ধর্ষণের বিষয়টি বর্ষণের গতি পেয়েছে…

18

ইঞ্জিঃ সরদার মো: শাহীনঃ শিরোনামটি দেখে আমার রুচিবোধ নিয়ে পাঠককুলের প্রশ্ন উঠতে পারে। কেননা নূন্যতম রুচিবোধ বলতে একটা বিষয় আছে। যেটা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু একমাত্র মানুষ ছাড়া সব প্রাণীই বিষয়টি সব সময় মেনে চলে। মেনে চলে না কেবল মানুষ। মানুষ তার খাসিলতের যত জায়গায় বিকৃতি ঘটাতে পারে, রুচিবোধ তারমধ্যে অন্যতম। মাঝেমধ্যে মানুষের রুচিবোধের বিকৃতি পশুকেও আতঙ্কিত করে তোলে। সমগ্র মনুষ্য জাতিকে নামিয়ে আনে সর্বশ্রেষ্ঠ থেকে সর্ব নিকৃষ্টে। রুচিহীনতা প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের তুলনা কেবল মানুষ নিজেই।
সেদিন নেট দুনিয়ায় দেখলাম সদ্য কৈশোরে পা দেয়া বাংলাদেশী এক ছেলে গ্রামের কোন এক দোকান ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একটি দেশী মুরগীকে বলাৎকার করছে। জীবনে প্রথম এই অভাবনীয়, অরুচিকর এবং ভয়ংকর রকমের বিশ্রী ভিডিওটা দেখলাম। নেট দুনিয়ায় এসব দেখতে না চাইলেও উপায় নেই। রুচিহীনদের কারনেই মাঝেমধ্যে এসব সামনে এসে পড়ে। তবে এতটা অরুচিকর এই প্রথম। কাজটা করতে পেরে ছেলেটি খুশীতে আত্নহারা এবং ততোধিক আত্নহারা হয়ে সাথের সংগীটি ভিডিওটি করছে। ছেলেটির বয়স আর কতই বা হবে! আমার শোনিমের চেয়ে সামান্য বড় হবে হয়ত। অথচ কী অসামান্য তৃপ্তি আর ভঙ্গিতেই না সে প্রকাশ্যে সহাস্য বদনে কুকর্মটি করে চলেছে!
তবে ইদানীং ঐ বাচ্চা ছেলেটিই নয়, বয়সে এবং কর্মে বড় মানুষেরাও নানা ধরনের কুকর্ম করছে। গোপনে করছে, আবার প্রকাশ্যেও করছে। যে যেভাবে পারে করছে। চারদিকে যেভাবে শুরু হয়েছে, এখন আর এটিকে কেবল কুকর্ম বলা ঠিক হবে না। দেশব্যাপী ব্যানারে শোভিত আতিপাতি নেতারাও এসবে জড়িয়ে পড়াতে ক’দিন বাদে কুকর্মটি জাতীয় কর্মে পরিণত হয় কি না সে চিন্তা করার সময় এসেছে। কেমন একটা ক্রেজ যেন চারদিকে লক্ষ্যণীয়। হুটহাট দূর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। পত্রিকায় প্রায় প্রতিনিয়ত খবর আসছে এবং সেখানে ব্যানার নেতারাই শিরোনাম হচ্ছে।
স্থানীয় সালিশ দরবারের পাশাপাশি এতদিন আসতো ব্যানার নেতাদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ধমকাধমকি কিংবা আধিপত্য বিস্তারের খবর। এখন আসা শুরু হয়েছে নোংরা খবর। ক্ষমতার জোরে যেখানে সেখানে ধর্ষণ করার খবর। আবার আইন হাতে তুলে নেবার খবরও আসে। দ্রুত বিচারের নামে দ্রুত আইন হাতে তুলে নেবার খবর। বলা যায় নগদ অ্যাকশন। কোথায়ও কিছু একটা হয়েছে, অমনি তাদের ডাক পড়ে। যেন তারা ডাকের অপেক্ষায় থাকে। ডাক পেলেই শুরু হয় অ্যাকশন। বেসরকারী ফোর্সের বেদরকারী অ্যাকশন।
চট্রগ্রামের বিজ্ঞান কলেজ। ঘটনার দিন বন্ধ থাকার পরও কলেজে গিয়ে জড়ো হওয়া অনেক ছাত্রের হৈ হুল্লোড় দেখে প্রথমে অবাক হন অধ্যক্ষ ডঃ জাহেদ খান। ছাত্ররা ক্রমান্বয়ে মারমুখী হওয়ায় তিনি ঘাবড়ে যান। এক পর্যায়ে তারা নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনিকে ফোন করে নিয়ে আসে। তিনি আসাতে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়। পালাবার চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। কিন্তু দায়িত্ব বলে কথা! দায়িত্ব পালনের নামে রনি অধ্যক্ষকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কিলঘুষি মারতে মারতে রুমে নিয়ে আসেন।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া বাড়তি ফি ফেরত দেবার দাবিতে এভাবেই অধ্যক্ষকে মারধর করে আহত করে রনি। এ নিয়ে পত্রিকায় তুলকালাম কান্ড। মিডিয়া হাইলাইট করে পুরো সংবাদ। কিন্তু রনি বেমালুম চেপে যান। শিক্ষক লাঞ্ছিত করার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তার গায়ে হাত তুলিনি। একজন শিক্ষকের সঙ্গে খারাপ আচরণের প্রশ্নই আসে না।’
কিন্তু রনি ফেঁসে যান প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশের কাছে। রুমে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে অধ্যক্ষকে কিলঘুষি মারার পরিস্কার ভিডিও। আফছা আফছা ভিডিও হলেও কথা ছিল। গাইগুই করে অস্বীকার করার চেষ্টা তিনি অবশ্যই করতেন। কিন্তু সেটাও সম্ভব নয় বিধায় অগত্যা মেনে নিতে বাধ্য হলেন। এবং খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করালেন এভাবে যে, উত্তেজনার বশে হাতটা একটু ব্যালান্সহারা হয়েছিল! তবে তেমন কিছু না। অনেকটা ফান বলতে পারেন!
অদ্ভুত কান্ড! এটা ফান? মানুষের মান নিয়ে ফান! অপকর্মকে ফান বলে চালিয়ে দেবার কী জঘন্য অপচেষ্টা! এই অপচেষ্টাটি সব জায়গাতেই হয়। ভোলার মনপুরা উপজেলায় স্কুল চলাকালীন স্কুলের লাইব্রেরিতে আটকে এক শিক্ষিকাকে ধর্ষণ করেছে জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এনাম আহমেদ। ঘটনা চাপা দেবার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পারেনি। প্রতিষ্ঠান প্রধানও স্বীকার করতে বাধ্য হন। উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের হারিছ-রোকেয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ সফিউদ্দিনের মতে ঘটনা সত্য। তিনি বলেন, স্কুলের সিঁড়ির রুম দখল করে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করে আসছিল এনাম। ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় আমরা তার ক্ষমতার সামনে জিম্মি।
সকাল ৯টার দিকে স্কুলের লাইব্রেরিতে এ ঘটনা ঘটে। অন্যান্য দিনের মত শিক্ষিকা স্কুলে প্রবেশ করে শিক্ষকদের বসার নির্ধারিত কক্ষ (লাইব্রেরি) খুলে বসেন। ওই সময় এনাম কক্ষে প্রবেশ করে হঠাৎ দরজা আটকে দেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। প্রথমাবস্থায় ডাক চিৎকার দিলে কেউ শুনতে পায়নি। এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তি করে বের হয়ে বাইরে এসে চিৎকার দিলে আশেপাশের লোকজন ছুটে আসে। ততক্ষণে এনাম ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
আত্মগোপনে থাকা এনাম মুঠো ফোনে নিজেকে রক্ষা করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। আর সবার মত তিনিও ধর্ষণ বিষয়টিকে ফান বলে উড়িয়ে দেন। এটাও নাকি ফান! একজন মেয়েকে জোরপূর্বক সর্বনাশ করে ফান বলে চালাবার চেষ্টা যে কতবড় অরুচির বিষয় তা ওরা একটিবারও ভাবার চেষ্টা করেনি। রুচিহীন এই সমাজে ইদানীং ধর্ষণ নিয়ে ফান ফান খেলা শুরু হয়েছে। ধর্ষণ কর্মটি আর ধর্ষণের পর্যায়ে নেই। ফানের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে।
ক’দিন আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে অভিনেতা মিশা সওদাগর ও চিত্রনায়িকা পূর্ণিমার ধর্ষণ সম্পর্কিত কথোপকথনের কথাই ধরুন। উপস্থাপিকা পূর্ণিমা তো মিটিমিটি হেসে হেসে সোফাসেটের এপাশওপাশে হেলেদুলে ধর্ষণ নিয়ে মিশাকে এমনভাবে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন যেন এর চেয়ে ফান করার মধুর কোন বিষয়ই আর থাকতে পারে না। মিশাও হেসে হেসেই উত্তর দিয়েছেন। যখন বাংলাদেশে নারী-পুরুষ সকলে দল-মত নির্বিশেষে নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তখন ধর্ষণ নিয়ে তাদের হাসাহাসি দেখে বুঝতে বাকী থাকে না, আমাদের রুচিবোধ কোন পর্যায়ে নেমেছে!
‘‘ধর্ষণ নিয়ে একজন নারী হয়ে চিত্রনায়িকা পূর্ণিমার এহেন প্রশ্নে সকল নারী সমাজ লজ্জিত। পুরুষও লজ্জিত। সস্তা কথায় অনুষ্ঠানের দর্শক বাড়ানো যায়, কিন্তু সেটি করতে গিয়ে যে পর্যায়ে নেমে গেলেন, তা কিন্তু উঠানো যাবে না। ধর্ষণ কোন হাসির বিষয় নয়; ধর্ষণ একজন নারীর হৃদয়ছেড়া আর্তনাদের নাম। যে নারী কারো কন্যা, মা বা বোন বা স্ত্রী। ধর্ষণ নিয়ে হাসি-তামাশা ‘একটি মানবিক সমস্যা’।’’
উপরের কথাগুলো আমার নয়; প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের। তিনি মন্ত্রী হিসেবে হিসেব করে কথা বলেননি। যা বলতে মন চেয়েছে, সোজাসাপটা বলে দিয়েছেন। চারিদিকে এসব বাড়াবাড়ি দেখে বলার তাগিদ অনুভব করেছেন তাই বলেছেন। চমৎকার সাবলীল ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। খুব সাধারণ ভাবে অসাধারণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি আমাদের সব মানুষের মনের কথা বলেছেন। সরকারের দায়িত্বশীলেরা যখন আমজনতার মনের কথা বলেন, তখন আমজনতা খুশী হয়।
আমরাও খুশী হয়েছি। কিছুদিন আগেও এই আমরা ধর্ষণ বিষয়টিকে দূর্ঘটনা হিসেবে দেখতাম। ছিঃ ছিঃ দিতাম। এখন দূর্ঘটনা হিসেবেও দেখি না, ছিঃ ছিঃও দেই না। বেশী বেশী দেখতে দেখতে এমন হয়েছে। সবকিছু কেমন যেন সয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। দিন যতই যাচ্ছে, ধর্ষণ বিষয়টি ততই প্রবল বর্ষণের গতি পাচ্ছে। একজনের দেখাদেখি অন্যজন উৎসাহিত হচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে।
তাই সামান্য দেরী না করে এখনই এর লাগাম টানা দরকার। দৃষ্টান্তমূলক কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। না হলে সর্বনাশ হবে। দিনে দিনে মাত্রা আরো বাড়বে, বাড়বে আক্রান্তদের সংখ্যা এবং রসাতলে যাবে সবকিছু। রসাতলে যাবে সমাজ এবং রাষ্ট্র। মনে রাখতে হবে, এসব অপকর্মে আতিপাতিরা যখন পারফর্ম করে আর অসহায়ের মত দেশবাসী চেয়ে চেয়ে কেবল দেখে, তখন স্বপ্নের এই দেশটির রসাতলে যাওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না।-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।