এবার মহাকাশ বিজয়!!!

9

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ ক্লাশ নাইনের ছাত্র আমি। ধলা বাজারে থাকি। সদ্য বিদ্যুৎ আসা অজপাড়াগাঁয়ের রমরমা বাজার। সাথে একটা সাদা কালো টিভিও এসেছে। এসেছে ইউনিয়ন পরিষদের নামে। তবে একটানা দেখার সুযোগ নেই। ভাগ ভাগ করে দেখায়। পনের দিন ধলা বাজারে থাকে, পনের দিন বালিপাড়া। ধলা বাজারের ভাগে যখন থাকতো, রাত নয়টার মাঝেই সব পড়াশুনা শেষ করে টিভি দেখতে বসে যেতাম। বসে যেতাম মানে, আমার শোনিমের মত গা ছেড়ে সোফাসেটে আটঘাট করে বসা নয়। খোলা আকাশের নীচে শুকনো ধূলোর মাটিতে বসতাম। কখনো বা ভিজা মাটিতে। হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টিকেও তোয়াক্কা না করে ভিজা মাটিতে ঠায় বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে ঝিরঝির করা টিভি দেখতাম।
খুব যে একটা শান্তি মত দেখতে পারতাম, সেটাও নয়। বসার জায়গার উপর নির্ভর করতো কতটা ভালভাবে দেখতে পারবো। আগেভাগে যেতে পারলে ভাল। টিভি সেটের মোটামুটি সামনে বসতে পারতাম। কাঁদা হোক কিংবা পানি হোক, বসে পড়তাম। সামনে বসলে বিপত্তিও ছিল। হঠাৎ কোন কারনে মাথা একটু উঁচু করেছি তো ব্যাস! পেছন থেকে বড়দের ধমক। আবার পরে গেলেও সমস্যা। মহা সমস্যা। সবার পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা লাগতো। ছোট মানুষ হয়ে বড় মানুষদের পেছনে দাঁড়িয়ে দেখার কী যে বিড়ম্বনা তা ভুক্তভোগীরাই জানে। একবার এই পাশে দাঁড়াই, তো একবার ওই পাশে। সামনে দাঁড়ানো দুজন বড় মানুষের বড়দেহ হাত দিয়ে সরিয়ে আস্তে আস্তে মাথা আধা ভরে দিয়ে দেখতে হতো। মাঝে মাঝে বড়রা কুদানি দিয়ে ধমক দিত। কঠিন ধমক। কথায় কথায় ছোটদের ধমক দিতে বাংলাদেশের বড়দের জুড়ি মেলা ভার।
তবে গায়ে মাখতাম না। বড়দের ধমক খেয়েই টিভি দেখতাম। একবার বিশ্বসেরা মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর মুষ্টিযুদ্ধও লাইভে দেখলাম। সেকি উত্তেজনা! তবে প্রতিদিন দেখতাম গদবাঁধা যুদ্ধের ভিডিও চিত্রও। ইরাক ইরানের যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। টিভির খবর জুড়েই থাকতো যুদ্ধের ভিডিও। নীচে স্ক্রলবারে লেখা থাকতো “কালিয়াকৈরের তালিবাবাদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হচ্ছে।” কখনো দেখাতো রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে। এসব কথার অর্থ তখন কিছুই বুঝতাম না। বোঝার চেষ্টাও করতাম না। কেবল আল্লাহ আল্লাহ করতাম যেন স্বাদের টিভিটা হঠাৎ বেতাল না হয়ে যায়। ঝিরঝির করতে করতে শেষমেষ চোখের জল ঝিরঝির না করে!
ঢাকায় আসার পরে বেতাল টিভি আর তেমন দেখতে হয়নি। তবে টিভি নিয়ে অনেক রহস্যের জট খুলেছে তখন। কলেজে ভাল রেজাল্টের জন্যে প্রাইভেট পড়তে যেতাম বুয়েটের হলে। সদ্য ফাইনাল দেয়া বুয়েটের একজনার কাছে। স্যারের নামটি মনে নেই। কিন্তু খুব মন দিয়ে আমাকে তিনি ফিজিক্স পড়াতেন, ম্যাথ শিখাতেন। প্রাসঙ্গিকভাবেই স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের গল্প করতেন। বলতেন, আমাদের উপরে যে আকাশ দেখা যায়, তার নানান কক্ষপথে রয়েছে মানুষের পাঠানো হাজারো কৃত্রিম উপগ্রহ। অনেকটা চাঁদেরই মত। চাঁদ আল্লাহর দেয়া বড় উপগ্রহ। আর ছোট্ট উপগ্রহ সমূহ মানুষের বানানো। কৃত্রিম উপগ্রহ আছে বলেই আমরা টিভিতে বিদেশী যেকোন কিছু লাইভে দেখতে পাই, বিদেশের ফোন পাই।
আমি হা হয়ে সেসব শুনতাম। আর ভাবতাম, ছেলেবেলায় ঘরের বাইরে উঠোন কোনে শুয়ে আব্বার হাতের উপর মাথা দিয়ে আকাশে যেসব চলমান তারা দেখতাম ওসবই হলো স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ। আব্বার সাথে গরমের দিনে বাইরে বিছানা পেতে ঘুমাতাম। প্রায় প্রতি রাতেই উচ্চ আকাশে চলমান তারা দেখিয়ে আব্বা বলতেন, দেখ রকেট যায়। সত্যি বড় অদ্ভুত। অনেক তারার মাঝে কেবল একটি তারা চলমান। স্যারের কথায় বুঝলাম ওটাই আসলে স্যাটেলাইট।
ভার্সিটি লাইভে এসে দস্তুর মত টিভিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখতাম এই স্যাটেলাইটের কল্যাণে। আর দেখতাম রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেবের বিদেশ ভ্রমণের ভিডিও। দিনের ভিডিও দিনেই চলে আসতো। খুব অবাক হতাম এই ভেবে যে, কিভাবে বিদেশ থেকে ভিডিও ঢাকা চলে আসে! এরপর আসলো মোবাইল ফোন। বাড়লো তার ব্যবহার। আসলো স্যাটেলাইট চ্যানেল। ঘরে ঘরে শুধু চ্যানেল আর চ্যানেল। স্যাটেলাইট লাইভ; কথায় কথায় লাইভ।
কথায় কথায় সব কিছু এত সহজ হয়ে যাবার বিষয়টি সাধারণ মানুষ না বুঝুক, সরকার বুঝতে শুরু করলো। আর শুরু করলো স্বপ্ন দেখতে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে স্যাটেলাইট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এক পর্যায়ে ১৯৯৮ সালে স্যাটেলাইট সংক্রান্ত একটি কমিটি করা হয়। সেই সময় বিটিসিএল’র একজন কর্মকর্তাকে ফ্রান্স পাঠানো হয় স্যাটেলাইট সম্পর্কে জানতে। তিনি ফ্রান্স ঘুরে এসে একটি নেতিবাচক রিপোর্ট দেন। তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল এটি একটি ব্যয়বহুল কাজ। এটা করতে বিরাট অংকের টাকার প্রয়োজন হবে।
এরপরও তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, একদিন বাংলাদেশ স্যাটেলাইটের মালিক হবে। প্রধানমন্ত্রীর সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন বলেই আজ তা বাস্তব। এবং বড়ই আনন্দের হলো, বিশ্বের ৫৭ তম দেশ হিসেবে মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক এখন বাংলাদেশ। ১৬০ টি দেশের মধ্যে এখনো ১০৩ টি দেশ মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশের জন্যে এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে! নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করার পর বলা যায় অনেকটা নিজেদের টাকায় মহাকাশ বিজয়।
কিন্তু জানেনা বলে অনেকেরই জিজ্ঞাসা, প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা এই স্যাটেলাইট দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আসলে কী সুবিধা হবে? তিন ধরনের সুফল দেশের মানুষ পেতে পারে এ স্যাটেলাইট থেকে। প্রথমত, এ স্যাটেলাইটের সক্ষমতা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সাশ্রয় দু’টিই করা যাবে। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, দূর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় দারুন কার্যকর ভূমিকা রাখবে এই স্যাটেলাইট। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানো সম্ভব।
তবে এসব সম্ভাবনাকে ছাড়িয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেটি হলো বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। অনেক আগেই ডিজিটাল বাংলাদেশের কনসেপ্ট দেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করেছে। তবে মুখে যতই ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলি না কেন, ডিজিটালের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেবার লক্ষ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো, সাবমেরিন কেবল কানেকশন এবং মহাকাশে নিজস্ব উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন। বর্তমান সরকার ২০০৮ এ ক্ষমতায় এসেই সমুদ্রের তলদেশে সাবমরিন কেবল কানেকশন দিতে সক্ষম হয়। বাকী ছিল মহাকাশে উপগ্রহ উৎক্ষেপন। এবার এটাও সফলভাবে সম্পন্ন হলো।
আর বাংলাদেশ দখল করে নিল বর্হিবিশ্বে গর্ব করার মত অত্যন্ত সম্মানিত একটি জায়গা। এরপরও এই গর্ব করার বিষয়টি নিয়ে স্যোসাল মিডিয়াতে নোংরামি করেছে এই দেশেরই মুখচেনা একটি পক্ষ। বিশ্রী সমালোচনা করার চেষ্টা করেছে। টিটকারী করেছে; এত বড় অর্জনকে যথেষ্ট পরিমানে খাটো করার চেষ্টা করেছে। খাটো করার চেষ্টা করেছে এই দেশকে, দেশের স্থপতি তথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে। তাঁর ছবি বিকৃত করে রকেট বানিয়ে নানাভাবে ব্যঙ্গ করেছে।
দুঃখজনক হলো একপক্ষের এসব কান্ড দেখে অপরপক্ষও কোন চেষ্টা করেনি। চেষ্টা করেনি বিশাল এই অর্জনকে নিয়ে আনন্দ করতে; সারা বাংলায় আনন্দ ছড়িয়ে দিতে। চেষ্টা করেনি বাংলার মানুষকে স্যাটেলাইট বিষয়টি বুঝাতে। অথচ এরাও আনন্দ করে। প্রকাশ্যেও করে, গোপনেও করে। ষ্টেডিয়ামে করে, ষ্টেডিয়ামের বাইরেও করে। ক্রিকেট নিয়ে করে, ফুটবল নিয়ে করে। অন্যদেশের পতাকা নিয়ে করে। রাজনীতি নিয়ে করে। রাতভর করে; মাসভর করে।
আমরা মাসভর না করি, অন্তত একটা দিন তো এর জন্যে উৎসর্গ করতে পারি। আসছে ঈদের দিনেও তো পারি। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের আনন্দের সাথে ঈদের আনন্দকে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে দিতে পারি! বরাবরের চেয়েও এবার আরো বেশী আনন্দ মনে খুব করে সবাইকে জোর গলায় বলতে পারি, ঈদ মোবারক!! পারি না!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।