ঈদকে কেন্দ্র করে বেপরোয়া প্রতারকচক্র

12

যুগবার্তা ডেস্ক: ঈদ আর রমজানকে ঘিরে রাজধানীসহ সর্বত্রই অপরাধ-প্রতারণা বেপরোয়া রƒপ নিয়েছে। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন অপরাধ চক্র, যত্রতত্র পাতা হচ্ছে অভিনব প্রতারণার ফাঁদ। মহল্লার ছিঁচকে মাস্তান থেকে শুরু করে পেশাদার অপরাধী-শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, পকেটমারসহ বিভিন্ন চক্র নানারকম ধান্ধাবাজির মওকা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অপহরণ, মুক্তিপণ, ছিনতাই, ডাকাতি দেদার চলছে। আছে অজ্ঞান পার্টি, থুথু পার্টি, ধাক্কা পার্টির সীমাহীন দৌরাত্ব্য। বেড়ে গেছে ছিনতাই-রাহাজানি। সবার দরকার মোটা অংকের টাকা, রমরমা ঈদ বাণিজ্য। এতসব অপরাধ-অপকর্মের ধকলে হাজারও মানুষকে সর্বস্বান্ত করার মধ্য দিয়েই চলছে ঈদ ধান্ধা। ঘর থেকে দু-পা ফেলতেই হরেক প্রতারণার বেড়াজালে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মানুষজন। অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েও নিস্তার মিলছে না, অনেক ক্ষেত্রে জীবনটাও হারাতে হচ্ছে। অন্যান্য অপরাধ প্রতারণাও ইদানীং ডিজিটাল রুপ পেতে শুরু করেছে। রাজধানীতে একদল প্রতারক তরুণী বসিয়েছে নিত্য প্রতারণার আসর। তাদের পেছনে স্থানীয় থানার দুর্নীতিপরায়ণ পুলিশের নেপথ্য সহায়তাও রয়েছে। প্রতারণার আস্তানায় পুলিশের সিভিল টিম পরিচয়ে দফায় দফায় সাজানো অভিযান চালিয়ে কথিত খদ্দেরদের টাকা-পয়সা, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
বহুরƒপী এক প্রতারকের সন্ধান পাওয়া গেছে উত্তর বাড্ডা এলাকায়। সেখানে ভুয়া অফিস সাজিয়ে তিনি এসটিভির পরিচালক পরিচয় দিয়ে দেশজুড়ে সাংবাদিক কার্ড বিতরণসহ নানারকম ধান্ধাবাজির কার্যক্রম চলে সেখানে। ভাড়া করে নেওয়া মাইক্রোবাসে আইন-আদালত লেখা ব্যানার লাগিয়ে বিভিন্ন স্থানে হরদম অপকর্ম করে বেড়ায় চক্রটি। তারা মিডিয়ার সাংবাদিক ও মডেল বানানোর নামে নানারকম প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে। নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে টহল পুলিশ ছাড়াও বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্টের আদলে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়। সেসব স্থানে রাতভর পুলিশকে সহায়তা দেওয়ার নামে সোর্স পরিচয়ে চিহ্নিত যুবকদের আনাগোনা থাকে। তারা রিকশা যাত্রী বা নিরীহ পথচারীর দেহ তল্লাশির নামে আশপাশে নিয়ে পকেট-মানিব্যাগ হাতরাতে থাকে। একপর্যায়ে নিজেদের আক্সগুলের চিপায় ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে তা ভুক্তভোগীর পকেট থেকে তা উদ্ধার দেখায়। শুরু হয় দর কষাকষি, ˆহচৈ, চড়-থাপ্পড়। চাহিদা মাফিক অর্থ আদায়ের পরই ভুক্তভোগীরা ছাড়া পায় বলে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
নানা প্রলোভনে নতুন কৌশলে অপহরণ-মুক্তিপণ আদায় ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটাচ্ছে দুর্ধর্ষ নারী অপরাধী চক্র। কখনো কখনো গায়ে পড়েই কারও সঙ্গে বিবাদ সৃষ্টি করছে, কুপ্রস্তাব দেওয়ার মিথ্যা কথা বলেও পথেঘাটে জিম্মি করে টাকা আদায় করছে এ চক্রের সদস্যরা। চক্রগুলো উত্তরা, গুলশান, ধানমন্ডি ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় সক্রিয়। চন্দ্রিমা উদ্যান, শ্যামলীর শিশুমেলা, মিরপুর চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশুপার্ক, রমনা পার্ক, গুলিস্তান, মতিঝিলসহ আরও কিছু স্থানে এসব নারী অপরাধী সিন্ডিকেটের তৎপরতা রয়েছে।
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালকে ঘিরে একটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ, আনসার সদস্য, ঘাটের কুলি ও অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একাধিক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মদদে এই চক্রের সদস্যরা পুরো ঘাট এলাকায় রাজত্ব কায়েম করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি টানা পার্টির কাছেও জিম্মি হয়ে পড়েছে এ ঘাটে আগত যাত্রীরা। পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সামনেই প্রতারক চক্রটি সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে জোর করে মালপত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া টার্মিনালের সামনে থেকে সামান্য দূরত্বে হালকা ও মাঝারি ওজনের মালপত্র বহন করে কুলিরা যাত্রীদের কাছে দাবি করছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। দাবি অনুযায়ী টাকা না পেলেই নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে যাত্রীদের।
রাজধানীতে সক্রিয় তিন শতাধিক ছিনতাইকারী। ঈদকে সামনে রেখে অভিনব কায়দায় ছিনতাইয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তারা। সাংবাদিক, ডিবি পুলিশসহ নানা পরিচয়ে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে লুটে নিচ্ছে তাদের অর্থ-সম্পদ। এমনকি একশ্রেণীর নারী ছিনতাইকারীও ব্ল্যাকমেইল করে দিনদুপুরে হাতিয়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। সুন্দরী তরুণীদের এই কাজে ব্যবহার করছে প্রতারক চক্র। ঈদকে সামনে রেখে অভিনব কায়দায় রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই চক্রের সদস্যরা। প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এই চক্রের কবলে পড়ে ছিনতাই ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ঘটছে চাঁদাবাজির ঘটনাও। ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ব্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টাকার লেনদেন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রমজান শুরুর পর পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও নিয়ন্ত্রণে নেই ছিনতাই। দিনে-দুপুরে শত শত মানুষের সামনেই অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব ছিনিয়ে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। নগরীর বিভিন্ন স্থানে যেখানে যাত্রীবাহী গাড়ির সংকট থাকে সেখানেই মাইক্রোবাস নিয়ে অবস্থান নেয় তারা। গাড়িতে যাত্রী উঠানোর নাম করে দুই একজনকে তোলে। গাড়িতে থাকা অন্যরা তাদের লোক। গাড়ি তো তোলার পর সুযোগমতো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয় তারা। এভাবে প্রতিদনিই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, রাজধানীতে ডিএমপির (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) আওতাধীন আটটি ক্রাইম জোনের প্রতিটিতেই ১০-১২টি করে ছিনতাইকারী চক্র রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে শতাধিক ছিনতাইকারী চক্র রয়েছে। এই চক্রের সদস্য তিন শতাধিক। ছিনতাইকারীদের কাছে আগেśয়াস্ত্র থেকে শুরু করে ধারালো অস্ত্র রয়েছে। মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, কখনও প্রাইভেট কারে করে তারা শহরজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছিনতাইয়ের সঙ্গে রয়েছে মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, কথিত মডেল পার্টির উৎপাত।