আকারে বাড়ে বাজেট বাস্তবায়নে পেছায়

5

যুগবার্তা ডেস্কঃ দেশে বাজেট বাস্তবায়নের হার সন্তোষজনক নয়। খরচ করতে না পারার আশঙ্কায় বছরের মাঝামাঝি আবার বাজেট সংশোধন করে সরকার।

বছর শেষে সংশোধিত বাজেটের অর্থও সরকার পুরোপুরি খরচ করতে পারে না। গত কয়েক বছরের বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেও। গত ২৮ মে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের হার প্রতিবছর কমছে। একসময় ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়ন হতো। এখন সেটা ৮০ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য মতে, গত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়িত হয়েছে ৮৯ শতাংশ। তার আগের বছর ৯২ শতাংশ, তার আগের বছর ৯১ শতাংশ এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ৯৩ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে খরচ হয়েছে এডিপির মাত্র ৫২ শতাংশ অর্থ।
এ অবস্থায় বাজেটের আকার বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।

তাঁরা বলেছেন, সরকার প্রতিবছর ঢাউস আকারের বাজেট দিয়ে কৃতিত্ব নেয়। বিভিন্ন মহল থেকে বাহবা দেওয়া হয়। কিন্তু যে বাজেটের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়, সে বাজেটের কৃতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। গতকাল শনিবার বাজেট নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে তাঁরা এ প্রশ্ন তোলেন। রাজধানীর বনানীতে হোটেল গোল্ডেন টিউলিপে ওই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)।
পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরের সঞ্চালনায় ‘জাতীয় বাজেট ২০১৮-১৯ শেষ মুহূর্তের ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, ৮ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইলে বাড়াতে হবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ওপর দিতে হবে বিশেষ নজর। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বাড়াতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে আনতে হবে গতি। রাজস্ব আহরণ জিডিপির অনুপাতে বাড়াতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংক সংস্কারে কমিশন গঠন, সুষ্ঠুভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি মিলে কমিশন গঠন, শিক্ষা খাতে কৌশল পরিবর্তন, সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে বলেছেন অর্থনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীরা।

সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু সে বাজেট কি বাস্তবায়নযোগ্য? শোনা যাচ্ছে, আসছে বাজেটের আকার হতে পারে চার লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু আপনি যে বড় অঙ্কের বাজেট দিচ্ছেন, বছর শেষে সেটি কি খরচ হচ্ছে? গত বছর বাজেট ছিল তিন লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। সেখানে টেনেটুনে খরচ হয়েছে দুই লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার চার লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। বছর শেষে দেখা যাবে সর্বোচ্চ খরচ হয়েছে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো। তাহলে এত বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘোষণার অর্থ কী, যদি আপনি সেটা খরচই করতে না পারেন?’ বাস্তবতার নিরিখে বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দেন তিনি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন দেশে বাজেট ঘোষণার পর বলা হতো গরিব মারার বাজেট। সব পণ্যের দাম বেড়ে যেত। এখন অবশ্য সে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এখন বাজেট ঘোষণার পর বলা হয় ব্যবসাবান্ধব বাজেট। কিন্তু কেউ বলে না বাজেট ভোক্তাবান্ধব। আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম এখন স্থিতিশীল। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রভাব নেই। পণ্যের দাম কমে না। কিন্তু যখন আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, তখন আমাদের ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা দিয়ে দাম বাড়ায়। এটা অনৈতিক। ’

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলমের মতে, ভোক্তা কখনো ভর্তুকির সুবিধা পায় না। যে ভর্তুকির সুবিধা ভোক্তা পায় না, তার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। দাম নির্ধারণে সরকারি সংস্থার কাছ থেকে ন্যায্য আচরণ পাওয়ার অনুরোধ জানান শামসুল আলম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘জ্বালানির দাম নির্ধারণে ভোক্তা অন্যায়, অন্যায্য ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের শিকার হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম কমানোর কথা বলছি। বিচার শেষ, কিন্তু রায় হয়নি। বিশ্বের আর কোনো দেশে এমন আছে কি না, বিচার শেষ কিন্তু রায় হয় না!’

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ‘ব্যাংকের সুদের হার বেড়ে যাওয়া একটা অশনি সংকেত। ব্যাংকগুলো আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সুদের হার কমাবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি তারা পূরণ করেনি। সুদের হার এখন পর্যন্ত কমেনি। বছরের পর বছর ধরে আমরা ব্যবসায়ীরা একই ছাদের নিচে সব সেবা পাওয়ার জন্য গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে আসছি, কিন্তু ওয়ান স্টপ সার্ভিস এখনো কার্যকর হয়নি। ফলে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অফিসে গিয়ে আমাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। গ্যাস সংযোগ ও অবকাঠামো দুর্বলতা রয়েই গেছে। ’ এসব কারণে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে বলে মত দেন তিনি। আসিফ ইব্রাহিম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের ব্যবসাসংক্রান্ত খরচ বেড়ে গেছে। সরকার সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটিও পুরোপুরি চালু হয়নি। সরকারের এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার যতটুকু সমন্বয় থাকা জরুরি তা-ও দেখতে পাচ্ছি না। ’ ব্যবসাসংক্রান্ত খরচ কেন বেড়েছে, অর্থঋণ আদালতে কেন বছরের পর বছর ধরে মামলা ঝুলে থাকে, চুক্তি করতে কেন এত সময় লাগে, সুশাসন কেন এত দুর্বল—এসব প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে তিনটি সুপারিশ তুলে ধরেন। সেগুলো হলো—প্রথমত ব্যাংক খাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠন; দ্বিতীয়ত সরকারের চলমান প্রকল্পগুলো যাতে ঠিক সময়ে শেষ করা যায় সে জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি কমিশন গঠন এবং তৃতীয়ত সরকারি ব্যয় কমিশন গঠন।

পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাঈদী সাত্তার বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) অনুপাতে দেশে রপ্তানি বাড়ছে না। বরং কমছে। অথচ নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে জিডিপি অনুপাতে রপ্তানি বাড়ছিল। তাঁর মতে, দেশে রপ্তানিতে ভাটা পড়তে শুরু করে ২০১২ সাল থেকে। সে ধারা অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এক পোশাক খাত এখনো প্রধান রপ্তানিনির্ভর পণ্য। পণ্য রপ্তানি বহুমুখীকরণের কথা শুনছি, কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশকে হতে হবে রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির দেশ। আজকের দক্ষিণ কোরিয়া, চীন গড়ে উঠেছে রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির কারণে। আপনি ৮ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন। এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে আপনাকে অবশ্যই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। ’ নীতি প্রণয়নে কোথায় গলদ তা খুঁজে বের করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার পদ্মা সেতু, রূপপুর, মেট্রো রেল প্রকল্পসহ ১০টি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এসব প্রকল্পে খরচ হবে দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে এসব প্রকল্প দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে না। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার কম। এতে একদিকে যেমন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে, তেমনি মেয়াদও। ফলে প্রকল্পের সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। প্রবৃদ্ধি অর্জনও ব্যাহত হচ্ছে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প যত কম নেওয়া যায়, তত ভালো। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে বেশি। এতে সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। কারণ আপনি সব প্রকল্পে সমান গুরুত্ব দিতে পারছে না। নামকাওয়াস্তে সব প্রকল্পে কিছু টাকা বরাদ্দ দিচ্ছেন। ফলে এসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না। ’ তিনি আরো বলেন, সরকার সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু কোনো অগ্রাধিকার নেই। অন্ততপক্ষে যদি একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে মডেল ধরে চালু করা যেত, তাহলে ব্যবসায়ীসহ সারা বিশ্বে প্রচার করা যেত ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মডেল নিয়ে। কিন্তু এত বছর হয়ে গেল এখন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলও চালু হয়নি। কারণ অগ্রাধিকার ঠিক নেই। একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করে সেটিকে মডেল ধরে কাজ করার আহ্বান জানান এই অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী আহমেদ বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রাজস্ব আদায়ের হার আমাদের চেয়ে বেশি। ভুটান ও নেপালের মতো দেশে আমাদের চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়। বিষয়টি লজ্জার। নেপালে রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির অনুপাতে প্রায় ১৯ শতাংশ। ভুটানে ১৩ শতাংশ। অথচ আমাদের দেশে মাত্র জিডিপির অনুপাতে ১০ শতাংশ। ’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘যারা কর দেওয়ার যোগ্য, কেন তাদের কাছ থেকে আমরা কর আদায় করতে পারছি না?’ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি ছাড়া করের আওতা বাড়ানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের গত আট অর্থবছর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জিডিপির অনুপাতে করের আওতা বাড়েনি, বরং কমেছে। যদিও নন-ট্যাক্স বেড়েছে। আপনি যদি করের আওতা বাড়াতে না পারেন, তাহলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াবেন কিভাবে? অথচ এ দুটি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। ’ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানোর পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানোর কথাও বলেন এই অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, দেশে সুশাসনের মারাত্মক অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আছে সক্ষমতার অভাবও। সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্রের আওতায় যারা পড়ার কথা নয় তাদের তালিকায় দেখা যাচ্ছে। আবার যারা পাওয়ার যোগ্য তারা বাদ পড়ছে। বাজেটে প্রতিবছর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। আসছে বাজেটে এই দুটি খাতে পর্যাপ্ত টাকা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সাবেক দুই সচিব সোহেল চৌধুরী ও আবদুল মজিদ মনে করেন, বাজেট বাস্তবায়নে যথেষ্ট সক্ষমতার অভাব আছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার সমন্বয় জরুরি। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। সেখানে যথেষ্ট কাজ করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা যুগোপযোগী করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে হবে।-কালেরকন্ঠ