টাকার জন্য ছিনতাই ও মাদক ব্যবসায় জঙ্গিরা

4

যুগবার্তা ডেস্কঃ সংকটে পড়েছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও দেশের বাইরে প্রবাসীদের কাছ থেকে জঙ্গি সংগঠনগুলোর ফান্ডে টাকা জমা হওয়ার তথ্য গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে ধরা পড়েছে। এ কারণে এখন আর কেউ তাদের ফান্ডে টাকা দিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন না। তাই ফান্ড সংকট কাটাতে ভিন্ন কৌশল বেছে নিয়েছে তারা। ফান্ড সংগ্রহে এখন মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়েছে জঙ্গিরা। অতি সম্প্রতি জঙ্গিরা ১৭টি ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে অর্ধশতাধিক জঙ্গি সদস্য।

গ্রেফতারকৃতদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলেন, কোরআন-হাদিসে তো চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই করা জায়েজ নেই, অপরাধ। তখন গ্রেফতারকৃতদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান, সংগঠনের জন্য ছিনতাই-ডাকাতি করে টাকা আনা জায়েজ। জঙ্গি সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা এমন ফতোয়া দিয়ে মাঠে নামিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের। এটি মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের মগজ ধোলাই দিয়ে বিশ্বাসও করানো হয়েছে। এ কারণে অনেকে না জেনে ছিনতাই-ডাকাতি ও মাদক ব্যবসায় নেমে সংগঠনের ফান্ড সংগ্রহ করছেন।
সূত্র জানায়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানা সংগঠনের জঙ্গি গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু তাতে শঙ্কামুক্ত হওয়ার সুযোগ কম। তারা ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা করছে। আত্মগোপনে থাকা নেতারা গোপনে সাংগঠনিক কাজ অব্যাহত রেখেছে বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে। এদিকে হুজুর সেজে মাদক ব্যবসা করছে জঙ্গিদের একটি অংশ। ইতিমধ্যে কয়েকজন হুজুর মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছেন। জঙ্গিদের ছিনতাই ও ডাকাতির টাকা ৪ ভাগ হয়। এক ভাগ অস্ত্রের জন্য, যেখান থেকে অস্ত্র আনা হয় সেখানে অস্ত্রের ভাড়া বাবদ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ভাগ বিভিন্ন যানবাহন ও লজিস্টিক সাপোর্টে ব্যয় করা হয়। তৃতীয় ভাগ সংগঠনের জন্য এবং চতুর্থ ভাগ যারা ছিনতাই, ডাকাতি করে তারা পায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৩-২০০৪ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন এনজিওতে ডাকাতি করে তহবিল সংগ্রহ শুরু করে। পরবর্তীতে তারা নিয়মিতভাবে তহবিল সংগ্রহের জন্য ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদক ব্যবসায় নামে। সম্প্রতি রংপুরের কাউনিয়ায় জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা বিকালের দোকানে ৬ লাখ টাকা লুট করেছে। বগুড়া সাবগ্রামে একটি বাড়ি থেকে ৮ লাখ টাকা, গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানা থেকে ৩৫ লাখ টাকা, ঠাকুরগাঁও এর বালিয়াডাঙ্গা গ্রাম থেকে ২৮ লাখ টাকা লুট ও ছিনতাই করেছে জঙ্গিরা। এছাড়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সিগারেট বিক্রির ৪ লাখ টাকা লুট করে জঙ্গিরা। গাইবান্ধার যাত্রা প্যান্ডেলে এক পুলিশ সদস্যের মোটর সাইকেল ছিনতাই করেছে জঙ্গিরা। ঢাকার আশুলিয়ায় কাঠঘরা বাজারে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি করে জঙ্গিরা। উক্ত ঘটনায় ব্যাংক কর্মচারীসহ ৮ জন নিহত হয় এবং জঙ্গিরা ৭ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। নংসিংদীতে স্বর্ণের দোকান লুট করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে জেএমবি সদস্য ফজলুল হক অনিল। পরবর্তীতে মামলা তদন্তে অন্যান্য জঙ্গি সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। দিনাজপুরে দৃপ্তি ফিলিং স্টেশনে ডাকাতি করতে গিয়ে ৩টি পিস্তলসহ ধরা পড়ে জেএমবির ৪ সদস্য এবং ঘটনাস্থলে গণপিটুনিতে নিহত হয় সাব্বির নামক একজন জেএমবি সদস্য। আটক চার জন জেএমবি সদস্যই বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করে।
পশ্চিম নাখালপাড়ায় সেলুন ব্যবসায়ীর ৩২৭/১ নম্বর বাড়িতে এবং দক্ষিণ মহাখালীর জিপি-ক ৩০ নম্বর, ডিস ব্যবসায়ী রাসেলের বাসায় ডাকাতি করে জঙ্গিরা। বনানী থানার ডাকাতি মামলায় সংশ্লিষ্টতায় সিটিটিসি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এলআইসি অভিযান পরিচালনা করে ১১ জন জেএমবি সদস্যকে ডাকাতির ৬৭ ভরি স্বর্ণ, ৬ লক্ষ টাকা, ৪টি পিস্তল, ৫টি ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড গুলি, ৯টি চাপাতি ও ৪টি ল্যাপটপসহ গ্রেফতার করে। রাজশাহীর তাড়াসে একটি বাড়িতে বোমা বানাতে গিয়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। কাটাখালী হরিয়ান রহমান জুট মিলে কর্মচারীদের বেতনের ১৭ লাখ টাকা ছিনতাই করে জঙ্গিরা। সম্প্রতি মতিহার থানা এলাকায় গোল্ড লিফ কোম্পানির ৬০ হাজার টাকা ছিনতাই করে তারা। উক্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত তিন জঙ্গি সদস্যরা হল মাহী, সৈকত ও বুলবুল। দুর্গাপুর থানার কুহার গোল্ড লিফ কোম্পানির ৪৬ হাজার টাকা ছিনতাই করে। এ ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ৫ জঙ্গি সদস্য হল বাবর, মাহী, সৈকত, শাহীন ও বুলবুল।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, ছিনতাই, ডাকাতির পাশাপাশি জঙ্গিরা ইয়াবা ব্যবসা করে আসছে। ইতিমধ্যে ইয়াবাসহ কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জানায় যে, টেকনাফ ও চট্টগ্রাম এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের একটা অংশ জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত। তাদের মাধ্যমে জঙ্গিরা রাজধানী ঢাকাসহ উত্তরাঞ্চলে ইয়াবা সরবরাহ করে আসছে। ইয়াবার চালানসহ ১০ জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়।-ইত্তেফাক