মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গিকার

23

এম এইচ নাহিদঃ মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী আগ্রাসন জাতীয় অস্তিত্বেট জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অন্যতম শক্তি হলো দেশের তরুণ সমাজ। মাদক, সন্ত্রাসের ভয়াবহতা ও জঙ্গিবাদের ছোবল তরুণ সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনছে। সারাদেশে মাদকের বিস্তার ঘটেই চলছে। এই মাদক যুব সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে সন্ত্রাসের পথে। ফলে দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, যৌন নির্যাতন বাড়ছে আশংকাজনক হারে। জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসের ভয়াবহতা কিছুটা কমলেও জঙ্গি গোষ্ঠীকে এখনো নির্মূল করা যায় নি। গোপনে সংগঠিত হচ্ছে জঙ্গিরা। এতদিন গরিব পরিবারের সন্তানরা জঙ্গিবাদে জড়ালেও এখন উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এদিকে ঝুঁকছে। বাড়ছে উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত নারীদের অংশগ্রহণ। সরকার মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ ঘোষণা করলেও বিপদ কমছে না। মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে মোকাবেলায় কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

এদেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধর হলেন তরুণ সমাজ। তারা অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেমন ভূমিকা রাখবে, তেমনি আগামী দিনে দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দিবে। সেই তরুণ সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনছে সর্বনাশা মাদক। এর ভয়াল থাবা থেকে কোনোভাবেই তাদের রক্ষা করা যাচ্ছে না। সারাদেশে ৩২টি জেলার ৫১০টি সীমান্তবর্তী পয়েন্ট দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসছে মাদক। স্থলপথ, জলপথ, রেলপথ ও আকাশ পথ সব দিক দিয়ে ঢুকছে মাদক। ভয়াবহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলছে মাদক ব্যবসা। বিক্রেতারা শুরু করেছে ‘হোম সার্ভিস’। ফোন করলেই বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদক। আর এই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন বিভিনś রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা। অবৈধ অস্ত্র, অর্থ আর রাজনৈতিক প্রভাবে দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে মাদক মাফিয়ারা। মাদকের ডেরায় অভিযান চালালেই চলে পুলিশের ওপর হামলা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাদেশে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা এক লাখ ৬০ হাজার। যার মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন নারী। মাদক বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে কোমলমতি শিশুদেরও। মাদকের থাবা পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। আগে গাঁজা প্রধান মাদক হলেও এখন সেই স্থান দখল করেছে ইয়াবা। মাদকাসক্ত যুবক ক্রমেই ধাবিত হচ্ছে সন্ত্রাসের দিকে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মানুষ খুনসহ এমন কোনো কাজ নেই যা তারা করছে না। ফলে আশংকাজনক হারে বাড়ছে সন্ত্রাস। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও খুন হচ্ছে। মাদকাসক্ত হয়ে বিপদগামী তরুণ সমাজ নিজের বাবা-মা, ভাই-বোনকেও খুন করতে দ্বিধা করছে না। নেশার টাকা যোগাতে তারা ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবেও কাজ করছে। গত ৯ মার্চ হেরোইনের টাকা জোগাড় করতে মোটর সাইকেল চুরি করে হোরোইনসেবি শিবলী। চুরি দেখে ফেলায় ছুরিকাঘাত করে বাড়ির দারোয়ানকে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মাদকাসক্ত এক যুবক নেশার টাকা সংগ্রহ করতে রিক্সা যাত্রাীর ব্যাগ ধরে টান মারলে ওই নারীর কোল থেকে ছিটকে পড়ে তার ৬ মাসের শিশু সন্তান। তাছাড়া ঢাকা নগরীর ৯৫ শতাংশ চালক মাদক সেবন করে। ফলে অহরহ ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। এভাবে প্রতিনিয়ত মাদকাসক্ত তরুণরা সমাজ ও রাষ্ট্রে সংকট সৃষ্টি করছে। মাদক ও সন্ত্রাসের ভয়াবহ সংকট থেকে তরুণ সমাজকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তৎপর হতে হবে আইন শৃংখলা বাহিনীকে। পাশাপাশি সরকারকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। বেশির ভাগ মাদক ব্যবসায়ী ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকে। সরকারকে মাদক ব্যবসায় মাফিয়াদের খুজে বের করে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী কোনো দলের নয়। ওরা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। সেই সাথে পারিবারিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে। তাহলেই দেশ থেকে মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করা সম্ভব হবে।
জঙ্গিবাদ হচ্ছে মৌলবাদী রাজনীতির সশস্ত্র রুপ। ধর্মের অপব্যাখ্যা করে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনই মৌলবাদী রাজনীতির মূল লক্ষ্য। এই মৌলবাদী রাজনীতির ছত্রছায়ায় জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। আর এই জঙ্গিবাদ উত্থানের পিছনের কারিগর সাম্রাজ্যবাদ। পশ্চিমা দুনিয়া পৃথিবীর দেশে দেশে আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবের মাধ্যমে ওয়াহাবীবাদ ˆতরি করেছিল। লক্ষ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতন ঘটানো। সেই ওয়াহাবীবাদ মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করে জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস কায়েম করে। যার ছোবল থেকে রক্ষা পায় নি বাংলাদেশও।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রশ্রয়দাতা জামাত-শিবির। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গিদের আস্তানা থেকে পাওয়া গেছে মওদুদীর বই। তাছাড়া যারা আফগানিস্তানের নজিবুল্লাহ সরকারকে উৎখাত করতে গিয়েছিল তাদের অধিকাংশই এক সময়ের শিবির কর্মী। জামাতে ইসলাম ও হেফাজতে ইসলাম হলো জঙ্গিবাদের প্রকাশ্য মঞ্চ। জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ ইত্যাদি তাদের গোপন সংগঠন। কেবল ধর্মভিত্তিক দলই নয়, অনেক রাজনৈতিক দল ক্ষমতার স্বার্থে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদী রাজনীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। তাদের ওপর ভর দিয়ে এদেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলোর জন্য রাজনীতির সুযোগ অবারিত রেখে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা যায় না। বরং মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করা হয়।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কারখানা হলো কওমী মাদ্রাসা। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও কওমী মাদ্রাসাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা যায় নি। এ সুযোগে তারা সেখানে মৌলবাদের চর্চা ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ চালিয়েছে অবাধে। বর্তমান সরকারের সময়ে একদিকে জঙ্গি সন্ত্রাসীদের দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে জঙ্গিবাদের মূল হোতা হেফাজতকে নানাভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। তাদের দাবি মেনে সুপ্রীম কোর্টের ভাষ্কর্য সরানো, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন তার উদাহরণ। জামাত-শিবির যে জঙ্গিবাদের ধারক বাহক, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলও ওয়াকিবহাল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আইএইচএম জেনস’র মতে বিশ্বের সন্ত্রাসী তালিকায় ছাত্র শিবির তৃতীয়।

জঙ্গিবাদকে দমন করতে হলে দুই পথে এগোতে হবে। এক, জঙ্গিবাদ দমনে রাজনৈতিকভাবে আদর্শিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। জঙ্গিবাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে আপোষ নয়, বরং তাদের রাজনীতি চিরতরে উৎখাত করতে হবে।
দুই, জঙ্গিবাদ দমনে তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা নয়, আশার আলো জাগাতে হবে। ব্যাপক কর্মসংস্থান ও কর্মসূচি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এদেশের তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রƒপান্তর করতে হবে। সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে, গরিব মানুষের মুক্তি আসলে তাদের সন্তানরা জঙ্গিবাদে জড়াতে পারবে না। অন্যদিকে পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করতে হবে। প্রত্যেক পরিবারকে নিজেদের সন্তানদের বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখতে হবে। সন্তান যেনো কোনোভাবেই বিপথে না যায় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

জঙ্গিবাদের মূল কারণ হলো প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার, তরুণ সমাজের হতাশা, আধুনিক ও মানবিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং মগজ ধলাই। এসব ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া চর্চা বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে মাদক ও সন্ত্রাস দমনের জন্য সীমান্তে নজর বাড়াতে হবে। বন্ধ করতে হবে মাদক আনার ছিদ্রগুলো। তাছাড়া মাদক-সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে অন্ধকারাচ্ছনś হবে দেশ-জাতির ভবিষ্যৎ। এসবের জন্য সামাজিক সচেতনার পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গিকার খুব প্রয়োজন। রাজনৈতিক আদর্শিক অঙ্গিকার ছাড়া মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জোট ১৪ দলীয় সরকার সে পথে এগোবে এ প্রত্যাশা দেশবাসির।-লেখক: সাবেক সাধারন সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।