উন্নয়ন বাজেটে নারী উপেক্ষিত

7

যুগবার্তা ডেস্কঃ সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিতে বরাদ্দকৃত দেড় লাখ কোটি টাকা খরচের নাটাই বলতে গেলে প্রায় পুরোটাই পুরুষ কর্মকর্তাদের হাতে। নারী কর্মকর্তারা সেখানে ব্রাত্য।

পুরুষ কর্মকর্তাদের দাবি, নারীরা প্রকল্পের ঝামেলা সামলাতে পারেন না। আর নারীদের কথা, তাঁরা অনিয়ম করেন না, তাই প্রকল্পের দায়িত্ব পান না।
সরকারের যে উন্নয়ন বাজেট, সেটা খরচ হয় মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে এখন এক হাজার ৩৬৮টি প্রকল্প চলমান। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৪৫টি প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) নারী। শতাংশের হিসাবে ৪ শতাংশ। বাকি প্রকল্পগুলোর হর্তাকর্তারা পুরুষ। এমনকি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টিরই পিডি পুরুষ কর্মকর্তা। এমনও দেখা গেছে, একজন পুরুষ কর্মকর্তা একসঙ্গে সাতটি প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ প্রকল্প পরিচালনা করার মতো অনেক নারী কর্মকর্তা সরকারি চাকরিতে কর্মরত আছেন। উদাহরণ দিয়ে বলা যাক, শুধু প্রশাসন ক্যাডারেই উপসচিব থেকে

অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত এখন ৪৮৬ জন নারী কর্মকর্তা আছেন, যাঁরা পিডি হওয়ার যোগ্য। অথচ প্রশাসন ক্যাডারে (চলতি দায়িত্বসহ) পিডির দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৫ জনের মতো নারী।

আরেকভাবে হিসাব করলে, চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ আছে এক লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নারী কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে খরচ হচ্ছে ৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি (৬ শতাংশ)। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধান বলছে, সারা দেশে সবচেয়ে বেশি প্রকল্প চলছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। সংখ্যায় ২৫২। অথচ নারী কর্মকর্তা পিডি মাত্র চারজন। এর পরই বেশি প্রকল্প চলছে সড়ক ও জনপথ বিভাগে, ১৪২টি। যার মধ্যে নারী পিডি আছেন মাত্র একজন। বিদ্যুৎ বিভাগে চলমান ১১৩টি প্রকল্পে নারী পিডি দুজন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় ১০৫টি প্রকল্পে নারী কর্মকর্তা পিডি আছেন মাত্র তিনজন।

প্রতিবেদনটি তৈরি করতে গিয়ে শতাধিক ঊর্ধ্বতন নারী ও পুরুষ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। প্রশাসনের শীর্ষ পদে থাকা পুরুষ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের পিডি পদটি একটি ‘নোংরা’ চাকরি। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রকল্পে সময় দিতে হয়। ঠিকাদারদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হয়। ছুটির দিনেও মাঠে থাকতে হয়। এসব ঝামেলার কাজ নারীদের দিয়ে সম্ভব নয়। শারীরিকভাবেও নারীরা দৌড়ঝাঁপ করার জন্য প্রস্তুত নয়। তাই নারীদের পিডি পদে দিতে চায় না প্রশাসন। পাল্টা যুক্তি দিয়ে প্রশাসনের শীর্ষ পদে থাকা নারী কর্মকর্তারা বলছেন, নারী যদি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন, মন্ত্রণালয় চালাতে পারেন, সংসদ পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে একজন নারী অবশ্যই প্রকল্প পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু নারীদের পিডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয় না। নারী কর্মকর্তাদের মতে, পিডি পদে থেকে বিভিন্ন মহলের আবদার পূরণ করতে হয়। প্রকল্পে অস্থায়ী যেসব নিয়োগ দেওয়া হয়, সেখানে ওপর মহলের পছন্দের কাউকে নিয়োগ দেওয়ার চাপ থাকে। ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম হয়। মন্ত্রণালয়ের যেকোনো খরচ মেটাতে হয় প্রকল্প থেকে।

প্রকল্প থেকে মন্ত্রী, সচিবকে গাড়ি ও তেলের ব্যবস্থা করতে হয়। নতুন সচিব আসবেন, তাঁকে বরণ করতে ফুল লাগবে, সে টাকা জোগান দিতে হয় প্রকল্প থেকে। মোদ্দাকথা প্রকল্প মানেই এসব সুযোগে ব্যাপক অনিয়ম। একটি প্রকল্পে এত অনিয়ম হয় যে এর পরও অডিট অফিস থেকে বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হয় কিভাবে সেই প্রশ্নও নারী কর্মকর্তাদের।

নারী কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁদের দিয়ে এসব অনিয়ম হবে না। তাই পিডি পদে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। নারীর ক্ষমতায়নে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিলেও উন্নয়ন বাজেট খরচের দায়িত্বে নারীরা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) আওতায় চলমান ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আইএমইডিকে শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পে নতুন সচিবকে বরণ করতে ফুল দেওয়া, গাড়ি উপহার দেওয়া, পিকনিকের টাকা জোগান দেওয়া, অফিস সাজসজ্জা—সবই হচ্ছে এই প্রকল্পের টাকায়। প্রকল্পের আওতায় কেনা ছয়টি গাড়িও ব্যবহার হচ্ছে খেয়ালখুশিমতো; ওপর মহলকে খুশি করতে। এই প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করছেন হাবিবুল ইসলাম।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী সালমা শহীদ বলেন, ‘একজন নারী পিডি যতটা আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, পুরুষ কর্মকর্তা সেটা করেন না। নারী পিডি যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, সেখানে অনিয়ম দুর্নীতি কম হয়। কিন্তু পুরুষ পিডি যেসব প্রকল্পে দায়িত্বে থাকেন সেখানে হয় তার উল্টোটা। ’ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, ‘পিডি হলে যেমন অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়, আবার আপসও করতে হয়; যা একজন নারীকে দিয়ে সম্ভব নয়। ’ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রোকসানা মালেক বলেন, ‘প্রশাসনে কখনো পিডি হওয়ার জন্য প্রস্তাব পাইনি। পিডি হওয়ার মতো যথেষ্ট যোগ্যতা নারী কর্মকর্তাদের রয়েছে। ’

তবে ভিন্নমত আছে পুরুষ পিডি কর্মকর্তাদের। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চার লেনে ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের পিডি রিয়াজ আহমেদ জাবের এবং সেকেন্ডারি এডুকেশন অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্টের (সেকায়েপ) পিডি ও অতিরিক্ত সচিব ড. মাহামুদ উল হক বলেন, পিডির দায়িত্ব পালন করার আগে তাঁরা শুনেছেন প্রকল্পে অনেক সমঝোতা ও আপস করতে হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাঁদের কোথাও আপস করতে হয়নি। প্রকল্পে পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে জেন্ডার কোনো বিষয় নয় বলেও মত তাঁদের।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নারী কর্মকর্তারা যে ৪৫ প্রকল্পে পিডির দায়িত্ব পালন করছেন, সেগুলোর প্রায় সবগুলোই খুব ছোট। এক হাজার কোটি টাকার নিচে। বড় প্রকল্প আছে মাত্র দুটি। একটি হলো সায়েদাবাদ পানি শোধানাগার (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্প। ব্যয় চার হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে পিডির দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কামরুন নাহার লাইলী। আরেকটি হলো পিরোজপুরে কচা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের পিডি আছেন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সালমা শহীদ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওপর মহলের আবদার পূরণ করতে না পারলে প্রকল্পের পিডি হিসেবে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। আবদার না শোনায় নারী কর্মকর্তাকে পিডির দায়িত্ব দেওয়ার পর সরিয়ে নেওয়ার নজিরও আছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পে উপসচিব শবনম মুস্তারীকে পিডি হিসেবে গত নভেম্বরে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু চার মাস পার না হতেই গত ২৮ মার্চ তাঁকে এই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রকল্পে কাউকে নিয়োগ বা সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের একটি নীতিমালা আছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া তিন বছরের আগে একটি প্রকল্পের পরিচালককে বদলি করা যাবে না। বদলি করতে হলে গঠিত কমিটির অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু শবনম মুস্তারীর ক্ষেত্রে সে নিয়ম মানা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, ওপর মহলের দাবি ছিল এই প্রকল্পে অস্থয়ীভাবে কয়েকজনকে নিয়োগ দেওয়ার। কিন্তু তাঁদের কেউ লিখিত পরীক্ষায় পাস করেননি—এই যুক্তি দেখিয়ে নিয়োগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন শবনম মুস্তারী। আবদার না মেটানোর কারণে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে এখন ভূমি সংস্কার বোর্ডে বদলি করা হয়েছে। প্রকল্পের নতুন পিডি হয়েছেন ভূমি সংস্কার বোর্ডের কর্মকর্তা আবদুর রাশেদ খান।

পিডি নিয়োগের নীতিমালায় আরো বলা আছে, ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে কোনো প্রকল্পে একজন কর্মকর্তাকে পূর্ণকালীন নিয়োগ দিতে হবে। তিনি হবেন প্রকল্প বিষয়ে অভিজ্ঞ। এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। অভিযোগ আছে, কোনো মন্ত্রণালয় এ নীতিমালা অনুসরণ করে না। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আসিফ উজ জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী কর্মকর্তাকে পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি কখনো মাথায় আসেনি। ভবিষ্যতে যদি সুযোগ আসে, তাহলে আমার মন্ত্রণালয়ে অবশ্যই নিয়োগ দেব। ’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের পিডি নিয়োগ হয় দুইভাবে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, রেল মন্ত্রণালয়সহ কারিগরিসংক্রান্ত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয়ত, কোনো মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে যদি পিডি দরকার হয়, তখন ওই মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসনে আবেদন করে। প্রকল্পের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করে জনপ্রশাসন পিডি নিয়োগ দেয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস উইমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব ও সচিব নাসরিন আক্তার বলেন, ‘নারীরা চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। নারীরা সব ধরনের কাজ করতে পারে, যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। পিডির দায়িত্ব পালনে নারী কর্মকর্তাদের সে সাহস আছে। কিন্তু পিডি পদে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। ’-কালেরকন্ঠ