বিএনপির হিসাব মেলা কঠিন

9

যুগবার্তা ডেস্কঃ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতির হিসাব বেশ গোলমেলে ঠেকছে বিএনপির নেতাদের কাছে। বিশেষ করে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তি না পাওয়া এবং খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যালোচনায় ওই হিসাব অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে পারছে না দলটি।
বিএনপি মনে করছে, খুলনার মতোই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফল সরকার কৌশলে অনুকূলে নিয়ে যাবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনের আগে জামিনে মুক্তি পাবেন, এমন আশাও কমতে শুরু করেছে। ফলে নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছুটা ‘উত্তরণ বা পরিবর্তন’ না ঘটাতে পারলে নির্বাচনে অংশ নিয়েও কোনো লাভ হবে না বলে মনে করছেন দলটির অনেক নেতা।

এমনিতেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে বিএনপির মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। একটি অংশ খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাওয়ার বিপক্ষে। ওই অংশের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে আর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ‘নিয়ন্ত্রণে’ রেখেই নির্বাচনের ছক কষছে সরকার। তাই ‘নিয়ন্ত্রিত’ ওই নির্বাচনে গিয়ে কোনো লাভ হবে না। অন্য অংশের মতে, দেশের জনগণের যে মনোভাব তাতে তুলনামূলক সুষ্ঠু একটি নির্বাচন হলেই বিএনপি ক্ষমতায় যাবে।

এমনকি খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও ‘ভোট বিপ্লব’ সম্ভব বলে মনে করেন ওই অংশের নেতারা। তবে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরে দলের এ অংশটি কিছুটা চাপে পড়েছে। নির্বাচনে যাওয়ার বিরোধী অংশ বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে পরিস্থিতি খুলনার মতোই হবে। কৌশলে ফল অনুকূলে নিয়ে নেবে সরকার।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, বর্তমানে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আর এমন অবস্থান নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকলে দেশের রাজনীতিতে অন্য কোনো মেরুকরণ হওয়ার সম্ভাবনাও কম। উপরন্তু উদার ও বামপন্থী বেশির ভাগ দলের নির্বাচনে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে ওই অবস্থায় নির্বাচন থেকে বাইরে থাকা বিএনপির যেমন কঠিন, তেমনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘ভোট বিপ্লব’ ঘটানোও দলটির জন্য কঠিন হবে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, বিএনপির রাজনীতির হিসাব মিলতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তিলাভ করলে পরিস্থিতি এক রকম না হলে অন্য রকম হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এখনই কিছু বলে বিএনপিকে হতাশ করতে চাই না। ’

শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, কিছু বাধা থাকা সত্ত্বেও বিএনপির রাজনীতির হিসাবে প্রত্যাশার অনেক কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, সরকার আগামীতে ফেয়ার নির্বাচন না দিয়ে পারবে না। ফেয়ার হলে এর ফল বিএনপি পাবে। দ্বিতীয়ত, ভারতও গত নির্বাচনের মতো অবস্থান নিয়ে থাকবে না। কারণ তারা এ দেশের জনগণের মনোভাব জানে। আর খালেদা জিয়া

মুক্তি না পেলে নির্বাচনও বিশ্ববাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে নির্বাচন হলে বিএনপি তার সুফল পাবে। ’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাষ্য, বিএনপির কিছু হিসাব মিলবে, কিছু মিলবে না। তাঁর মতে, খালেদা জিয়া জামিন পাবেন। নির্বাচন কিছুটা নিরপেক্ষ হবে। তবে ভারত নিরপেক্ষ হবে না।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, বিএনপির সব হিসাব মেলা কঠিন। কারণ কোনো পরিস্থিতিই বিএনপির অনকূলে নয়। তিনি বলেন, ‘প্রত্যাশা থাকলেও বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোন দিকে থাকবে, সেটিও বলা কঠিন। দৃশ্যমান কোনো ঐক্যও তারা এ পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেনি—এটাই বাস্তবতা। ফলে বিএনপির কোনো হিসাবই আপাতত মিলছে বলে মনে হয় না। ’

বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি দেশের বেশির ভাগ উদার ও বামপন্থী দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করেছিল। আগামী নির্বাচনের আগে ওই দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করার চেষ্টা করছে বিএনপি। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। পরিস্থিতি শেষ সময় পর্যন্ত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে ওই দলগুলোর বিএনপির সঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। উপরন্তু তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এমন পরিস্থিতিতে শুধু বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কতখানি প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কেউ কেউ এমনও বলছেন যে আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। আর এই বিবেচনা সামনে নিয়েই অনেক বাধার পরও দলের বড় একটি অংশ নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। তাদের যুক্তি হলো, নির্বাচনে অংশ নিলে অন্তত বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবে বিএনপি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরও বিএনপির নেতাদের মধ্যে বেশ আশাবাদ ছিল। ভোট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া যাবে—এমন ভাবনাই দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশি কাজ করেছে। সেই হিসাব-নিকাশ থেকেই খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পরও দলটি সহিংসতায় যায়নি। বরং শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতিকেই বড় করে দেখেছেন দলের নেতারা। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে ভারতের সমর্থন আদায়ের বিষয়টিকেও বিএনপি গুরুত্ব দিয়েছে। এ লক্ষ্যে যদিও দলটির তৎপরতা এখনো চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের পর ওই সমর্থন আদায় কতটা সম্ভব, তা নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, ভারতের ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব কী অবস্থান নেয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো চিত্র বিএনপির সামনে নেই। অন্যদিকে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশনসহ সব কিছু এখন সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে বলে মনে করছে বিএনপি। মাদকবিরোধী চলমান অভিযানের পর অস্ত্র উদ্ধার অভিযান শুরু হবে বলে আলোচনা আছে বিভিন্ন মহলে। বিএনপি নেতাদের মতে, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান শুরু হলে জনমনে ভীতি সঞ্চার হবে এবং জনগণ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের অভিযান করার উদ্দেশ্যই হলো জনমনে ভীতি সৃষ্টি করা। এটি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কারসাজির অংশ। ফখরুল অবশ্য বলেন, বিএনপির হিসাব-নিকাশের মূল উপাদান হলো দেশের জনগণ। আর জনগণ বিএনপির সঙ্গে আছে। ফলে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে পরিস্থিতির বদল হবে। তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে আছে। আর উদারপন্থী দলগুলোও গণতন্ত্র উত্তরণে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে থাকবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘খুলনার নির্বাচনে সরকার যা করেছে আগামীতে স্কুল কমিটি, মসজিদ কমিটি এবং জাতীয় নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে সরকার একই কাজ করবে। ম্যাডামকেও মুক্তি দেবে বলে মনে হয় না। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী করে, এই আশায় বসে থাকলে চলবে না। ওই হিসাবে বিশ্বাস অন্য কারো থাকলে থাকতে পারে, আমার নেই। ’ তিনি বলেন, বিএনপির ভাগ্য বিএনপির নিজেরই পরিবর্তন করতে হবে। আন্দোলন ছাড়া পথ নেই।-কালেরকন্ঠ