হাঁকডাকেই সীমাবদ্ধ বাজার মনিটরিং

5

যুগবার্তা ডেস্কঃ প্রতিবছরই রমজানের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সরকার ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা কাজে দেয় না।

নজরে পড়ে না নজরদারিও। এর ব্যতিক্রম ঘটেনি এবারও। বেড়েছে পণ্যের দাম। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিনির দাম। তা-ও আবার সরকারি চিনিকলের চিনি এখন সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অন্তত তিনবার বৈঠক করে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, এবার রমজানের সব পণ্যের চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ মজুদ রয়েছে, যে কারণে দাম বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনাই নেই। সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে গত ১৩ মে-ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। রোজা শুরুর আগে গতকাল বুধবার দেখা যায় বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি ঠেকানো যায়নি।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের একটি প্রবেশমুখে টানানো রয়েছে সিটি করপোরেশনের একটি বোর্ড।

যেখানে বিভিন্ন পণ্যের প্রতিদিনের দাম লেখা থাকার কথা। তবে এর ওপর ময়লা পড়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে কবে সর্বশেষ দাম লেখা হয়েছিল তা বোঝার উপায় নেই। তবে সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের প্রবেশমুখে একটি তালিকা টানানো রয়েছে, যেখানে ১৬ মেতে দাম হালনাগাদ করা হয়েছে। এখানে দুটি ঘরে পাইকারি ক্রয়মূল্য এবং যৌক্তিক বিক্রয়মূল্য লেখা রয়েছে। এতে দেখা গেছে, প্রতি কেজি চিনির পাইকারি মূল্য ৫৩ টাকা, যার যৌক্তিক বিক্রয়মূল্য লেখা আছে ৫৬ টাকা। এই বোর্ডের পাশ দিয়ে রয়েছে একটি সিঁড়ি, যে সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই বেশ কয়েকটি মুদি দোকান রয়েছে। দোকানগুলোতে কেজিপ্রতি ৬৫ টাকার নিচে কোনো চিনি বিক্রি হচ্ছে না। অথচ বিশ্বব্যাংকের বাজার পরিস্থিতির তথ্যে উঠে এসেছে ডিসেম্বর থেকে চিনির দাম টনপ্রতি ৩২০ ডলার থেকে কমে এপ্রিলে ২৭০ ডলারে নেমে এসেছে।
১০-১২ দিন আগে যখন পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা চলছিল তখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঢাকায় পেঁয়াজের পাইকারি আড়তগুলোতে অভিযান পরিচালনা করে। সে সময় বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দেয় তারা। বস্তার গায়ে দাম ও পরিমাণ লেখার নির্দেশ দেয়। যদিও এ নির্দেশনা এখনো ঠিকভাবে মানছে না ব্যবসায়ীরা।

কথা ছিল, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, র্যাব-পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং টিমসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আগে থেকে রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের বাজারে দাম বৃদ্ধি ও জাল-জালিয়াতি নিয়ে নজর রাখবে। ক্রেতারা মনে করে, এই নজরদারির অভাবেই ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, ‘আমরা পাইকারি বাজারে বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে অভিযান পরিচালনা করতে পারি। কিন্তু এত বেশি খুচরা দোকানে গিয়ে মনিটরিংটা বেশ কঠিন, যে কারণে পাইকারিতে অনেক সময় ঠিক থাকলেও সেটা খুচরাতে থাকছে না। ’

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিভিন্ন প্যাকেটজাত পণ্যের দাম নিয়ে কাজ করে। ঠিকমতো প্যাকেটের গায়ে এই দাম লেখা আছে কি না, তার অতিরিক্ত কেউ দাম নিচ্ছে কি না, উত্পাদান ও মেয়াদ ঠিকঠাক উল্লেখ থাকল কি না, পণ্যে ভেজাল রয়েছে কি না—এসব বিষয়ই গুরুত্ব পায়। তবে রমজান উপলক্ষে বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি গতকাল পর্যন্ত নামতে পারেনি। আগামী শনিবার রমজান উপলক্ষে প্রথম বাজারে অভিযান চালানো হতে পারে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা।

বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) প্রকৌশলী এস এম ইসহাক আলী বলেন, ‘আমরা বাজার পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন বিষয়ে নজর রাখি। এর মধ্যে মান, দাম ও মেয়াদ গুরুত্বপূর্ণ। তবে রমজানে বাজার অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও সেটা এখনো শুরু করতে পারিনি আমরা। আগামী শুক্রবার না পারলেও শনিবার থেকে অভিযান শুরু হতে পারে। ’

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) সাধারণ খাদ্যপণ্যের ভেজাল, পণ্য তৈরির পরিবেশসহ নানা বিষয়ে বাজার মনিটরিং করে। রোজার মাসে তাদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার কথা থাকলেও গত বুধবার পর্যন্ত কবে থেকে তা শুরু হবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। মোবাইল কোর্টে ভেজাল পণ্য তৈরি বা বিক্রির সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের অর্থ ও কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়ে থাকে। বিএফএসএর সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, ‘পণ্যে ভেজাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। তবে এখনো এর তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। ’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিমের মূলত বিভিন্ন দোকানে মূল্যতালিকা রয়েছে কি না সেটা পর্যবেক্ষণ করার কথা রয়েছে। এর আগে খুচরা দোকান থেকে শুরু করে সব ধরনের দোকানেই আলাদা একটি বোর্ডে প্রতিদিনের পণ্যের মূল্যতালিকা টানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটা দীর্ঘদিন ধরেই কেউ ঠিকভাবে মানছে না। আর এই মনিটরিং না থাকার কারণেই এই সমস্যাটা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। অবশ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রোজার বাজার মনিটর করতে মন্ত্রণালয় ১৪টি মনিটরিং টিম গঠন করেছে। ইতিমধ্যে এই কমিটি বাজারে অভিযান শুরু করেছে বলে তাঁরা দাবি করেন। তাঁরা বলছেন, নজরদারি টিম বিভিন্ন বাজারে গিয়ে বিক্রেতার কাছে তার ক্রয়মূল্যের রশিদ পর্যালোচনা করে বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখছেন।

বাজার মনিটরিংয়ে বিভিন্ন সংস্থার কাজ করার কথা থাকলেও সেটা কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘মনিটরিংয়ের আগে নীতিটা ঠিক করতে হবে। তা না হলে কাউকেই ধরা সম্ভব নয়। নিয়ম আছে প্রতিটি খুচরা দোকানে পণ্যমূল্য টানানোর। কিন্তু দেখেন একটিতেও সেটা মানা হচ্ছে না। এটা কেউ দেখছে? দেখছে না। তাহলে কিভাবে কাজটা হবে?’ গ্রাহককে হুমড়ি খেয়ে একেবারে বেশি পণ্য না কেনার পরামর্শও দেন তিনি।

বাজারদর : কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান জেনারেল স্টোর, মামা-ভাগ্নে জেনারেল স্টোর ও আল-আমিন জেনারেল স্টোরে মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, রমজানে দাম কিছুটা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এবার খুব বেশি দাম বাড়েনি বলেও জানায় তারা। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দোকানিদের নাম জানতে চাইলে তারা কথা বলতেই অনাগ্রহ প্রকাশ করে। পেঁয়াজের দাম আগেই বেড়েছে, যা আর কমেনি। বেশ কিছুদিন ধরে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দামে কোনো ধরনের অস্থিরতা না থাকলেও দেশের বাজারে কিছুদিন আগেই সেটা ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি পেঁয়াজ ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে পেঁয়াজের গড় মূল্য বেড়েছে ৩১ শতাংশের মতো। কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের পাইকারি বিক্রেতা লোকমান হোসেন বলেন, যখন বেড়েছে তখন সমস্যা ছিল। আর দাম বাড়বে বলে মনে হয় না।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮৫ টাকায়। তবে বিভিন্ন সুপারশপে এই ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা বা তারও বেশি দামে। ছোলা এত বেশি দামে বিক্রি হওয়া উচিত না বলে মনে করে পাইকারি বিক্রেতারা। রহমতগঞ্জ ডালপট্টির মেসার্স রাজ্জাক বিতানের পাইকারি বিক্রেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘পাইকারি বাজারেই ৫৫-৬২ টাকায় ভালোমানের প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে ২০ টাকার বেশি লাভ করাটা অনৈতিক। ’

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম কমলেও কমেনি দেশের বাজারে। বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি আউটলুকের তথ্য মতে, ডিসেম্বরে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৮৭১ ডলার, যা এপ্রিলে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৩০ ডলারে। অর্থাৎ কম্পানিগুলোর খরচ কমলেও কমানো হয়নি সয়াবিনের দাম। প্রতি লিটার সয়াবিন ১০৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পাঁচ লিটারের বোতল কোনো কম্পানি ৫৪০ টাকা, কোনো কম্পানি ৫৫০ টাকায় বিক্রি করছে। মাঝ থেকে বেশি বেশি কমিশন উঠছে ডিলার বা দোকানিদের পকেটে। তবে মাঝেমধ্যে সুপারশপগুলোতে বেশ ছাড়ে (অফার দিয়ে) সয়াবিন তেল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে।

বেড়েছে খোলা সয়াবিন তেলের দাম। যে তেল সপ্তাহখানেক আগেও বিক্রি হতো ৮৫-৮৮ টাকায় তা এখন প্রতি লিটার ৮৮-৯০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। শুক্রাবাদের কয়েকটি মুদি দোকানে এই তেল ৯০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া রমজানের সময় শসা, বেগুন, মসুর ডাল, কাঁচা মরিচ ও লেবুর চাহিদা বেড়ে যায়। গতকাল ঢাকার বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ৪৫-৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩৫-৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০-৮৫ টাকা, লেবু ২৫-৩০ থেকে বেড়ে ৪০-৫০ টাকা হালি বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে মসুর ডাল মুদি দোকানগুলোতে ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেলেও বিভিন্ন সুপারশপে একই ডাল ১১০-১২৫ টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি বিক্রি করতে দেখা গেছে।

গত রবিবার বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে সহনীয় মাত্রায় মুনাফা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই দিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, চিনি ও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, চিনিসহ সব নিত্যপণ্যের দাম কমছে। তাই বাজারে দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই।-কালেরকন্ঠ