নিমিষেই কোটিপতি হবার দেশ, সহজেই কোটি টাকা শেষ!

7

ইঞ্জিঃ সরদার মো: শাহীনঃ গত রমজান শুরুর দু’দিন আগের কথা। কেবল শেষ হয়েছে আমার শোনিমের ইয়ার ফাইনাল। ফাইনাল পরীক্ষা তো নয়, যেন রাবণের লংকা যুদ্ধ। সারাটা বছর একগাদা বই পড়তে পড়তে ওদের অবস্থা এমনিতেই বেড়াছ্যাড়া। জীবন যায় যায় করে। সারা বছরই পড়া, সারা বছরই পরীক্ষা। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে তিনদিন পরীক্ষা। সবশেষে হয় ইয়ার ফাইনাল। ক্লাশ ফাইভের এতটুকুন ছেলের ফাইনালে ছিল ১৩টা সাবজেক্ট। ১২ বছর বয়সের একটি শিশুর ১৩টি বিষয়ে পরীক্ষা! এটাও বিশ্বাস করতে হয়! কোন কোনদিন দুটো পরীক্ষাও ছিল। আমাদের আমলে ছিল মোটে চারটি বিষয়। এই আমলে স্কুলে পড়ায় না, কেবল পরীক্ষা নেয়। পড়তে হয় প্রাইভেটে কিংবা কোচিং এ; পরীক্ষা হয় স্কুলে। যে স্কুল যত বেশী পরীক্ষা নেয়, সে স্কুল তত বেশী নামী।
দশমাস পরীক্ষার মাঝে বসবাস করে কেবল দু’মাস শোনিম একআধটু বেড়াতে পারে। তাই রোজার মাঝেও ওকে নিয়ে বের হওয়া। সারাদিন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট থেকে বিকেল ৬টার ফ্লাইটে বালির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ; পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষনীয় পর্যটন দ্বীপ। অনেকটাই অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি। সারা দুনিয়ার সব পর্যটকগণই এখানে বেড়াতে আসে। তবে বেশী আসে অস্ট্রেলিয়ান পর্যটক। জার্নির সময় বেশী নয়; বড় জোর ঘন্টা তিনেকের মত হবে। তাই সবার মনই ফুরফুরা। রাতের নির্ঘুমের কোন চিহ্ন ওদের চোখেমুখে বিন্দু মাত্র নেই।
আকাশে ওড়ার পর প্রায় ঘন্টা খানেক কেটে গেছে। নীচে মেঘের ফাঁকে চীন সাগর আফছা আফছা দেখা যায়। বাইরে ইতিমধ্যেই হালকা অন্ধকারও নেমেছে। আমরা ইফতার হাতে নিয়ে বসে বারবার ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে চোখ ফেলছি। খুব সাবধানী; সময় এলোমেলো হয়ে যাওয়াতে হুট করেই ইফতার নিচ্ছি না। বিমান জার্নিতে এই একটা সমস্যা। এয়ারক্রাফট এত জোরে চলে যে সময় নির্ধারনে অনেক হিসেবী হতে হয়। আবার এয়ারক্রাফট যেমনি ছোট, রোজাদারের সংখ্যাও তেমনি কম। তাই আমাদের নিয়ে বিমান ক্রুদের কোন মাথা ব্যথা নেই। কী আর করা; একটা সময়ে ইফতার নিলাম। এদিকে কিছুটা একসাইটেশনও আছে। কেবল শোনিম নয়, বালিতে আমারও প্রথম যাত্রা। তাই একসাইটেশন। যাই যাই করে আজও যাওয়া হয়ে উঠেনি বালি দ্বীপে। খুবই ছিমছাম এবং যথেষ্ট আধুনিক সাজে সজ্জিত বালির ডেনপাসার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিশালাকার ইমিগ্রেশান লাউঞ্জ। মিনিটে মিনিটে পে−ন উঠানামা করছে। যাত্রীতে এয়ারপোর্ট ঠাসা। তারপরও ঝকঝকে পরিষ্কার সর্বত্র। বিশেষ করে ওয়াশরুম। সামান্য একফোঁটা পানিও যেমনি কোথায়ও পড়ে নেই, তেমনি নেই একটা ময়লার টুকরা। তরিৎকর্মা ইমিগ্রেশান অফিসারকে দেখে মনে হলো তিনি আন্তর্জাতিক নয়, আভ্যন্তরীন প্যাসেনজার হ্যান্ডেলিং করছেন। পাসপোর্ট হাতে নিচ্ছেন আর সিল দিচ্ছেন। ভিসা সিল। কনভেয়ার বেল্টেও একই অবস্থা। যাবার আগেই লাগেজ হাজির। কোথায়ও ভোগান্তি নেই; নেই সময়ের অপচয়।
সংগত কারণেই মনে পড়ছিল ঢাকা এয়ারপোর্টের কথা। ২৪ ঘন্টায় ৫০টা প্লেনও নামে কিনা সন্দেহ। তারপরও জ্যাম। সব জায়গায় জ্যাম। সবচেয়ে বড় জ্যাম লাগেজ নিয়ে। কনভেয়ার বেল্টের চারপাশে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অধৈর্য্য হয়ে পড়ে। এর পরেও লাগেজ আসে না। আসলেও কোন কোনটা কাটাছেঁড়া। এখানে লাগেজ কাটা পার্টিও আছে। পাঁচটা টয়লেট থাকলে দুইটাতে ঢোকা যায়। টয়লেট পেপার সাথে নিয়ে ঢুকতে হয়। বাকীগুলোতে ঢোকাও যায় না; আবার ঢোকলে বসাও যায় না।
দুঃখজনক হলো আচরণ। ঢাকা এয়ারপোর্টে প্যাসেঞ্জারদের সাথে রূঢ় আরচণ করা হয়। ভাল ব্যবহার জানা লোক হ্যারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবাই ব্যস্ত নিজেদের পরিচিত কিংবা কারো অনুরোধের যাত্রীগণের সেবায়। যার রেফারেন্স নেই, মানে পরিচিত কিংবা পরিচিতের পরিচিত নেই, তার যেন কিছুই নেই। এখানকার ইমিগ্রেশান অফিসার সবচেয়ে বেশী ঢিলা। যাত্রীকে সামনে দাঁড় করিয়ে একবার কম্পিউটারের দিকে তাকায়; না বোঝা চোখে কম্পিউটারে কী যেন খোঁজে। তারপর মাথা উঁচু করে আঙুল ফোটায়। এরপর এদিক ওদিকে তাকায়। বিদেশীদের ক্ষেত্রে আরো ঢিলা। তাদের বাংলাদেশে ঢোকার সময়, আর বাংলাদেশীদের দেশ থেকে বের হবার সময় হেনস্তা করে সবচেয়ে বেশী।
খুশীর বিষয় হলো, বালিতে নেমেই কোটিপতি হয়ে গেলাম। কোটি টাকা পকেটে নিয়ে ঘোরা চাট্টিখানি কথা! অবশ্য এই দেশে প্রায় সবাই কোটিপতি। এক ডলারে তের হাজার ইন্দোনেশীয়ান রুপী। আমি আটশত ডলার ভাঙাতে নিমিষেই কোটিপতি হলাম। বাংলাদেশের ৬৫,০০০ টাকার সম পরিমাণ মুদ্রায় ইন্দোনেশিয়ায় এককোটি রুপী হয়। এই সামান্য টাকা কার না থাকে। গরীবেরও থাকে। তাই এদেশে গরীবরাও কোটিপতি।
অবশ্য কোটিপতিগিরি যে বেশীক্ষণ করা যাবে না, এটা বুঝলাম ট্যাক্সি করে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে পৌঁছাতেই। মনে হলো কোটি টাকা শেষ হতে তেমন সময় লাগবে না। মোটে এক কিলো রাস্তা পাড়ি দিয়ে ভাড়া গুনলাম একলক্ষ রুপী। অপূর্ব ছিমছাম শহর। যেমনি রাস্তাঘাট, তেমনি হোটেল। ব্যবহার অমায়িক। ধাপ্পাবাজির বিষয়গুলো এখানে নেই। সবকিছু একটা সিস্টেমে চলে।
চলে বলেই এখানে শতশত হোটেল এবং রিসোর্ট হয়েছে। হয়েছে রেস্তোরা এবং পানশালা। সারা পৃথিবীর সবদেশের সব সেরা খাবারের রেস্তোরা হয়েছে। এক কথায় বলা যায় বিদেশী পর্যটকদের জন্যে নিরাপদ স্বর্গরাজ্য এই বালি। সমুদ্রের পাড়ে সী-বীচ থাকুক আর পাহাড় থাকুক; তোয়াক্কা করা হয়নি। অতি নিপূণ ভাবে সাজিয়েছে যেন পর্যটক উপভোগ করতে পারে। এমনি অগণিত স্পট। কোন্টা রেখে কোন্টার কথা বলবো। হোটেল এবং রিসোর্টগুলো হয়েছে বীচ ঘেষে। অর্থাৎ হোটেল থেকে এককদম বেরুলেই বীচ।
এটা কক্সবাজারে ভাবা যায়? কক্সবাজারে হোটেল এক জায়গায় আর বীচ অন্যখানে। পর্যটকগণ সমুদ্রে নামার উপযোগী কাপড় পড়ে হোটেল থেকে প্রকাশ্যে হেঁটে হেঁটে বীচে যাবে। আবার ভেজা শরীরে ফিরবে ঠিক একই ভাবে। সারা দুনিয়ার মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখবে। এটা বাংলাদেশেই সম্ভব। অথচ অপার সম্ভাবনা ছিল কক্সবাজারেও। কক্সবাজার টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডটি বীচ থেকে আরো কিছুটা দূরে করলেই হতো। হতে পারতো একটার পর একটা বীচঘেষা হোটেল। প্রতিটি হোটেলের জন্যে প্রাইভেট বীচ থাকতো। পর্যটকগণ অনেক বেশী প্রাইভেসী পেত।
প্রাইভেসী দেবে কি? খাবারের ভেরাইটিজই দিতে পারে না! বিদেশী খাবারের রেস্টুরেন্ট তো নেইই; আছে কেবল দেশী। ভিন্নতাবিহীন খাবার। খাবার বলতে কেবল লইট্টা আর রুপচাঁদা মাছ। আগে ছিল লইট্টা শুটকী। এখন লইট্টা ফ্রাইও যোগ হয়েছে। এর সাথে মাছ ভর্তা এবং সব্জী। আর গরু, খাশি এবং মুরগী তো আছেই। এই এক জিনিস কয়বেলা চলে! তাই খাবারে ভেরাইটিজ আনতে হবে আর দিতে হবে সিকিউরিটি। মানুষ একা একা সারা শহরে হাঁটবে, ঘুরবে বিনা টেনশানে। কেউ একটা টু শব্দও করবে না। নিশ্চিত থাকুন পর্যটককে জায়গা দিয়ে কুলাতে পারবেন না। তারা এখানে ডলার নিয়ে এসে খরচ করবে। ডলারে ভরে যাবে দেশ। ১৬ কোটি লোকের জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থের অর্ধেক আসবে এই খাত থেকেই।
মুশকিল হলো, এই কথা কাকে বলবো? দেশের রাজনীতিবিদদের? এদের একপক্ষ চেতনা আর অন্যপক্ষ বেদনা নিয়েই ব্যস্ত। আর আমলাদের? সবার কথা বলবো না। তবে অনেকেই কারো কথা কখনো শুনে না; শোনায়। সন্দেহ নেই তারা জ্ঞানী লোক। কিন্তু নিজেদেরকে মনে করে মহাজ্ঞানী। সমস্যাটা এখানেই। বিসিএস পরীক্ষা দিতে যেয়ে ক’টা বইয়ে কী এমন পড়েছে কে জানে! তাদের ছাড়াও যে এদেশে জ্ঞানী লোক থাকতে পারে তা তারা মানতেই চায় না। আতলামোতে ভরা তাদের প্রতিটি কথা। কথায় কথায় দেশের স্বার্থ খোঁজার ভান।
কিন্তু নিজেদের বেতনভাতা বাড়ানো আর বিদেশে ট্রেনিং নেবার বেলায় দেশের স্বাথের্র কথা বেমালুম ভুলে যান। সরকার যদি পর্যটনের উন্নয়ন নিয়ে ভাবা শুরু করে, তাহলে প্রথমেই একশ্রেণীর আমলা আছেন, যারা এর উছিলায় বিদেশে ট্রেনিং এ চলে যাবেন; এবং ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরেই খুঁজবেন প্রমোশন। আর প্রমোশন মানেই ভাল পোষ্টিং। বদলী হয়ে অন্য ডিপার্টমেন্টে চলে যাবেন। এবং ফলাফল হবে শুণ্য। মানে, যেই লাউ, সেই কদু।
অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। আমার মত যদুমধুর এই অভাগা দেশে সাধের কদু পাকিয়ে ডুগডুগি বানিয়ে গান করা ছাড়া আর কিছু আশা করাটাই তো অস্বাভাবিক। সম্পাদকীয় কলামে কিছু লেখা তো আরো অস্বাভাবিক!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।