নদী-খালখেকোদের দৌরাত্বে নাজেহাল রাজধানীবাসী

7

রফিকুল ইসলাম জাহিদ॥ প্রায় প্রতি দিনই বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হচ্ছে এবারের বর্ষায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বেশি। প্রকৃতির ˆবরি আচারণ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুম যত এগিয়ে আসছে রাজধানীবাসীর উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা ততো বাড়ছে।
কারণ বৃষ্টি মানেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতা। কেবল জলাবদ্ধ তাই নয়, এক ঘন্টার বেশি বৃষ্টি হলে পথ-ঘাট ডুবে রাজধানীর সড়কগুলো নদীতে পরিণত হয়। হাঁটু পানি-কোমর পানিতে চলতে হয় নগরবাসীকে। ˆদনন্দিন জীবনে সৃষ্টি হয় জনদুর্ভোগ। আর এই দুর্ভোগের শিকার হন কর্মব্যস্ত মানুষ, স্কুলগামী শিশু-কিশোর, হাসপাতালগামী রোগী, বয়স্ক ও নারীরা। ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ, তীব্র যানযট এবং চলাচলে বিঘ্ন এসব যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠে নগরীর মানুষের ˆদনন্দিন জীবন। সারাদিনের কর্ম-ব্যস্ততা শেষে শান্তির নীড়ে ফিরে দেখতে হয় রুমের মধ্যেও হাঁটু পানি। কারণ বৃষ্টিতে অনেক আবাসিক এলাকার নিচতলা ডুবে থাকে পানির নিচে। পানিবন্দী হয়ে পড়ে রাজপথ, আবাসিক এলাকা, দোকানসহ নগরীর বেশিরভাগ অঞ্চল।
অতচ পানিবন্দী নগরবাসীর জনদুর্ভোগ কে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলেই কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে ফি বছর। কিন্তু রাজধানীর এই জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এজন্য দায়ি পানি নিষ্কাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং রাজধানীর চারপাশের নদী ও খাল রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিতরা। এসব প্রতিষ্ঠান ও কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্বে অবহেলা, মোটা অংকের টাকা কামানোর কারণে দখল দূষণে একাকার রাজধানীর বেশির ভাগ খাল। বছরের পর বছর ধরে চলছে রাজধানীর খাল দখলের মহোৎসব। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চার নদী দখলের প্রতিযোগিতা। বন্ধ হয়ে গেছে রাজধানীর পানি নিষ্কাসনের পথ। আর অজানা কোনো কারণে বর্ষা মৌসুমেই শুরু হয় ড্রেন সংস্কারের খুঁড়াখুরির কাজ। ফলে বৃষ্টি হলেই রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ বাড়ে। এর থেকে মুক্তি মিলছে না কোনোভাবেই।
জানা গেছে, একসময় ঢাকায় ২০০টির বেশি খাল থাকলেও এখন বেশিরভাগ খালের অস্তিত্ব নেই। ঢাকা জেলা প্রশাসনের হিসেব মতে, বর্তমানে রাজধানীতে খাল আছে ৪৩টি। সব খালের মালিকানা জেলা প্রশাসনের হলেও ২৬টি খাল রক্ষণাবেক্ষণ করে ঢাকা ওয়াসা। ঢাকা জেলা প্রশাসনের অধীনে রয়েছে ৮টি খাল। এছাড়া রাস্তা, বক্স কালভার্ট, ব্রিক স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে বিকল্পভাবে পানি নিষ্কাশনের আরো ৯টি খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াসা, পাউবো ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে রয়েছে চরম দ্বিধাবিভক্তি।
ঢাকার প্রাণ-প্রবাহ এই খালগুলো হয়ে আছে মালিকবিহীন মূল্যবান সম্পত্তির মতো। তাই যার যেভাবে খুশি, এগুলোর ওপর চালিয়ে যাচ্ছে দখল-উৎসব। বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের লেবাস লাগিয়ে ভূমিদস্যুদের থাবায় একের পর এক দখল হয়েছে এসব খাল। গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন, হাউজিং সোসাইটি, মার্কেট, মসজিদ-মন্দির-কবরস্থান, রিক্সা গ্যারেজ, স্থানীয় রাজনৈতিক দল ও গণসংগঠনসমূহের শাখা কার্যালয়। ফলে দিন দিন ২০০ ফুট প্রস্থের খালগুলোও এখন পরিণত হয়েছে সরু ড্রেনে। বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনাও এসব খালে ফেলা হচ্ছে দেদারছে । সরকারি কোষাগার থেকে খনন আর পরিষ্কারের নামে কোটি কোটি টাকা ওয়াসার মাধ্যমে খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে মিলছে না সুফল । এ ছাড়া খালের মালিকানা নিয়েও সরকারি পাঁচটি সংস্থার রয়েছে সমন্বয়হীনতা। এরই মধ্যে খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চাইছে ঢাকা ওয়াসা। খাল উদ্ধারের কার্যক্রম নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, ওয়াসা ও পানি উনśয়ন বোর্ডের (পাউবো) মধ্যে চলছে ঠেলাঠেলি। দায় চাপাচ্ছে একে অন্যের উপর। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান নিজেরাই দখল করছে খাল। এসব প্রতিষ্ঠান বহু আগে থেকেই খালগুলো ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে, আবাসিক এলাকা ˆতরি করে প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে রাস্তা ˆতরি করা হয়েছে। মোট ১০টি খাল সরকারি সংস্থার দখলের কবলে পড়েছে। খালের উপর সিটি করপোরেশনের ১৫ কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানীর খালগুলোতে প্রায় চার শতাধিক দখলদার রয়েছে। এভাবে ভূমিদস্যু ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসনে একের পর এক দখল হয়ে যাচ্ছে রাজধানীর খালগুলো। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে খালের ˆদর্ঘ্য ও প্রস্থ।

অন্যদিকে খাল দখলের মতই ঢাকার চারটি নদী ভরাটও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। চারটি নদী এ শহরকে ঘিরে রেখেছে চারদিক দিয়ে। পৃথিবীর খুব কম শহরই আছে এ রকম নদীঘেরা। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু- এই চারটি নদী একদিকে যেমন হতে পারত ঢাকাবাসীর প্রয়োজনীয় পানির উৎস, তেমনি আবার হতে পারত শহর থেকে পানি নিষ্কাশনের আধার। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তা না হয়ে হয়েছে উল্টোটা। মানুষেরই রোষানলে পড়ে নদীর আশীর্বাদ আজ হয়ে উঠেছে অভিশাপ। দখল আর ভরাট হতে হতে নদী চারটি এখন মৃতপ্রায়। তাই পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় একটু বৃষ্টিতেই পথ-ঘাট ডুবে, যানজট বেধে ঢাকা হয়ে পড়ছে অচল। দুর্বিষহ হয়ে উঠছে ঢাকাবাসীর জীবন। এমন অবস্থার মধ্যে পড়েও স্বার্থবাজরা মেতে রয়েছে নদী দখল আর ভরাটের ‘উৎসবে’।
বিশেষজ্ঞরা কলছেন, প্রায় ১৫ বছর আগেও ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেও ঢাকা ডুবতো না। অথচ এখন মাত্র ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই গোটা নগরী খালে পরিণত হয়। খাল ও জলাশয় দখলই এই জলাবদ্ধতার মূল কারণ। ঢাকা শহরের বুকে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খালগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত করে আর বেদখল হওয়া খালগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে না; তাঁদের এই একটি ফর্মুলাই আমলে নিচ্ছে না ওই সংস্থাগুলো।
ঢাকা নগরীর জলাবদ্ধতা ও পয়ঃনিষ্কাশনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা, পাউবো ও দুই সিটি করপোরেশনের হাতে থাকলেও তারা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে ঠেলাঠেলিতে ব্যস্ত আছে। দায় নিতে চাচ্ছে না কেউ।
পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন আইন ১৯৯৬ এ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে রাজধানী ঢাকা নগরীর পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। এই আইনের ১৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ তার আওতাভুক্ত এলাকা বা এলাকার কোনো অংশবিশেষের জন্য যেকোনো বিষয়ে এক বা একাধিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারবে। এছাড়া ১৯৮৯ সালে ড্রেনেজের দায়িত্ব ওয়াসা পাওয়ার পর তাদের এ ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য জনবল ˆতরি করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই সার্কেলে ১৩২ জন কর্মী আছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা ওয়াসার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেশিনও আছে। তারপরেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বারবার নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপায়।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এর তৃতীয় তফসিলে বলা হয়েছে, ছোটখাটো নালা, ড্রেন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে সিটি করপোরেশন। এই আইনের সূত্র ধরে সংস্থা দুটি পরস্পরের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। এবার ওয়াসার শীর্ষ পর্যায় থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, ওয়াসা এবার কোনো বক্সকালভার্ট ও ড্রেন পরিস্কার করবে না। খাল খনন ও বর্জ্য অপসারণের কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে তারা। এমনকি এসব কাজের জন্য কোনো অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয় নি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০০০ এর ৬ (ক) ধারায় আদেশের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো)। এই আইনে ঢাকার নদী, খাল, জলাভ‚মি সংরক্ষনের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে পাউবো। আইনে জলাবদ্ধতা দূর করার কথাও বলা আছে। এই আইন বলে ঢাকা মহানগরকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই অংশে ভাগ করে নিষ্কাশন প্রকল্প হাতে নিয়েছে পাউবো। এর ডিজাইন দপ্তরের ঢাকার নদী ও খালগুলো পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন পথের প্রবাহ ˆতরির নকশা করার কথা রয়েছে। কিন্তু এসব পরিকল্পনা শুধু কাগজেই আছে। বাস্তবে রাজধানীর নদী ও খাল নিয়ে পাউবোর দৃশ্যত কোনো কর্মকান্ডে চোখে পড়ে না।
আবার ওয়াসার হাত থেকে ড্রেনেজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে। কিন্তু ওয়াসার সেই দায়িত্ব পালন করছে না সীঠকভাবে। পুনরুদ্ধার এবং রক্ষণাবেক্ষণ, পয়োনিষ্কাশন ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য এক হাজার ১০০ কোটি টাকার সমন্বিত প্রকল্প হাতে নিয়েছিল ওয়াসা। বিশ্বব্যাংকের এ টাকার বেশির ভাগই ব্যয় করা হয়েছে খালের পেছনে। এ বিপুল অর্থ ব্যয়ে খালের কী ধরনের কাজ হয়েছে তা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে রয়েছে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। ওয়াসার অভিযোগ, সিটি করপোরেশন সারফেস (উন্মুক্ত ) ড্রেনগুলো পরিস্কার রাখে না। আবার সিটি করপোরেশন জানাচ্ছে, ওয়াসা বক্সকালভার্ট ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ পরিস্কার করে না। পরিস্কারের নামে প্রকৌশলী ও ঠিকাদার টাকা-পয়সা লুটে নেন।
রাজধানীর খাল যখন অস্তিত্ব সংকটে তখন তা রক্ষায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে গঠন করে দেওয়া হয় টাস্কফোর্স। সরকারের প্রভাবশালী একাধিক মন্ত্রীর সমন্বয়ে গঠিত এ টাস্কফোর্সও ব্যর্থ।
এভাবে কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানো আর খালখেকোদের দৌরাত্মে একটু বৃষ্টি হলেই রাজধানী ডুবে থাকে পানির নিচে। বাড়ে জলাবদ্ধতা, সৃষ্টি হয় মহাদুর্ভোগ। সেই দুর্ভোগে অতিষ্ঠ ঢাকা নগরীর লাখো মানুষ। তারপরেও নেই প্রতিকার। এভাবে চলতে থাকলে রাজধানী ঢাকার জনদুর্ভোগ বাড়বে ˆব কমবে না। অদূর ভবিষ্যতে নগরী হবে খালশূন্য। টানা বর্ষণ হলেই রাজপথ যাবে ডুবে। আর তা থাকবে দীর্ঘসময়। নগরজীবন হয়ে উঠবে আরো সংকটময়। আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। জলাবদ্ধতার এই মহাদুর্ভোগ থেকে মুক্তি চায় তিলোত্তমা ঢাকা নগরীর বাসিন্দারা। সেই মুক্তি মিলবে কবে- এ প্রশ্ন রাজধানীর সব মানুষের।