ফের অশান্ত পাহাড়

23

মুক্তার হোসেন নাহিদঃ ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়ি জনপদ। রক্তলাল বর্ণ ধারণ করছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সবুজ পাহাড়। ২০ বছর আগে শান্তিচুক্তি হলেও আজও পাহাড়ে শান্তি আসে নি। চুক্তির দু’দশক পার হতে না হতেই আবারও সহিংস হয়ে উঠেছে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গোলাগুলি, চাঁদাবাজি, মুক্তিপন আদায়সহ নানা নাশকতায় অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। বাড়ছে লাশের মিছিল। ভয়-আতংক তাড়া করে ফিরছে পাহাড়ের মানুষকে। প্রতিদিন কারও না কারও রক্তে লাল হচ্ছে পাহাড়ের সবুজ জনপদ। খুনোখুনি থামছে না কিছুতেই। একটি খুনের রেশ না কাটতেই হচ্ছে আরেক খুন। সর্বশেষ গত ৪ মে অস্ত্রধারীর গুলিতে নিহত হলেন ৫ জন। তার আগের দিন খুন হন রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা । তার শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে খুন হন ওই ৫ জন। পাহাড়ে এই হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন হত্যাকান্ড নয়, রীতিমতো টার্গেট কিলিং। সিরিয়াল ও টার্গেট কিলিং সম্পনś করার প্রক্রিয়ায় পার্বত্য নেতাদের সাথে ঝরছে নিরপরাধ মানুষের প্রাণও। ফলে দ্’ুদশ আগে শান্তির প্রত্যাশায় সরকার ও পার্বত্যাঞ্চল নেতাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির পাহাড় এখন পরিণত হয়েছে আতংকের জনপদে।
পাহাড়ের দুই সংগঠনের চার গ্রুপের অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে পাহাড়ে নিত্যদিন বিরাজ করছে ভয়, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এই জনপদের মানুষের ঘুম ভাঙছে হত্যা, গুম আর হানাহানির সংবাদে।
এই প্রতিহিংসার নেপথ্যে রয়েছে জনসংহতি সমিতি ( জেএসএস, সন্তু লারমা গ্রুপ), জেএসএস (এমএন লারমা গ্রুপ), ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত গ্রুপ) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) গ্রুপের একক আধিপত্য বিস্তারের অপতৎপরতা। তাদের আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অপতৎপরতা বহু পুরোনো। শান্তিচুক্তির পর কিছুটা কমলেও একেবারে থেমে যায় নি। নতুন করে আবার শুরু হলো রক্তের হোলি খেলা।
গত শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক চরম অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তথাকথিত শান্তিবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এই বাহিনীকে চাঁদা না দিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে প্রায় কোনো কাজই করা যেত না। তারা তখন কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। সেই অরাজক পরিস্থিতির অবসান হয়েছিল ১৯৯৭ সালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে সম্পাদিত ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু এতে খুশি হতে পারে নি জনসংহতি সমিতির একাংশ। তারা শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে যায় এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে আবারও বিভক্ত হয়ে গড়ে ওঠে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) এবং ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক নামে আরো দুটি সংগঠন। বর্তমানে এই চারটি গ্রুপের নিজের আধিপত্য ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই পারস্পরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে দুই দলের বিরোধে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘাতে মারা গেছে প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী। কিন্তু ২০১৬ সালে দুই দলের মধ্যে অলিখিত ও অপ্রকাশ্য এক চুক্তির ফলে সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ হয়। ফলে স্বাক্ষর নিঃশ্বাস নেমে আসে পাহাড়ে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনাসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ এনে পাহাড়ে আবার আগুন জ্বলবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। কাকতালীয়ভাবে তাঁর এ ঘোষণার মাত্র দুই দিন পর ৫ ডিসেম্বর অনাধি রঞ্জন চাকমা (৫৫) নামের এক ইউপিডিএফ সমর্থক ইউপি সদস্যকে হত্যা করা হয়। তারপর থেকে গত ৫ মাসে পাহাড়ে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় খুন হয়েছেন ১৮ জন। সর্বশেষ ৩ ও ৪ মে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঝরলো আরও ৬ তরতাজা প্রাণ। যার মধ্যে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএল গণতান্ত্রিক এর আহবায়ক তপন জ্যোতি চাকমা অন্যতম।
৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সংগঠনটির আরেক নেতা রƒপম চাকমা গুলিবিদ্ধ হন। এর এক দিন পরই ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনয় চাকমা এবং গাড়ি চালক সজীব। এ সময় আহত হয় আরো আটজন। এতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যেমন আতংকিত হয়ে উঠেছে, একইভাবে আতংকিত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালিরাও।
গত বিশ বছরে পাহাড়ে যত হত্যাকান্ড হয়েছে তার অধিকাংশই বাঙালি। বাঙালীদের খুনের নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও চাঁদাবাজির ঘটনা। নিহতদের এক-তৃতীয়াংশ পাহাড়ি। এসব হত্যাকান্ডের নেপথ্যে রয়েছে নিজেদের অন্তর্কোন্দল।
পাহাড়ের এই সংগঠনগুলোর সশস্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে অসহায় সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিসহ সব পেশাজীবী মানুষ। এসব সংগঠন কোনো আদর্শিক কারণে লড়াই করছে না। তার সংঘাতে লিপ্ত আছে কেবলই তাদের ব্যক্তিস্বার্থে। বিপুল পরিমাণ অর্থের ভাগাভাগি আর আধিপত্যই মূলত পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান কারণ। এটা স্পষ্ট যে তারা কোনো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট নয়। তারা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উনśয়নেও কোনো ভূমিকা পালন করছে না। শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে পাহাড়ের শান্তি বিনষ্ট করছে। দিন দিন তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে পাহাড়ের মানবতা, সুখ শান্তি। জিন্মি হয়ে পড়েছে পাহাড়ের নিরীহ জনগোষ্ঠী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সবুজ পাহাড়ে শান্তির সুবাস বয়ে আসুক। এই প্রত্যাশা পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের মানুষের।-লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।