বিয়ে সাদীর একাল সেকাল!!!

13

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীন: ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের বিয়ে সাদীর অনুষ্ঠানাদি নিয়ে খুব একটা ভাল ধারণা ছিল না আমার। গাওগেরামে ছিলাম। ওখানকার কৃষ্টি কালচার দেখেই বড় হয়েছি। অবিশ্বাস্য রকমের কৃষ্টি কালচার। আনন্দ বেদনায় মাখামাখি কালচার। কখনো কখনো দেখতাম বেদনাও ছাড়িয়ে যায় আনন্দের মাত্রাকে। ছোট হলেও কিছুই যে বোঝতাম না, তা নয়। মনে হত, বিয়েসাদী যতনা হাসাহাসির, তারচেয়ে ঢের বেশী রেশারেশির। মানে একপক্ষের গায়ে পড়ে অন্য পক্ষের দোষ খোঁজা। কিংবা পায়ে পড়ে কথায় কথায় পারাপারি করা।
পারাপারিটা মাঝেমধ্যে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যেত। খাবারে টান পড়েছে কিংবা টান পড়ানো হয়েছে, এ নিয়েই তুলকালাম কান্ড। বেড়াছ্যাড়া লেগে যেত দেনমোহরানার পরিমান আর জামাইয়ের গেট ধরা নিয়েও। এ এক অদ্ভুত ব্যবস্থা। জামাইকে গেটে স্বাগতম জানানো, মানে নতুন জামাইকে গেটে আটকে দিয়ে টাকা কামানো। ততক্ষণ জামাইকে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো, যতক্ষণ লেনদেনের বিষয়টি ফয়সালা না হতো।

এর মাঝেই দু’পক্ষের লোকজনের পাল্টাপাল্টি কথামালা। কথা দিয়ে অপরপক্ষকে ঘায়েল করার কথা কথা খেলা। যে যেমন পারে। প্রথমে খেলাটি হাসিঠাট্টায় থাকলেও পরে ভিন্নমাত্রায় রূপ নিত। বাঁকা কথা শুরু হতো। এভাবে বেশীক্ষণ নয়। হঠাৎ কেউ একজন সামান্য একটু উল্টাপাল্টা বলে ফেলেছে তো শুরু হয়ে যেত। শুরু হত কথা দিয়ে যাতাযাতি, তর্কে তর্কে মাতামাতি; অবশেষে অনাকাঙ্খিত হাতাহাতি। হাতাহাতি ছাড়া বিয়ে শেষ হতে খুব কমই দেখেছি।
তবে হাতাহাতির পরে সাধাসাধিও ছিল। বরপক্ষের লোকজন ক্লান্ত ও বিষন্ন মনে ভীষন গোস্বা করে বসে আছে। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়েই বসে আছে। পণ করেছে, কোনভাবেই এই বাড়ীতে এককণা দানাপানিও মুখে নেবে না। জাষ্ট বউকে নিয়ে চলে যাবে। কণেপক্ষ মাইনকার চিপায় পড়েছে। এ থেকে বেরুতে হবে। চেষ্টা শুরু হলো। বরপক্ষকে শরবত আর পিঠা দিয়েও সামলানো যাচ্ছে না। ক্ষুধার্থ বরপক্ষের লোলুপ দৃষ্টির চোখ ওদিকে গেলেও না দেখার ভান করছে। খাবার জন্যে মনে প্রচন্ড আগ্রহ। কিন্তু মুখে “বিদায় দেন, বিদায় দেন” বলে হুমকি দিচ্ছে। বাড়ছে সাধাসাধি, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। হুমকি বেড়েই চলেছে। এসব হুমকি আর গোস্বা যতনা মূল লোকজনের, তারচেয়েও ঢের বেশী সাথে আসা কিছু ফেউয়ের। তাদের ভাবসাবই আলাদা। বিশাল হাম্বিতাম্বি ভাব। উষ্কে দেয়া ছাড়া আর কোন কাজ নেই। এদের মাঝে একজন লিডার কিসিমের লোকও থাকতো; এবং স্বভাবে সে হতো বিশেষ ধরনের খবিশ প্রকৃতির। খবিশ মানে ইবলিশের বাপ। কোথা থেকে ইবলিশের এই বাপটা জুটতো কে জানে। তবে জুটতো এবং পুরো ক্যাচালটা তার নিয়ন্ত্রণেই থাকতো।

ছোটবেলায় গাওগেরামের এমনি ধারনা নিয়েই কৈশোর পেরিয়েছি। বড় হয়েছি দেশবিদেশের শহরে। তাই গাওগেরামের পরিবর্তিত কালচারের ব্যাপারে তেমন ধারণা ছিল না। সেদিন আবারো গ্রামের বিয়েতে যাবার সুযোগ হলো। জুঁইয়ের বিয়ে বলে না যেয়ে উপায় ছিল না। কণ্যাতুল্য জুঁই আমাদের ফাউন্ডেশনের আজিম উদ্দীন ভাইয়ের মেয়ে। বাড়ীতে পৌঁছার পর আমি তো রীতিমত অবাক। এত সুন্দর সাজানো গোছানো, পরিপাটি আর আলো ঝলমল বিয়ের প্যান্ডেল! অবাক না হয়ে উপায় নেই।
বিশাল আয়োজন। হাজার দু’য়েক লোকের আয়োজন। বড়বড় ডেকচিতে লাইন ধরে রান্না হচ্ছে। রোষ্ট, পোলাও, রেজালা; কোন কিছুরই কমতি নেই। ধনীগরীবের ভেদাভেদ নেই। তবে সতর্কতা আছে। হিন্দুদের জন্যে সতর্কতা। আলাদা সামিয়ানা, আলাদা খাবার। ওরা সব খাবার খায়না বলেই আলাদা ব্যবস্থা। ব্যবস্থা সবার জন্যেই সমান। উচুনীচু, আবালবৃদ্ধবণিতা সবার জন্যে সমমানের আয়োজন। কোন হৈ-হুল্লোর নেই, গেট ধরাধরি নেই; নেই মারামারি, ফাটাফাটি কিংবা কাটাকাটি।
দেরী করেনি; সময়মতই কণেকে ডায়াসে বসানো হয়েছে। বহু দূর থেকে এলেও, ফুলেল গাড়ীতে করে বরও মোটামুটি সময় মতই চলে এসেছে। আজিম ভাই ঘুরে ঘুরে সবার টেবিল দেখছেন, খোঁজ নিচ্ছেন। সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করছেন। সব জায়গায় তার চোখ। সবাই তার গেষ্ট। কারো মর্যাদার কোন কমতি যেন না হয়, সেজন্যে তিনি যারপরনাই সতর্ক। খুব ভাল লেগেছে তার ব্যবস্থাপনা দেখে। আর ভেঙ্গেছে আমার কৈশোরের ধারণা। ষ্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম; দিন বদলের পালায় বদলেছে গ্রাম, বদলেছে বাংলা।

সময়ের বিবর্তনে সব কিছুই বদলায়। তাই শহরও বদলেছে। বিশেষ করে বদলেছে এলিট শ্রেণী। এলিট বলতে কথা! গ্রাম বদলাবে আর তারা বদলাবে না, এটা কি হয়! এই শ্রেণীর দু’একটা দাওয়াতে যে যাওয়া হয় না, তা নয়। ভুল করে হলেও দাওয়াত পাই। তবে ওখানে যেয়ে সুখ পাই না। না পাবার প্রথম কারণ দাওয়াতের কার্ড। এলিট শ্রেণী বাংলায় দাওয়াত কার্ড ছাপায় না। ছাপায় ইংরেজীতে। কেন ছাপায় জানি না। নিজের মাতৃভাষায় ছাপালে সমস্যা কি, এটাও মাথায় আসে না!

মজার ব্যাপার হলো মধ্যবিত্তের বিয়েতে যেয়ে আপনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বরকণেকে দেখতে পারবেন; কাছে যেতে পারবেন। কিন্তু এলিট শ্রেণীর বিয়েতে পারবেন না। পার্লার থেকে সেজেগুজে আসতে ওদের এত দেরী হয় যে বিয়েবাড়ী তখন অতিথিশুণ্য প্রায়। আর বরকণে থাকলেও ওদের মঞ্চ ক্যামেরাম্যানের দল এমনভাবে ঘিরে রাখে যে, কিছুই দেখার সুযোগ থাকে না। আগেকার দিনে দু’চারজন ক্যামেরাম্যান থাকতো। এখন তো যত অতিথি, তত ক্যামেরাম্যান। আবার লাইট, ছাতা আর ক্যামেরা এমনভাবে সেট করা থাকে যেন মনে হবে, বিয়ে বাড়ী নয়; মঞ্চে নাটক, সিরিয়ালের স্যুটিং চলছে।

এদিকে বেচারা হোষ্টের দেখা পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি মহাব্যস্ত। তথাকথিত দু’চারজন ভিআইপির খেদমতে তার ব্যস্ততার সীমা নেই। মোবাইল কানে নিয়ে হন্যে হয়ে একবার বাইরে যান, আবার ভিতরে আসেন। কিন্তু ততক্ষণেও ভিআইপি আসেন না। ভিআইপি বলে কথা! তাদের আবার আলাদা খাসিলত। তারা আস্তে ধীরে আসেন। আসেন দেরীতে আর এসেই যাই যাই করেন। আবার তাদেরকে পথ চিনিয়ে চিনিয়ে আনতে হয়। হোস্ট দাওয়াত করে আনে সমাজের সবাইকে। কিন্তু ব্যস্ত থাকে কেবল দু’চারজন ভিআইপিকে নিয়ে। বাকীদের দিকে খেয়াল নেবার জোঁ নেই। কেউকেটা ক্ষমতাধর ভিআইপি বলে কথা। এই ভিআইপিরা তাদের তেমন কিছু হয়ও না। সমাজে তাদের সাথে চলাফেরাও তেমন নেই। তারপরেও বিশেষ অনুরোধ করে ধরেবেঁধে জোর করে নিয়ে আসে। নিজেদের তথাকথিত সোস্যাল স্ট্যাটাস আরো বাড়ানোর জন্যেই নিয়ে আসে।

তাদেরকে এভাবে আনাটা দোষের নয়। দৃষ্টিকটুও হয়ত নয়। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলে যেভাবে গাড়ীর ড্রাইভারদেরকে টোকেন দিয়ে বাইরে থাকা সামান্য খাবারের প্যাকেট সংগ্রহ করার জন্যে লাইনে দাঁড় করানো হয়, তা অসহ্য রকমের দৃষ্টিকটু হয়। সব এলিটগণই ড্রাইভারের সাথে একই গাড়ীতে চড়ে আসতে পারে। সারাদিন গাড়ীতে ঘুরতে পারে। ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে কাটাতে পারে। পারেনা কেবল বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে একই হলে ঢুকে একই ম্যানুর খাবার খেতে। কী জঘন্য রকমের বর্ণবৈষম্যময় তথাকথিত এলিটদের বিচিত্র এইসব রুচি!

একদিন এমনি কোন এক অনুষ্ঠানে হঠাৎ মাইকে ঘোষনা; “সবাই সতর্ক হোন। যার যার মোবাইল সাবধানে রাখুন।” বিস্মিত হয়ে নিজের পকেটের দিকে আগে তাকালাম। বলে কি! তাকালাম এদিক ওদিকও। দেখলাম, হন্যে হয়ে দু’জন অতিথি তাদের হারিয়ে যাওয়া দুটো মোবাইল খুঁজছেন। কী বিশ্রী অবস্থা। এলিটদের মোবাইল মানেই তো দামী মোবাইল। হারালে খারাপ তো লাগবেই। তাই খুবই মন খারাপ করে খুঁজছেন। মন আমারও খারাপ হলো।
আরো কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে ছিল। মাথাটা ভনভন করাতেই বেরিয়ে এসেছি। হিসেব মিলছিল না বলে মাথাটা ভনভন করছিল। ভাগ্যিস চোর মনে করে গেটে আমাদের কেউ চেক করেনি। গাড়ীতে উঠতে যাবো, অমনি আমার শোনিমের জিজ্ঞাসা। শোনিম ছোট মানুষ। ওর জিজ্ঞাসার শেষ নেই। সারাক্ষণই শুধু জানতে চায়। আজকেও খুবই কৌতুহল নিয়েই জানতে চাইলো, আব্বু! এলিটদের অনুষ্ঠানে ড্রাইভারদেরও তো ঢুকতে দেয়নি। সবাই তো এলিট! তাহলে মোবাইল দুটো চুরি করলো কে?
বরাবরই আমি শোনিমের সব প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করি। আজকে নির্বিকার; কোন চেষ্টাই করলাম না। চেষ্টা করার ক্ষমতাও আমার ছিল না। আর থাকলেই বা কি? বৃথা চেষ্টা করার কোন মানেও তো হয় না!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।