সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতিতে দেশ

4

যুগবার্তা ডেস্কঃ দেশে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির তুলনায় আমদানি ব্যয় তিন গুণেরও বেশি। এতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ।

চলতি অর্থবছরের (জুলাই-জানুয়ারি) সাত মাসে বৈদেশিক লেনদেনে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। স্বাধীনতার পর এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে; ৯৯৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০১১-১২ অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৩২ কোটি ডলার।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আমদানি ব্যয় যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় রপ্তানি আয় না বাড়ায় বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন রেমিট্যান্সপ্রবাহে নেতিবাচক ও সেবা খাতের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে চলতি হিসাবের ভারসাম্য। তাঁদের মতে, আমদানির এ প্রভাব উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগে পড়লে অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে এই অর্থ যদি পাচার হয়ে থাকে তাহলে এর ফল অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।
বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে চাপের মুখে পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে অনেক খরচ হচ্ছে। আমদানি যেভাবে হয়েছে, সেই হারে রপ্তানি বাড়েনি। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশ সব সময় বাণিজ্য ঘাটতিতেই থাকে। তবে এখন তা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর মূল কারণ একদিকে রপ্তানি আয় বাড়ছে না। অন্যদিকে দীর্ঘদিন রেমিট্যান্সপ্রবাহে নেতিবাচক ছিল। সম্প্রতি রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়লেও যে হারে কমেছে সেই হারে বাড়েনি। ’

অর্থনীতি বিশ্লেষকের মতে, বাণিজ্য ঘাটতির এই নেতিবাচক ধারা অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে। কারণ এটি অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের (রিজার্ভ) ওপর প্রভাব পড়বে; মদ্রাবিনিময় হার বেড়ে যাবে। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন বাড়বে। সর্বোপরি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জানুয়ারি শেষে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে দুই হাজার ১০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ১১৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির দাঁড়ায় এক হাজার ১২ কোটি ৩০ ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি ডলার ৮২ টাকা হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আলোচিত সময়ে আমদানি বেড়েছে ২৫.২০ শতাংশ হারে। অন্যদিকে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৭.৩১ শতাংশ। ফলে চলতি হিসাবে ঘাটতি বড় হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। কিন্তু গত কয়েক বছর চলতি হিসাবের ভারসাম্যের উদ্বৃত্ত থাকলেও গত অর্থবছরে এটা ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। জানুয়ারি শেষেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরজুড়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। এতে বৈদেশিক দায় পরিশোধে সরকারকে বেগ পেতে হয়নি; কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১৪৮ কোটি ডলার ঋণাত্মক হয়, যা এখনো অব্যাহত রযেছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের জানুয়ারি শেষে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৫৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঘাটতি হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা এর আগের অর্থবছরে একই সময়ে ঘাটতি ছিল ৮৯ কোটি ডলার।

আলোচ্য সময়ে সেবা খাতে বিদেশিদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে ৫০৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর বাংলাদেশ এ খাতে আয় করেছে মাত্র ২৪৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসাবে সাত মাসে সেবা খাতে বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে, যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

দেশে বিদেশি বিনিয়োগও কিছুটা ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দেশে এসেছে মোট ১১০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১১৩ কোটি ডলার। তবে আলোচিত সময়ে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ হয়েছে ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২১ কোটি ১০ লাখ ডলার।-কালেরকন্ঠ