বর্ষা আসছে পাহাড় ধ্বসের আশংকা বাড়ছে; মৃত্যুপুরী নয় বাসযোগ্য পাহাড় চায় পাহাড়ি জনপদের মানুষ

11

যুগবার্তা ডেস্কঃ ভারি বর্ষণ হলেই পাহাড়ি জনপদে মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। গভীর ঘুমের মধ্যেও আঁতকে উঠে মন। এই বুঝি পাহাড় ধ্বসে মাটি চাপায় অকালে ঝরবে প্রাণ! বর্ষা আসছে। পাহাড়িদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বাড়ছে। বাড়ছে পাহাড় ধ্বসে মৃত্যুর আশংকা। বাড়বেই না বা কেন, প্রতি বছরই তো পাহাড় ধ্বসে মৃত্যুর মিছিল বাড়তে থাকে। সেই মিছিলে স্বজনহারাদের কান্নার আওয়াজে ভারি হয় সবুজ পাহাড়ের আকাশ। লাশের সারি আর পাহাড়ি অধিবাসীদের গগণবিদারী আওয়াজে দেশবাসি শোকে স্তব্ধ হলেও কান্নার আওয়াজ পোঁছায় না পাহাড় খেকোদের কানে। তাই তারা নিজেদের হীনস্বার্থে নির্বিচারে পাহাড় কেটেই চলে। ক্ষমতা, টাকা আর পেশিশক্তির কাছে জিম্মী হয়ে পড়ে স্থানীয় প্রশাসন। দেখেও না দেখার ভান করে তারা। বর্ষা মৌসুমে চলে নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার মাইকিং আর লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা। ফলে বর্ষা এলেই পাহাড় চাপা পড়ে শত শত মানুষ। গত এক যুগে পার্বত্য চট্রগ্রামে তিন শতাধিকের বেশি মানুষ পাহাড় ধ্বসে মারা গেছেন। এ বছর পাহাড় খেকোদের সাথে নতুন বিপদ যুক্ত হয়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের পাহাড়ের ঢালে অবৈধ বসবাস। রোহিঙ্গারা অবাধে

পাহাড় আর গাছপালা কেটে বসবাস করায় পাহাড় ধ্বসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী এইসব রোহিঙ্গাদের কারণে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক বিপর্যয় ও পাহাড় ধ্বসেরর আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা।

পাহাড় ধ্বসে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু পাহাড়খেকো আর পাহাড়ে বন উজার করে গাছ কাটা অমানুষদের দৌরাত্ম কমে না । ক্ষমতার দাপটে ওরা গড়ে টাকার পাহাড়। সেই দাপটে নির্মম মৃত্যুর শিকার হন সাধারণ মানুষ। মৃত্যুপুরী হয় পাহাড়ি জনপদ। ফি বছর ঘটে ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসের ঘটনা। ২০০৭ সালে ঘটে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসের ঘটনা। ওই ঘটনায় ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। গত বছর পাহাড় ধ্বসে মৃত্যুর ঘটনা আরও ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক। পরপর কয়েক দিনে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। আর গত ১০ বছরে মৃত্যু হয়েছে প্রায় চার শতাধিক। এভাবে বছর যাচ্ছে আর পাহাড় ধ্বসে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে।

এত কিছুর পরেও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ পাহাড়ি জনপদে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে হাজার হাজার মানুষ। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী এসব মানুষের প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি চিহ্নিত ৩০টি পাহাড়ে কম পক্ষে পাঁচ হাজার পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।

বর্তমানে মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারী অবস্থায় বিরাজ করছে। এ সময় অতি ভারি বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভ‚মিধসের বড় ধরণের শংকা রয়েছে। তার সাথে নতুন করে এ বছর যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। এই বর্ষায় রয়েছে মারাত্মক বিপর্যয় ও ভূমিধ্বসের আশংকা। গত বছর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অমানবিক নির্যাতনে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা পাহাড়ের পাহাড়ের ঢালে বসবাস করছে। তারা পাহাড় ও গাছ কেটে ঝুপড়ি ঘর ˆতরি করে বসবাস করায় পাহাড়কে ক্রসেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাদের কারণে স্থানীয়রাও রয়েছে ঝুঁকিতে। রোহিঙ্গাদের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়া না হলে বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক প্রাণহানির আশংকা করছেন সংশ্লিষ্ট। বর্ষা যত ঘনিয়ে আসছে উখিয়া-টেকনাফে বসবাসরত রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বাড়ছে। সবুজ পাহাড়ে রোহিঙ্গারা পাহাড়ের চ‚ড়া, ঢালু বা নিম্নাঞ্চল বসবাস করছে, ভারি বর্ষণে সেসব স্থানে ভূমিধস ও বন্যায় প্লাবিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। ফলে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে রোহিঙ্গারা। ঝুঁকিতে আছেন পাহাড়ি জনপদের লাখো মানুষ।

পাহাড় ধ্বসপ এই প্রাণহানি কি কেবলই প্রাকৃতিক দুর্যোগ! না শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে রয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগও। পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে। বর্ষার আগেই রোহিঙ্গাদের পাহাড় থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে- বলছেন পাহাড় বিশ্লেষকরা।
‘পাহাড় ধস’ নিয়ে এবার বর্ষার আগে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা প্রশাসককে আট নির্দেশনা সম্বলিত ‘বার্তা’ দিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। গত ২০ মার্চ স্বাক্ষরিত এ বার্তায় পাহাড় ধ্বসেরর বিপর্যয় ঠেকাতে এবার বর্ষা মৌসুমের আগেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। চট্টগ্রাম,কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসককে পাঠানো বার্তায়-ঝুঁকিপূর্ণস্থানে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরানোর পাশাপাশি নতুন করে বসতি, আসন্ন বর্ষা মৌসুমের পূর্বেই পাহাড়ের পাদদেশ এবং ঢালে বসবাসকারীদের অস্থায়ীভাবে অন্যত্র আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা, পাহাড় কাটা ও ধ্বসের সঙ্গে যে সকল প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ আটটি নির্দেশনা দিয়েছেন।

কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করে বলেছেন, পাহাড়ে নানা উদ্যোগ, ˆবৈঠক, সুপারিশ থাকলেও কোনো কিছুরই বাস্তবায়ন হয় না। ফলে পাহাড় কাটায় অভিযুক্তরা থেকে যায় আড়ালে, ধরাছোঁয়ার বাইরে। তদুপুরি পাহাড় কাটার সঙ্গে প্রভাবশালী মহল যুক্ত থাকায় প্রশাসনও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসে না। ফলে রুটিন ওয়ার্কের মত পাহাড় রক্ষায় উদ্যোগ ও সুপারিশ থাকলেও তা আলোর মুখ দেখে না। আবারও আঘাত হানে। কেড়ে নেয় তরতাজা কিছু প্রাণ। তারপরও পাহাড়ের পাদদেশে মানুষের বসবাস থামছে না। থামছে না পাহাড় ধ্বসও।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাহাড় ধ্বসের প্রকৃত কারণ উ˜ঘাটন করে তা রোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশ থেকে লোক সরানো ও তাদের পুনর্বাসন, ফাটলের ঢালে বিশেষ বলয় ˆতরি ও পানি সরাতে ক্যানেল নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্যোগ মোকাবেলায় তারা দুর্যোগের আগে ব্যাপক সবুজায়ন, পাহাড় কাটা বন্ধ ও দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় দক্ষ লোকবল গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল আর কেউ দেখতে চায় না। মৃত্যুপুরী পাহাড় নয়, নিরাপদ বাসযোগ্য সবুজ পাহাড় চায় পাহাড়ি জনপদের মানুষ।