পরিবেশ বিজ্ঞানীদের গবেষণায় সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র হুমকিতে

10

মোংলা থেকে মোঃ নূর আলমঃ সুন্দরবনের চারপাশের সব কারখানা পুরোদমে চালু হওয়ার আগেই সুন্দরবনের ক্ষতি শুরু হয়েছে। বনের শুধু উদ্ভিদ ও প্রাণীই ধ্বংস হচ্ছে না, কারাখানার আশপাশের এলাকার খাদ্যচক্রও ভেঙ্গে পড়ছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই শ্বাসমূলীয় বনের চারপাশে ২০০টির মতো কারখানা নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষতির এই চিত্র পাওয়া গেছে। সব কারখানা নির্মাণ শেষে পুরোদমে চালু হলে ক্ষতির পরিমান আরও বাড়বে। সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকদের এক গবেষনায় এই চিত্র উঠে এসেছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ্ হারুনের নেতৃত্বে নিয়মিত গবেষণার অংশ হিসেবে একদল গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায় পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র বস্তুকণার সংখ্যা সুন্দরবনের পাশের শিল্পকারখানা এলাকায় অনেক বেশি, প্রতি লিটারে ৬৭৮ মাইক্রোগ্রাম। আর কারখানা নেই এমন এলাকায় তা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১৫.৮ মাইক্রোগ্রাম। ভাসমান ক্ষুদ্র বস্তুকণা বেড়ে গেলে পানির নিচে যথেষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন পৌঁছায় না, এতে জলজ পরিবেশে পানির প্রথম স্তরের শক্তি উৎপাদক উদ্ভিদকণা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। উদ্ভিদকণা হলো প্রাণীকণার প্রাথমিক খাদ্য। উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণা আবার মাছের খাদ্য। মাছ বড় প্রাণীর খাবার। এভাবে উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণা থেকে শুরু করে বাঘ পর্যন্ত সুন্দরবনের খাদ্যচক্র গড়ে উঠেছে। উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণা কমে গেলে ধাপে ধাপে বাঘ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

সমীক্ষায় সুন্দরবনের পাশে কারখানা আছে এমন এলাকার বনে উদ্ভিদ কণা পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৩০ প্রজাতির। আর শিল্পকারখানা নেই এমন এলাকায় তা ৫১ প্রজাতির। এই দুই ধরনের এলাকায় যথাক্রমে ২০ ও ২৯ প্রজাতির প্রাণীকণা পাওয়া গেছে। জলজ পরিবেশের খাদ্যচক্রে ভেঙে পড়ায় ব্যাঙের রেণুর ওপর মারাতśক প্রভাব পড়ছে।

শিল্পকারখানার এলাকার মাটি দূষিত হয়ে পড়ছে। কারখানা রয়েছে এমন এলাকার প্রতি কেজি মাটিতে সর্বোচ্চ ১৫.৬ মাইক্রোগ্রাম তেল পাওয়া গেছে। আর শিল্প কারখানা নেই এমন এলাকায় এর পরিমান সর্বোচ্চ ৭.৬ মাইক্রোগ্রাম। শিল্প কারখানা এলাকায় বাতাসও দূষিত। সেখানে বাতাসে সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ক্ষুদ্র বস্তুকনার পরিমান স্বাভাবিক এর চেয়ে কয়েকশগুন বেশী। গবেষনায় কারখানার পাশ্ববর্তী নদীতে প্রতি ঘন্টায় ৭-৮ ডলফিন দেখা গেছে, অথচ কারখানা নেই এমন স্থানে ডলফিন দেখা গেছে ১৫-১৭টি। সমীক্ষায় কারখানার পাশে সুন্দরবন এলাকায় বাঘের বিচরণ কমেছে বলেও লক্ষ্যে করেছেন গবেষকরা। গবেষনা এলাকার পশুর নদী ও খালসমূহে গবেষনাকালে বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেছে ৩-৪টি, অথচ ২০১০ সালের পূর্বে একই এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেছে ৯-১২টি । অন্যদিকে গবেষনায় লক্ষ্য করা গেছে সুন্দরীগাছের বীজ নষ্ট হচ্ছে ৭০% ।
সুন্দরবনের পশুপাখি, গাছ, বাঘ, বন্য শুকর, মাছসহ ২৫ প্রজাতির জলজ ও উদ্ভিদের সংখ্যা শিল্প-কারখানা এলাকায় কম বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এসব প্রজাতি মিলে বনের জীববৈচিত্র্য। এসব প্রজাতি হুমকীর মুখে পড়লে গোটা বনে এর প্রভাব পড়বে।

সুন্দরবনের ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ আব্দুল মতিন বলেন সুন্দরবন বিনাশী নানা পদক্ষেপ আমরা আজ খুবই উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবনের পাশ ঘেঁষে ৩২০টি শিল্প প্লট বরাদ্দ করেছে। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন যে, এসব প্লটে কোন শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমতি দেয়া হবেনা, কিন্তু তার সরকার এই বনের বাফার জোনের মধ্যেই ১৯০টি শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছেন, যার মধ্যে ০৮টি এলপিজি সহ মোট ২৪টি লাল ক্যাটাগরির বা চরম দূষণকারী স্থাপনা হতে যাচ্ছে। সবচেয়ে মারাত্মক খবরটি হচ্ছে, লাল ক্যাটাগরির এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যায্যতা দেওয়ার লক্ষ্যে আমাদের পরিবেশ আইনটিই সংশোধন করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন ১৯৯৯ সন থেকেই সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিমি স্থান সরকারিভাবে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন’ হিসেবে ঘোষিত হয়ে আছে, যেখানে কোন অবকাঠামো স্থাপনের পূর্বে বন ও প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোও বলেছে যে, কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা না করে এখানে কোন শিল্প স্থাপনা করা যাবেনা। বিষয়টির প্রভুত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ইউনেস্কো এক তদন্তের ভিত্তিতে গত বছর (২০১৭) জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে সুন্দরবন বিষয়ে কয়েকটি পরিস্কার প্রস্তাব গ্রহন করেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে: “বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা (ঝঊঅ) সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত, বাংলাদেশ অত্র এলাকায় কোন প্রকার শিল্পভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হবেনা”। কমিটি আরো যা বলেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: বন বাঁচাতে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার মাধ্যমে উজানের নদী (গঙ্গা) থেকে বনের মধ্যে স্বাদু পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করতে হবে, ২০১৬ সনে ইউনেস্কো মনিটরিং মিশন প্রদত্ত বন বিষয়ক সকল সুপারিশ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে, বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ন্যাশনাল অয়েল স্পিল অ্যান্ড কেমিক্যাল কন্টিনজেন্সী প্ল্যান (ঘঙঝঈঙচ) বাস্তবায়ন করতে হবে, পশুর নদে কোন ড্রেজিং করার আগে বনের উপর তার প্রভাব বিষয়ে সমীক্ষা (ঊওঅ) করতে হবে ইত্যাদি।

এ বিষয়ে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন দেশবাসীর গভীর উদ্বেগ ও বিজ্ঞানীদের গবেষনার বিপরীতে সুন্দরবন প্রশ্নে সরকারী নির্লিপ্ততা ও সুন্দরবন বিনাশী কার্যক্রমে সারাদেশবাসীই উদ্বিগ্ন। সুন্দরবন রক্ষার আকুতি আজ সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ছে ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাজার হাজার বছরের পরিপূর্ণতায় যে অনন্য সুন্দরবন ˆতরী হয়েছে তাকে সম্পদ ও পরিবেশ বিনাশী কোন কর্মকান্ড দ্বারা ধ্বংসের মূখে ঠেলে দিতে দেওয়া যাবে না। এটি সময়ের দাবী, দেশবাসীর দাবী, সারা বিশ্বের দাবী। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রতিঘাত মোকাবিলায় অক্ষত-সতেজ সুন্দরবন একটি বিশাল প্রয়োজনীয় বিষয়।

তিনি আরো বলেন মনে রাখতে হবে সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্ববাসীর সম্পদ, এর ক্ষতি করার কোন অধিকারই আমাদের নেই। আমরা এই বনের গর্বিত অভিভাবক। এই গর্বের সাথে জড়িয়ে আছে বন রক্ষায় আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। দেশ ও তার জনগণ-প্রকৃতি-সম্পদ-অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের স্বার্থে আমাদেরকে সুন্দরবন সুরক্ষার জন্য প্রবলভাবে উদ্যোগী হতে হবে। গবেষণায় উল্লেখিত বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার পরিচালক মোঃ হাবিবুল হক খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন গবেষণা সম্পর্কে জানা নেই। কেউ আমাদের কাছে গবেষণাপত্র জমা দেয়নি। মৎস্য এবং প্রানী সম্পদ অধিদপ্তর এ বিষয় ভালো বলতে পারবে। সুন্দরবনের পাশে শিল্প-কলকারখানা আগে থেকেই ছিলো।