৫৫ সংসদীয় আসনে ৭০০ আপত্তি

12

মসিউর রহমান খানঃ সারাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের খসড়া পুনর্বিন্যাসের পর ব্যাপক আপত্তির মুখে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রশাসনিক অখণ্ডতা, ভৌগোলিক যোগাযোগ ও জনসংখ্যার ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করার কথা বললেও ইসি নিজেই তা মানেনি বলে অভিযোগ করা হয়েছে এসব আপত্তিতে। এবারের খসড়ায় ইসি ৩৮টি আসনে পরিবর্তনের কথা বললেও আপত্তি এসেছে ৫৫টির সীমানা নিয়ে।

এর মধ্যে ১০টি আসনে আপত্তির পাশাপাশি ইসির প্রস্তাবিত বিন্যাসের পক্ষেও অনেকে অবস্থান নিয়েছেন। ইসির নতুন সিদ্ধান্তে জনসংখ্যা বিবেচনায় ৬২টি আসন এখন ভারসাম্যহীন। প্রশাসনিক অখণ্ডতার দিক বিবেচনায় ৩৪টি উপজেলা এখনও খণ্ডিত। যদিও সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখন্ডতা এবং সর্বশেষ আদমশুমারি থেকে পাওয়া জনসংখ্যার বিভাজনকে যতদূর সম্ভব বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা আছে।

আইনে ভৌগোলিক যোগাযোগ বা আঞ্চলিক অখণ্ডতার কথা থাকলেও ইসির খসড়ায় এর ব্যত্যয় ঘটেছে। শরীয়তপুর-২ ও ৩ আসনে নতুন সীমানায় ভোটার সংখ্যার ব্যবধান বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নদী দিয়ে বিভাজিত একটি এলাকাকে অন্য একটি আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

৩৮টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনে গত ১৪ মার্চ ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানার খসড়া প্রকাশ করেছিল ইসি। তখন মন্ত্রী-এমপিদের পক্ষ থেকে ইসির এ সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। প্রকাশিত খসড়ার ওপর আপত্তি, সুপারিশ দেওয়ার জন্য ১ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল ইসি।

ইসির সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ে সাত শতাধিক আবেদন এসেছে। ইসি যে ৩৮টি আসনের সীমানায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে তার ৩৪টির বিষয়ে আপত্তি এসেছে। আর ইসি এবার পরিবর্তন করেনি এমন ২২টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন চাওয়া হয়েছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১ এপ্রিল দাবি-আপত্তির শেষ সময় হলেও গতকাল ৪ এপ্রিল পর্যন্ত তারা এ সংক্রান্ত শত শত আবেদন সংরক্ষণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। নিয়মানুযায়ী আপত্তিকারীদের সবাইকে শুনানির সময় দিতে হবে। যেসব আসনে ইসি পরিবর্তন করেনি, অথচ দাবি-আপত্তি এসেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই খণ্ডিত উপজেলা। এসব আবেদনে বলা হয়েছে, ৩৮টি আসনে খণ্ডিত উপজেলা একত্রিত করা হলেও বাকিগুলো কেন করা হয়নি। ইসি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, সব উপজেলা অখণ্ড করতে গেলে জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না। অথচ ইসির প্রকাশিত খসড়া তালিকা যাচাইয়ে দেখা গেছে, জনসংখ্যার চেয়ে প্রশাসনিক অখন্ডতা রক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে সংসদীয় আসনগুলোতে জনসংখ্যার ব্যবধান বাড়ছে। ২০০৮ সালে ৩৬টি আসনে এই ভারসাম্যহীনতা থাকলেও ২০১৩ সালের বিন্যাস ও এবারের খসড়া বিন্যাসে এই সংখ্যা ৬২টিতে গিয়ে পৌঁছেছে।

ইসির প্রস্তাবে পরিবর্তন করা না হলেও সিলেট-২ ও ৩ আসনের বিদ্যমান সীমানার বিরুদ্ধে সর্বাধিক ৯৪ ও ১৩২টি আপত্তি পড়েছে। বর্তমান অবস্থায় বিশ্বনাথ উপজেলার সঙ্গে বালাগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নকে বাইরে রেখে সিলেট-২ এবং দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে বালাগঞ্জের তিনটি ইউনিয়নকে (দেওয়ান বাজার, পূর্ব গৌরীপুর ও পশ্চিম গৌরীপুর) নিয়ে সিলেট-৩ আসন রয়েছে। এসব আবেদনে খণ্ডিত বালাগঞ্জকে একত্রিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, এই তিনটি আসনের বেশিরভাগ ভোটার নৌকা প্রতীকের সমর্থক। তাই সিলেট-২ আসনের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এ তিনটি ইউনিয়নকে তাদের সঙ্গে রাখতে আগ্রহী। আবার সিলেট-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ মাহমুদুস সামাদ কয়েস চৌধুরী ও তার সমর্থকরা এই তিন ইউনিয়নকে তাদের সঙ্গেই রাখতে চাইছেন। নদীর কারণে এই তিনটি ইউনিয়ন বালাগঞ্জের মূল উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন।

ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ আসনে ইসির প্রস্তাবের বিপক্ষে ২৮টি আবেদন জমা পড়েছে। একইভাবে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে ইসির প্রস্তাবের বিপক্ষে ২৮টি আবেদন জমা পড়েছে। পাবনা-২ আসনেও ইসির পরিবর্তনের বিপক্ষে ৩৯টি আবেদন জমা পড়েছে।

ইসির পরিবর্তন প্রস্তাবে আপত্তি এসেছে রংপুর-১ ও ৩, নীলফামারী-৩, কুড়িগ্রাম-৪, পাবনা-২, মাগুরা-১ ও ২, খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-৪, জামালপুর-৪, ঢাকা-২, ৩, ৭, ১৪ ও ১৯, নারায়ণগঞ্জ ৩, ৪ ও ৫, শরীয়তপুর ২ ও ৩, মৌলভীবাজার-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, কুমিল্লা- ১, ৬ ও ১০, নোয়াখালী ৪ ও ৫ এবং চট্টগ্রাম-৭ আসনে।

ইসির পরিবর্তনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে প্রস্তাব এসেছে পাবনা-১, কুড়িগ্রাম-৩ ও ৪, সাতক্ষীরা-৪, জামালপুর-৪ ও ৫, ঢাকা-৩ ও ১৯, শরীয়তপুর-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ও ৬ এবং কুমিল্লা-১, ২ ও ১০ আসনে।

ইসি পরিবর্তন না করলেও পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, সিরাজগঞ্জ-১ ও ২, যশোর-৪, নড়াইল-১ ও ২, সাতক্ষীরা-২, বরগুনা-১, পিরোজপুর-১, ২ ও ৩, মানিকগঞ্জ-১, ঢাকা-১, গাজীপুর ২ ও ৩, নারায়ণগঞ্জ-২, ফরিদপুর ২, ৩ ও ৪, সিলেট ২ ও ৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, নোয়াখালী-১, লক্ষ্মীপুর-২ এবং চট্টগ্রাম-১৪ নম্বর আসনে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সাংসদ গোলাম রেজা ও এ কে ফজলুল হক এবং সাতক্ষীরা-৩ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ আ ফ ম রুহুল হক এই দুটি আসনে ইসির প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছেন। তারা চান ২০১৪ সালের সীমানা অপরিবর্তিত থাকুক। কুমিল্লা-৬ আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দীন আপত্তি দিয়েছেন ইসির খসড়া প্রস্তাবে।

চট্টগ্রাম-১৪ আসনের শাহ আলম ও জালাল আহমদ ২০০৮ সালের সীমানায় ফিরে যাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। ইসির প্রকাশিত খসড়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের সাংসদ ড. হাছান মাহমুদ, ঢাকা-২ আসনের সাংসদ খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, মাগুরা-২ আসনের সাংসদ বীরেন শিকদার, মাগুরা-১ আসনের এ টি এম আবদুল ওয়াহাব এবং ঢাকা-১৪ নিয়ে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ সাবিনা আক্তার তুহিন।

কবে নাগাদ এসব দাবি-আপত্তির শুনানি শুরু হবে, জানতে চাইলে ইসির সীমানা পুনর্বিন্যাস কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, খসড়া প্রকাশের পর বিষয়টি ইসি সচিবালয় তদারক করছে। যেসব দাবি-আপত্তি এসেছে সেগুলো সমন্বয় করে তারা সময় নির্ধারণ করবেন। কমিশন সভার সম্মতি নিয়ে পর্যায়ক্রমে সবার বক্তব্য শোনা হবে।-সমকাল