মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরীর পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এক দশকে মারা গেছেন ৮৮৩ জন

33

যুগবার্তা ডেস্ক: মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে রাজধানীর বর্জ্য অপসারণের কাজ করায় গত এক দশকে সিটি করপোরেশনের ৮৮৩ জন তালিকাভুক্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মী মারা গেছেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শুধু জীবিকার তাগিদে এ কাজ করতে গিয়ে ওই পরিচ্ছন্ননতা কর্মীরা ক্যানসার, অ্যাজমা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, বক্ষব্যাধিসহ বিভিনś রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সিটি করপোরেশনের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অবগত থাকলেও পরিস্থিতির উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সহজভাবে করার পর্যাপ্ত আধুনিক পরিচ্ছন্ন সরঞ্জাম দিতে ব্যর্থ হয়েছে দুই সিটি করপোরেশনই। এমনকি এই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করার কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করা হয় না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। ভয়াবহতা স্বীকার করে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন তারা। সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মী রয়েছেন ৭ হাজার ৯৫৯ জন। এর মধ্যে ডিএসসিসির রয়েছে ৫ হাজার ২১৭ কর্মী। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৯০৫ এবং নারী ২ হাজার ৩১১ জন। অন্যদিকে ডিএনসিসির সরাসরি তত্ত্বাবধানে বর্তমানে দুই হাজার ৭৪২ জন পরিচ্ছনśতা কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে ৮০০ জন স্থায়ী এবং এক হাজার ৯৪২ জন মাস্টার রোল কর্মী। স্থায়ী পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা মাসিক ২২-২৩ হাজার টাকা বেতন পান। আর অস্থায়ী কর্মীরা ˆদৈনিক ৪৭৫ টাকা হারে মাসিক ১৪ হাজার ২৫০ টাকা বেতন পান। এ ছাড়া এর বাইরে এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন আরো প্রায় ৪ হাজার কর্মী। এর বাইরেও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন দ্রব্য কুড়ানোর বিনিময়ে কাজ করেন বেশ কিছু হতদরিদ্র মানুষ। বাসাবাড়ি থেকে ডাস্টবিন ও ডাস্টবিন থেকে মূল ভাগাড়ে আবর্জনা চলে যাচ্ছে এই মানুষগুলোর হাত হয়েই। নিবন্ধিতদের বেতন চলনসই হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় তা নগণ্য। আর অবশিষ্টদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে এই কঠিন কাজে জড়িয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুকেই যেন আলিঙ্গন করছেন তারা।
পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের রাস্তা ঝাড়– দেওয়া, সেই ময়লা নিয়ে যাওয়া এবং ডাস্টবিন ও বাসাবাড়ির ময়লা পরিষ্কার করতে হয়। এ ছাড়া স্টর্ম সুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার এবং ল্যান্ডফিলে ময়লা ওঠানো-নামানোর কাজ করতে হয়। এসব ময়লা ফেলতে সিটি করপোরেশন থেকে হ্যান্ডস গ্লভস দেওয়া হয়, কিন্তু অনেকেই এটি ব্যবহার করে ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এ কারণে বেশির ভাগ পরিচ্ছন্নতা কর্মীই খালি হাত-পায়ে কাজ করেন। এতে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন কর্মীরা। রোগব্যাধির কারণে অনেকেই লিভার ও ফুসফুসজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু অর্থাভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে না পেরে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছে। এ ছাড়া, চর্ম ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন প্রতিনিয়ত।
তথ্যমতে, গত এক যুগে রাজধানীতে মারা গেছেন ৮৮৩ জন নিবন্ধিত পরিচ্ছন্নতা কর্মী। এর মধ্যে ডিএনসিসির ৪৭২ জন ও ডিএসসিসির ৪১১ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী। দুই সিটিতে ২০০৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রতি বছর ৫৩ থেকে ৭২ পর্যন্ত ওঠানামা করলেও ২০১৭ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ জনে। তাদের মধ্যে অ্যাজমায় ২৭ শতাংশ, ক্যানসারে ২২, হৃদরোগে ১৮, স্ট্রোকে ৭ এবং বার্ধক্য ও দুর্ঘটনাজনিত কারণে মারা গেছেন ২৬ শতাংশ কর্মী। আর নিবন্ধনের বাইরে থাকা কর্মীদের ব্যাপারে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্যই নেই কারো কাছে ।