ক্যান্সার চিকিৎসায় অসহায়ত্ব

4

যুগবার্তা ডেস্কঃ মেঘনার দুর্গম গৌরবদী চরের শাহে আলম ঘরামীও জেনে গেছেন ‘বায়োপসি’ কী। খুলনার লবণপানির মানুষ লীলাবতী অনায়াসেই বলে ফেলেন ‘এফএনএসি’! শাহে আলম বলেন, ‘দাঁতের পাশে এট্টুহানি মাংস বাড়ছিল, বরিশাল গিয়া অপারেশন করাইছি।

ডাক্তার অপারেশনের পর হেডুক (সেটুকু) মাংস শিশিতে ভইর্যা বায়াপসি করতে ঢাহায় পাডাইয়া দিচ্ছে। কইছে, ক্যান্সার আছে কি না দেকতে অইবো। এহন তো আমার জানে পানি নাই। যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে!’ লীলাবতী বলেন, ‘বুকের এক পাশে চাকা চাকা লাইগতেছিল, শহরের ডাক্তার কয়েছে ক্যান্সার থাইকতে পারে, সুই দিয়া এফএনএসি করতি অবে। মনে অতিছি, আমি আর বাঁইচপো না। ’ এভাবেই ক্যান্সার নামের আতঙ্ক দেশের প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ অনেক মানুষকেও পেয়ে বসেছে। চিকিৎসকরা কিছুতেই রোগীকে আতঙ্কিত করতে পারেন না, বিশেষজ্ঞরা এ কথা বললেও অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। পাশাপাশি দেশে নেই পর্যাপ্তসংখ্যক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, আছে ওষুধ নিয়ে হয়রানি।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ওবায়েদুল্লাহ বাকী বলেন, ক্যান্সারের বিষয়টি নিশ্চিত না হয়ে কাউকে ক্যান্সারের কথা বলা ঠিক নয়।

এতে ওই রোগী ও তাদের পরিবার মারাত্মক আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যায়। আর এ সময় তাদের মানসিক বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র নানা অজুহাতে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। রোগীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদেরও জানতে হবে যে পরীক্ষা মানেই ক্যান্সার নয়। আবার ক্যান্সার আছে কি না সেটা নিশ্চিত হতে হলে পরীক্ষা করাতেই হবে। এ ক্ষেত্রে ভয় নয়, প্রয়োজন সতর্কতা। কারণ শুরুতেই ক্যান্সার ধরা পড়লে উপযুক্ত চিকিৎসায় সেরে যায়। ’
ঢাকার ডেমরার আমিনুল ইসলামের হাঁটুর নিচে একটি ফোড়া হয়েছিল। ডাক্তারের পরামর্শে তিনি অপারেশন করান। শেষে ডাক্তার অপসারিত মাংসের নমুনা পাঠিয়ে দেন ক্যান্সারের পরীক্ষার জন্য। আমিনুল বলেন, ‘আমার তো ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল ক্যান্সারের টেস্টের কথা শুনে। ভাগ্যিস পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট এসেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ডাক্তাররা এমনভাবে ক্যান্সারের কথা বলছেন যে তাতে মানুষ আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ’

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় অগ্রগতি হওয়ার পাশাপাশি হয়রানি ও বিভ্রান্তিও বেড়েছে। আছে যন্ত্রপাতি ও জনবলের নানা সংকট। এ অবস্থার মধ্যেই দেশে এখন প্রায় ১২ লাখ ক্যান্সার রোগী জীবন-মৃত্যুর মাঝে বসবাস করছে। প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। ক্যান্সারে বছরে মারা যায় প্রায় দেড় লাখ রোগী। সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বছরে মাত্র ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়। আড়ালে থেকে যায় আরো প্রায় আড়াই লাখ রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী জনসংখ্যা অনুপাতে বাংলাদেশের সব ধরনের সুবিধাসহ ১৬০টি ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা জরুরি, আছে মাত্র ১৬টি।

অধ্যাপক ডা. ওবায়েদুল্লাহ বাকী জানান, দেশে এখন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রয়েছেন মাত্র ১১৫ জন। অনকোলজির নার্স নেই। সরকারিভাবে দেশে ক্যান্সার রোগী চিকিৎসার জন্য শয্যা আছে মাত্র ৫০০-এর মতো। কমপক্ষে ৩০০টি যন্ত্র অপরিহার্য হলেও রয়েছে মাত্র মাত্র ১৫টি, যার বেশির ভাগই অকেজো। এর মধ্যে আধুনিক লাইন্যাক মেশিন আছে মাত্র ছয়টি (চারটি ঢাকায় সরকারি ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এবং একটি করে বগুড়া ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে)। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ডেল্টা, স্কয়ার, ইউনাইটেডের মতো হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠানে অত্যাধুনিক কিছু যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে, যা দেশের রোগী অনুপাতে নগণ্য।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন বলেন, যে হারে ক্যান্সার রোগের প্রকোপ বাড়ছে তা সামাল দেওয়া অনেকটাই কঠিন। পুরনো যন্ত্রপাতির অনেকই এখন আর ঠিকভাবে কাজ করে না। তবে সম্প্রতি নতুন ২০টি যন্ত্রের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। রোগীদের হয়রানি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করা যায় না। ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে ক্যান্সারের চিকিৎসা হলে সেটা রোগীর জন্য ভয়ানক হবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমরা শুনে থাকি অনেক ল্যাব রিভিউ করার জন্য স্যাম্পল ছাড়তে চায় না। এটাও ঠিক নয়। ’-কালেরকন্ঠ