পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি ২ হাজার কোটি টাকার অনুসন্ধান

2

যুগবার্তা ডেস্কঃ বেসিক ব্যাংকে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা অনুসন্ধান শেষে মামলা হলেও বাকি ২ হাজার কোটি টাকার অনুসন্ধান এখনো শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৫৬ টি মামলা, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে আরো ৫টিসহ মোট ৬১ টি মামলায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে বাকি ২০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধান গত ৫ বছরেও শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে দুদকের উপ পরিচালক (জনসংযোগ) প্রনব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, বেসিক ব্যাংকের যে পরিমাণ অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে তার একাংশের অনুসন্ধান শেষে ৬১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অর্থ জালিয়াতির বাকি যে অংশ ছিল সেটার অনুসন্ধান এখন চলছে। এ অনুসন্ধান কাজ শেষ পর্যায়ে। অনুসন্ধানে যাদের বিরুদ্ধে এই জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধান দেরি হবার ব্যাপারে দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক থেকে টাকাগুলো ঋণের নামে নেওয়া হয়েছিল। পরে লোন অ্যাকাউন্ট থেকে এসব টাকা আবার বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে। এরপর সেখান থেকে টাকা উঠিয়ে আত্মসাত করা হয়। এই টাকা কোথায় কোথায় গেছে, কোন অ্যাকাউন্টে গেছে, যাদের অ্যাকাউন্টে গেছে তাদের এ জালিয়াতির সঙ্গে কি ধরনের সম্পর্ক রয়েছে, এসব খতিয়ে দেখছে দুদক। এছাড়া এর মধ্যেই কিছু টাকা রি-শিডিউল ও ফেরত এসেছে। সে কারণে হিসাব বদলে যাচ্ছে। এসব কারনে দেরি হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, টাকা ফেরত বা রি-শিডিউলের সঙ্গে ক্রিমিনাল লায়াবিলিটির কোনও সম্পর্ক নেই। দুদকের অনুসন্ধানে জালিয়াতির প্রমান পেলেই দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কমিশন প্রস্তুত।
সূত্র জানায়, দুদক ২০১০ সালে বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। তবে ঋণ-সংক্রান্ত সংকট নিরসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হওয়ায় দুদকের অনুসন্ধান থমকে যায়। পরে ২০১৩ সালের জুলাইতে দুদকে বাংলাদেশ ব্যাংক পূনরায় প্রতিবেদন পাঠালে মোট সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বেসিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও এর তিনটি শাখায় প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। গুলশান শাখায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা, শান্তিনগর শাখায় ৩৮৭ কোটি টাকা, প্রধান কার্যালয়ে প্রায় ২৪৮ কোটি টাকা ও দিলকুশা শাখায় ১৩০ কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ শনাক্ত করা হয়। এছাড়া, বেসিক ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে আরও একহাজার কোটি টাকার জালিয়াতি প্রকাশ পায়। সব মিলে ব্যাংকটির প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রতারণার ঘটনা ধরা পড়ে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই ৩০টি কোম্পানি ও বেসিক ব্যাংক কর্মকর্তাসহ অন্তত ১৫০ জনকে আসামি করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিতে যাচ্ছে দুদকের অনুসন্ধান দল। এই টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অন্তত ২৫ টি মামলা করবে দুদক। এবারের আসামির তালিকায় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর নাম থাকছে। তবে বাচ্চুর মতো ভিআইপিকে আসামি করার জন্য আরো নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি মামলায় আসামি করা হচ্ছে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও এমডিসহ ২/৩ জন কর্মকর্তাকে। একই সঙ্গে থাকবে বেসিক ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের ৩/৪ জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সে হিসেবে প্রতিটি মামলায় ৫/৬ জন ব্যক্তিকে আসামি করা হতে পারে। তবে কবে নাগাদ এসব মামলা দায়ের হবে সে ব্যপারে কোন তথ্য জানা যায়নি।
দুদকের এক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা জানান, ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাবগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ক্লিয়ারেন্স (ছাড়পত্র) ছিল না। প্রস্তাবে উলে­খ করা জামানতের মূল্য যাচাই করা হয়নি। ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি-না- তা মূল্যায়ন করা হয়নি। অধিকাংশ ঋণগ্রহীতার কোনো ব্যবসাই নেই। কারও কারও ছোট্ট পরিসরে ব্যবসা থাকলেও ৫০, ৮০, ১শ’কোটি টাকার ঋণ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই। ঋণ প্রস্তাবগুলোতে শাখা থেকে এসব তথ্য উল্লেখ করা হলেও পরিচালনা পর্ষদ প্রস্তাবগুলো বাতিল না করে অনুমোদন দিয়েছিল। প্রস্তাবগুলো কীভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তার তদন্ত হচ্ছে।-ইত্তেফাক