এই পরীক্ষাভীতি তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের জায়গাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ফলে তার স্বাভাবিক শেখার প্রক্রিয়া মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হতে থাকে। তাই বক্তাগণ এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।