ফেরিঘাটে অরাজকতা

4

যুগবার্তা ডেস্কঃ আসন্ন ঈদে রাজধানী থেকে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। কিন্তু নানা কারণে প্রতিবছরই দুর্ভোগ আর ভোগান্তি পোহাচ্ছে মানুষ।

ঘরমুখো মানুষের ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আগে থেকেই নেওয়া হয় নানা রকম ব্যবস্থা, দেওয়া হয় আশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে ভোগান্তির আর লাঘব হয় না। রাজধানী থেকে নৌপথে চলাচলকারীদের বিড়ম্বনার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ঢাকা সদরঘাটে। এখান থেকে দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন রুটে লঞ্চে যাতায়াত করে যাত্রীরা। ঈদ সামনে রেখে এই ঘাটে বাড়ে দালালচক্র, টিকিট কালোবাজারি, ছিনতাই ইত্যাদি। এ ছাড়া পুরনো লঞ্চ-স্টিমার রং করে চালু করা হয়। নেওয়া হয় অতিরিক্ত যাত্রী বহনের মতো ঝুঁকি।
দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুট। রাজধানী থেকে বিভিন্ন মহাসড়কে রয়েছে নানা ভোগান্তি।

তার পর এই দুই রুটের ঘাটে রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনা। প্রতিবছর যাত্রী ভোগান্তি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ঈদ যাত্রার আনন্দকে মাটি করে দেয়। বরাবরের মতো এবারও প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে জনদুর্ভোগ রোধের কথা। কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থার অসংগতি; ঘাটের সঙ্গে মহাসড়কের বেহাল দশা, ফেরি পারাপারে অব্যবস্থাপনার কারণে জনমনে রয়েছে যানজটের শঙ্কা।
ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কের দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রবেশদ্বার শিমুলিয়া ঘাট। প্রতি ঈদে ঘরমুখো মানুষের অন্যতম ভোগান্তি এই ঘাটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত পারাপার ও সমন্বয়হীনতার কারণে এবারের ঈদ যাত্রা সুখকর হবে না। বিশেষ করে শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রীদের জন্য সরকার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রাখলেও একশ্রেণির দালাল ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ দোকান বসিয়ে মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে যাত্রী চলাচলের রাস্তাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থাকলে ঈদে হাজার হাজার যাত্রীর দুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করবে।

নৌরুটের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা সদরঘাট, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ঘাট ঘুরে প্রতিবেদন করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা—

ঢাকা সদরঘাট : ঈদে ঘরমুখো মানুষের লঞ্চযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে প্রস্তুত হচ্ছে রাজধানীর সদরঘাট টার্মিনাল। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বাড়তি কিছু সুবিধা নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে বিশাল আকারের দুই শর অধিক যাত্রীবাহী লঞ্চ। ২৬ রমজান থেকে পুরোপুরিভাবে এই যাত্রা শুরু হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ব্যস্ত সময় পার করছেন লঞ্চ মালিক-কর্মচারী ও টার্মিনালের কর্মকর্তারা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ঈদে ঘরমুখী মানুষের চাপ সামাল দিতে কোনো কোনো অসাধু লঞ্চ মালিক চলাচলের অনুপযোগী বেশ কিছু লঞ্চ সংস্কার করছেন। কেরানীগঞ্জের তেলঘাট থেকে মীরেরবাগ পর্যন্ত প্রায় ৩০টি ডকইয়ার্ড রয়েছে। এর অধিকাংশ ডকইয়ার্ডেই চলছে যাত্রীবাহী লঞ্চ মেরামতের কাজ। প্রতিটি ডকইয়ার্ডেই বিভিন্ন নৌযান তৈরি, সংস্কার ও রঙের কাজ চলছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ডকইয়ার্ডেই চলছে পুরনো লঞ্চে রং ও মেরামতের কাজ।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘প্রায় সময় কিছু নৌযানের মেরামত করার প্রয়োজন পড়ে। এগুলো মেরামতের জন্য আমরা তাদের বলে থাকি। তবে নৌপরিবহনমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে করে ঈদ মৌসুমে কোনো ধরনের আনফিট নৌযান চলাচল বা সার্ভে সনদ নিতে না পারে এ জন্য আমরা জিরো টলারেন্স নীতি পালন করছি। কোনো অবস্থাতেই আনফিট নৌযান চলাচল করতে দেওয়া হবে না। ’

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া : দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া। প্রতিদিন এ পথে কয়েক হাজার গাড়ি ফেরিতে নদী পার হয়। ঈদের সময় গাড়ি ও যাত্রীর পরিমাণ আরো বাড়ে। প্রতি বছর যাত্রী ভোগান্তি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ঈদ যাত্রার আনন্দকে মাটি করে দেয়। বরাবরের মতো প্রশাসন থেকে বলা হয় জনদুর্ভোগ রোধে নানা ব্যবস্থার কথা, কিন্তু ভোগান্তির আর শেষ হয় না। প্রশাসন থেকে এবারও বলা হয়েছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথ প্রস্তুত। কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থার অসংগতি; ঘাটের সঙ্গে মহাসড়কের বেহাল দশা, ফেরি পারাপারে অব্যবস্থাপনার কারণে জনমনে রয়েছে যানজটের শঙ্কা।

পাটুরিয়া ঘাটে যানজটের অন্যতম কারণ ট্রাফিকের অব্যবস্থাপনা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ঢোকার প্রায় আধাকিলোমিটার আগে রয়েছে তিন রাস্তার মোড় (আরসিএল মোড়)। এর বাম দিকের রাস্তা দিয়ে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসের মতো ছোট গাড়ি ফেরিঘাটে ঢোকানো হয়। মধ্যের রাস্তা দিয়ে ঘাটে ঢোকানো হয় দূরপাল্লার বাস। ডান দিকের রাস্তা দিয়ে ঘাট থেকে সব ধরনের যানবাহন বের করে দেওয়া হয়।

আরসিএল মোড় থেকে ওভার টেকিং নিষিদ্ধ। সিরিয়াল মেইনটেন করে ঘাটে ঢোকার নিয়ম। তেমনি ডান দিকের রাস্তা দিয়ে ঘাট থেকে বের হওয়ার সময় একই নিয়ম মানতে হয়। কিন্তু চালকরা যখনই এই নিয়ম ভঙ্গ করে, তখনই জট বেঁধে যায়। বিশেষ করে কাটা বাসের চালকরা এই অনিয়মটি বেশি করে। কাটা বাস ঘাটে যাত্রী পৌঁছে দিয়ে আবার ফিরে আসে। তাড়াতাড়ি ফিরে আসার জন্য চালকদের মধ্যে নিয়ম ভাঙার একটি প্রবণতা দেখা যায়।

বিআইডাব্লিউটিসি সূত্রে জানা যায়, এবার ঈদ যাত্রায় নদী পারাপারে মোট ১৯টি ফেরি সার্বক্ষণিক চালু রাখা হবে। অতিরিক্ত যাত্রী পারাপারের জন্য থাকবে ৩৩টি লঞ্চ। যাত্রীদুর্ভোগ লাঘবে ঈদের তিন দিন আগে পরের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া অন্য সব ট্রাক পারাপার বন্ধ থাকবে। ফেরি বিকল হলে সঙ্গে সঙ্গে তা মেরামত করার জন্য থাকবে ভাসমান কারখানা।

ড্রেজিং বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, পদ্মায় পানি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে নাব্যতা সংকট নেই। তাই আসন্ন ঈদে পূর্ণ লোড নিয়ে ফেরিগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। লঞ্চ ও বাসে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন রোধে উভয় ঘাট এলাকায় একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করবে।

তাহলে সমস্যা কোথায়? গতকাল দূরপাল্লা বাসের এক বাসচালক কালের কণ্ঠকে জানান, প্রতিবছরই কর্তৃপক্ষ নানা আশ্বাস দেয়। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায় না। প্রতি ঈদে ঘাটে এসে নাকাল হতে হয়। ফেরির সংখ্যা বেশি দেখালেও বাস্তবে তা থাকে না। বেশির ভাগ ফেরি বহুদিনের পুরনো। যে কারণে বিকল থাকে অনেক সময়। মেয়াদোত্তীর্ণ এই ফেরিগুলো পারাপার হতেও সময় বেশি লাগে।

বেশ কয়েকজন বাসের চালক অভিযোগ করে আরো বলেন, ঈদের ভিড়ে ফেরির সিরিয়াল নিয়ে কারচুপি করা হয়। দালালের মাধ্যমে টাকা-পয়সা দিলেই সিরিয়াল আগে-পড়ে করে দেওয়া হয়।

পাটুরিয়া-দৌতদিয়ার রুটে চলাচলকারী কয়েকজন যাত্রী জানান, ঈদের মধ্যে এই রুটে যাত্রীর তুলনায় লঞ্চের অনেক ঘাটতি থাকে। যে কারণে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো চলাচল করে। এতে প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয় যাত্রীদের।

এই নিয়ে গতকাল বুধবার সকালে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে দৌলতদিয়া ঘাটের যানজট নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রী দুর্ভোগ কমাতে প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। জেলা প্রশাসন বলছে, ‘ঈদে যাত্রী ও যানবাহনে চাপ বাড়ার আগে নতুন দুই ঘাটের পল্টুন ঠিক করা হবে এবং বহরে ২০টি ফেরি যুক্ত হবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সরসারি জেল দেওয়া হবে।

শিমুলিয়া-কাঠালবাড়ী : ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কের দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রবেশদ্বার শিমুলিয়া ঘাট। প্রতি ঈদে ঘরমুখো মানুষের অন্যতম ভোগান্তি এই ঘাটে। ভোগান্তি কমাতে ঈদের আগে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়; কিন্তু দুর্ভোগ আর কমে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, অপরিকল্পিত পারাপার ও সমন্বয়হীনতাই এ যাত্রী দুর্ভোগের কারণ। গত বছর ঈদের সময় শিমুলিয়া ঘাটে সমন্বয়হীনতার কারণে ঘাটে হ-য-ব-র-ল সৃষ্টি হয়েছিল। এবারও ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।

এ রুটে দুর্ভোগের কারণ মাওয়া চৌরাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালব্যবস্থা। মাওয়া চৌরাস্তার গোলাকার চত্বরটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেটি কিছুটা উত্তরে সরিয়ে ছোট আকৃতির একটি গোলচত্বর নির্মাণ প্রায় শেষের পথে। এ করাণে এখানে এখন সিঙ্গেল লেন তৈরি হয়েছে। ফলে ঈদে যানজটের রয়েছে আশঙ্কা।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৪ জুন এ ব্যাপারে শিমুলিয়া ঘাটে আইন-শৃঙ্খলার বিশেষ সভা রয়েছে। এ সভা থেকে যাত্রী দুর্ভোগ লাঘবে সব ধরনেরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘাটের সঙ্গে সংযোগ মহাসড়কের বেহাল দশা রয়েছে। এ ছাড়া ঘাটের ওপর নানা ধরনের অবৈধ দোকানপাট রয়েছে। ফলে যানবাহন পার্কিং ও ফেরিতে উঠতে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

মাদারীপুর শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, অব্যবস্থপনা আর দুর্নীতিতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া এই ঘাটে চলে চাঁদাবাজি। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সর্বস্তরের যাত্রী, পণ্যবাহী ট্রাকসহ সব কিছু একটি চিহ্নিত সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তবে এ ব্যাপারে প্রশাসন ও পুলিশের তেমন কোন জোরালো পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অবৈধ দোকানের কারণে যানজট : শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রীদের জন্য সরকার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রাখলেও এক শ্রেণির দালাল ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ দোকান বসিয়ে মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে যাত্রী চলাচলের রাস্তাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থাকলে ঈদে হাজার হাজার যাত্রীর দুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শিমুলিয়া ঘাটের প্যাসেঞ্জার সেটের ভেতরে ৫৫টি, পশ্চিম সাইডে ১১০টি ও লোকাল বাস পার্কিংয়ের জায়গায় রয়েছে। কিন্তু পার্কিং ইয়ার্ডের ভেতরে রয়েছে প্রায় ৫০টির মতো অবৈধ দোকান। ফলে বাস আটকে থাকায় যাত্রীরা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। স্থানীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, এসব অবৈধ দোকান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই বসানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে মাওয়া নদীবন্দরের বিআইডাব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি এসব উচ্ছেদের জন্য বিগত বছরে কয়েক দফা পুলিশকে চিঠি দিয়েছি। আমার তো আর জনবল নেই। তবুও আমি কয়েকবার মাইকিং করিয়েছি। স্থানীয় রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধির তরফ থেকে তদবির আসে। বলতে গেলে আমি পুরো অসহায়। ’-কালেরকন্ঠ