নির্বাচন সামনে রেখে সকল মহল তত্পর

7

যুগবার্তা ডেস্কঃ একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলই এখন সক্রিয়। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে নিজ নিজ রাজনৈতিক সমীকরণে গন্তব্যে পৌঁছাতে সবাই বহুমুখী তত্পরতা জোরদার করছেন। ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য- টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকারের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। আর তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ চাচ্ছে সরকারের পরিবর্তন ঘটাতে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের বাইরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দল ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করছে। এসব দল-জোটের ভেতরেও রয়েছে আবার স্ব-স্ব হিসাব-নিকাশ বা চিন্তা-ভাবনা। সবমিলিয়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক তত্পরতা ক্রমশ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আর সকল মহলের এসব বহুধা সক্রিয়তা-তত্পরতা উত্তপ্ত করে তুলতে পারে নির্বাচনকালীন সময়কে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা নানা বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে মূল যে বার্তাটি দিচ্ছেন তা হলো, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই নির্বাচন হবে। এই অবস্থানকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে বিষয়টির আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যায় তারা এ-ও বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে ভোট হয় বাংলাদেশেও সেভাবেই হবে; সেক্ষেত্রে কে নির্বাচনে আসলো কে আসলো না সেটি ধর্তব্য নয়; নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা-অগ্রহণযোগ্যতার মানদ্ল কারও অংশগ্রহণ করা না করার ওপর নির্ভরশীল নয়। এই অবস্থানে অটল থেকে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আনুসঙ্গিক সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা।

তবে সরকারপক্ষের এই অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে বিএনপিসহ তাদের রাজনৈতিক মিত্র-বলয়। সংবিধানের বাইরে গিয়ে সংসদ ভেঙ্গে এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে সচেষ্ট এই পক্ষ। তাদের দাবির মূল কথা হচ্ছে, নির্বাচনের প্রতিযোগিতা হতে হবে সমতল মাঠে। সমতল মাঠ তৈরীর দাবি আদায়ে বিএনপিসহ তাদের বন্ধুবলয়ও যাবতীয় প্রস্তুতির লক্ষ্যে নানামুখী তত্পরতায় গতি আনার চেষ্টা করছে। তবে বিএনপির সামনে সমতল মাঠে নির্বাচন আয়োজনের দাবি আদায়ের সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারা না পারা, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায় করতে পারা না পারা এবং দলের প্রধান নেতৃত্ব খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া- এই তিন চ্যালেঞ্জের জটিল সমীকরণে পড়া বিএনপির জন্য নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া এখন কঠিন এক অগ্নিপরীক্ষার সামিল। আবার বিএনপিকে বাইরে রেখে দশম সংসদের মতো একাদশেও সরকারকে নির্বাচন পার করে নিতে না দেওয়ার লক্ষ্যে এবার তত্পর বিএনপি নেতৃত্ব।

ক্ষমতাসীনদের ও বিএনপি জোটের এরকম বর্তমান অবস্থানের এবং সামনের দিনগুলোর গতিপ্রকৃতির দিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখছে ১৪ দল ও ২০ দলের বাইরের দলগুলো। তারা সামগ্রিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করছেন, ভাবছেন সবদিক। বিএনপি নির্বাচনে এলে অবস্থান কেমন হবে, না এলে অবস্থান কেমন হবে- এনিয়ে হিসাব নিকাশের পাশাপাশি সামগ্রিক রাজনীতির সম্ভাব্য পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে এই দলগুলো। পরিস্থিতি যেরকমই হোক, সেটির আলোকে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের গন্তব্য নির্ধারণে নিজ নিজ অবস্থানে তত্পর এসব দলও। যার কিছুটা ইঙ্গিত বহন করছে জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের গত তিনদিনের চতুর্মুখী বক্তব্য।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য দলের মোটা দাগে দৃশ্যমান অবস্থান ও রাজনৈতিক তত্পরতার পাশাপাশি রয়েছে অভ্যন্তরীণ নানা উপসর্গও। বিশেষ করে, দেশের প্রায় প্রতিটি সংসদীয় আসনেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী এখন মাঠে তত্পর। দল বা জোটের ‘টিকিট’ পেতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়েও তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী নিজ ঘরে। নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে বেশিরভাগ আসনে ইতোমধ্যেই বড় দলগুলোর ভেতরে নানা দল-উপদল গড়ে উঠেছে। ভোটের সময় ঘনিয়ে আসলে কিংবা মনোনয়নের পর্ব কাছে এলে অভ্যন্তরীণ এই প্রতিযোগিতা রক্তারক্তিতে রূপ নিতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন। যার কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার পাশাপাশি ঘরের বিবাদ সামাল দিতে পারাও সামনের দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য অন্যান্য দলেও দলীয় কিংবা জোটের মনোনয়ন পেতে রয়েছে গৃহবিবাদ। ভোটের সময় মনোনয়নপ্রাপ্তির ইস্যুও রাজনীতিকে উত্তপ্ত করতে পারে বলে প্রায় সব মহল থেকে পূর্বাভাস মিলছে।

এদিকে, ১৪ দল ও ২০ দলে বর্তমানে যারা শরিক রয়েছে- আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব শরিকরাও নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করছে। দশম সংসদ নির্বাচনের মতো সীমিত সংখ্যক আসন নিয়ে এবার সন্তুষ্ট নাও থাকতে পারে ১৪ দল শরিকরা। ১৪ দল শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও সাম্যবাদী দলসহ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ইতোমধ্যে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশেই বলেছেন, আগামীতে মর্যাদার ভিত্তিতে আসন ভাগাভাগি করতে হবে। যার যার অবস্থান অনুযায়ী সবাইকে মূল্যায়নের লক্ষ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই এর ফয়সালা করতে আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। যার কারণে বাইরে সদ্ভাব পরিলক্ষিত হলেও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর একাদশ নির্বাচনে প্রত্যাশিত আসনে ছাড় পাওয়া নিয়ে ১৪ দলের শরিকদের কারও কারও মাঝে অসন্তোষ কান পাতলেই টের পাওয়া যায়।

প্রায় অভিন্ন পরিস্থিতি বিএনপির ২০ দলের ভেতরেও। ২০ দল প্রধান খালেদা জিয়ার কারামুক্তির আন্দোলনের মধ্যেই জোটের কয়েকটি শরিক প্রকাশ্যেই একরকম আল্টিমেটাম দিয়ে বলেছে, আগামী নির্বাচনের আসন ভাগাভাগির ফয়সালা করতে হবে এখনই। নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি এখনও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না করলেও এখনই শরিকদের কারও কারও আসন বণ্টনের ফয়সালা দাবি নিয়ে বিএনপি জোটের ভেতরেও চাপা উত্তাপ বিরাজ করছে। দলে-জোটে এরকম নানা বিভক্তি ও উপদল এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে দল- জোটগুলোর অবস্থান সামনের রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াবে বলে আঁচ করছেন রাজনীতির ত্রিকালদর্শীরা।-ইত্তেফাক