এবার চিকুনগুনিয়া না ডেঙ্গু?

12

গওহার নঈম ওয়ারাঃ মশার কারণে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজ উড়াল দিতে অস্বীকার করার খবর প্রথমে একটি রং চড়ানো খবর বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ১৯ মার্চ

ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে বাসে উঠতে গিয়ে টের পেলাম মশারাজ পুরোপুরি কায়েম হয়েছে বন্দরে। দূরে-কাছে ধোঁয়া দেওয়ার মেশিন যত গর্জাচ্ছে, বাসের ভেতর ততই হুড়হুড় করে মশা ঢুকছে। যাত্রীদের নাকে-কানে-মুখে, যেখানে ফাঁক পাচ্ছে, সেখানে ঢুকে যাচ্ছে।

কালবৈশাখী জোরেশোরে শুরু না হওয়া পর্যন্ত খোলা জায়গার মশা কমার সম্ভাবনা কম। কালবৈশাখীর সঙ্গে বৃষ্টি হলে আবার অন্য সমস্যা—পাত্রে-অপাত্রে জমে থাকা বৃষ্টির স্বচ্ছ পানিতে এডিস প্রজাতির দিনে কামড়ানো আকারে ছোট ভয়ংকর মশা বংশবিস্তারে মেতে উঠবে।

বাংলাদেশের লাগোয়া ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই এডিস মশা ডানা মেলতে শুরু করেছে। ডেঙ্গুর আলামতে জেরবার হচ্ছে কতিপয় জেলা। দক্ষিণ ঢাকার মেয়র আর উত্তর ঢাকার মেয়র পরিষদ মশার খোঁজখবরে ব্যতিব্যস্ত আছেন—সংবাদমাধ্যমে সে রকমের ছবি আর খবর এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ মশার তত্ত্ব তালাশের জন্য এপ্রিল মাসে এক অনুসন্ধান জরিপের কাজ হাতে নেবে। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে মশার প্রজননকেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর নামই বোধ হয় মশা মারতে কামান দাগা। বিমানবন্দর এলাকায় এক-দেড় বছর ধরে নিষ্কাশন বা ড্রেনেজব্যবস্থা উন্নয়নের নামে যেসব খানাখন্দ তৈরি হয়েছে, সেগুলোই মূলত মশা উৎপাদনকেন্দ্রের কাজ করছে। তবু সাবধানের মার নেই, বিশেষজ্ঞরাই বলুন কী করতে হবে, কীভাবে মশা দমন করতে হবে। বেকারের দেশে কিছু কাজ সৃষ্টি হোক।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন চটজলদি মশা মারার কর্মসূচি বা ক্রাশ কর্মসূচি নিয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। সেই কর্মসূচিতে ডিজিটাল প্রলেপ দেওয়ার জন্য হটলাইন বা গরমাগরম যোগাযোগব্যবস্থার কথা ঘোষণা করা হয়। একটা মোবাইল নম্বর দিয়ে বলা হয়, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা অবধি এ নম্বরে যে কেউ অভিযোগ জানালে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুরন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তুরাগপারের মানুষেরা তুরন্তব্যবস্থার প্রতি এখন আর আস্থা রাখতে পারছেন না। ২৪ ঘণ্টা দূরে থাক; ৬, ৭, ৮ দিনেও তুরন্তব্যবস্থার কোনো আলামত দেখছেন না উত্তরা, মোহাম্মদপুর বা গুলশানের বাসিন্দারা। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় হতাশ বাসিন্দাদের কথা হরদম ছাপা হচ্ছে।

বলে রাখা ভালো, এ বছরের এটাই প্রথম ক্রাশ প্রোগ্রাম। গত বছরের জুলাই মাসে চিকুনগুনিয়ার গুনগুনানি শুরু হওয়ার পর পরবর্তী পাঁচ মাসে চারটি ক্রাশ প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষটি ছিল ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে ৪ জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত। ফলাফল—যাহা বায়ান্ন তাহাই তিপান্ন; মশার উত্পাত তাতে তেমন কমেনি। তাই আবার নতুন করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম নিতে হয়েছে। এর পরপরই নেওয়া হয় মশা নিধনের জন্য বিশেষ সেবা ‘সপ্তাহ’ (২০ মার্চ-২৬ মার্চ)। এত কিছুর পরেও মশার সাম্রাজ্য বিস্তার বন্ধ করা যায়নি। যাচ্ছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র গত বছর করপোরেশনের নালা-নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছাড়ার এক পরিবেশসম্মত উপায় চর্চার কথা বলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেও সে সময় মশারা মোটেও ভয় পায়নি। কারণ, তারা জানত ঢাকার নালা-নর্দমা, খাল-বিল, লেক-নদীর পানি এতটাই নষ্ট যে
সেখানে মশা-মাছি ছাড়া আর কোনো প্রাণীর জীবন ধারণ সম্ভব নয়—গাপ্পি, টাকি, ল্যাটা কোন ছার! মাছের প্রজেক্টের কথা এখন আর শোনা যায় না। অডিটরদের ঘাড়ে মাথা থাকলে তাঁরা হয়তো বলতে পারতেন, সেই খাতে কত গেছে।

এবার ঢাকা দক্ষিণ অন্য কথা বলেছেন: কারও ঘরবাড়িতে যদি মশার খামার দেখা যায়, তাহলে তাঁকে জেল-জরিমানার কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। মেয়র মনে হয় মনে করছেন মারের ওপর ওষুধ নেই। জেল-জরিমানা ছাড়া পুরবাসীকে সোজা করা যাবে না। দেখা যাক কতজন ছাদ, চৌবাচ্চা, ফুলের টব আর ফুলদানির মালিকের শাস্তি হয়। ভাঙা হাঁড়ি আর ডাবের খোসায় জমে থাকা পানির চিহ্ন ধরে বস্তিতে দাঙ্গা বাধানো যত সহজ, এসির পানি জমা পাত্রের মালিককে আইনের কাঠামোতে আনা ততই কঠিন।

এটা ঠিক আগের সব গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য মশা যেখানেই থাকুক, চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু বা জিকার জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রথম পছন্দ পরিষ্কার পানি। এঁদো পুকুর-নালায় সে থাকে না। তাই বৃষ্টি বা সেচের জমে থাকা পানিতে তার বিচরণ। তাই করপোরেশনের সঙ্গে সঙ্গে নগরবাসীরও একটা দায়িত্ব আছে। নিজেদের ছাদ, আঙিনা, ব্যালকনিতে পানি জমতে না দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদেরই। বহুতল বাড়ির এজমালি ছাদে অনেকেই তাঁদের ভাঙাচোরা টব বা পুরোনো বেসিন, কমোড রেখে দেন। ছাদ ছাড়াও নিচতলার গাড়ি গহ্বরের কোনাকাঞ্চিতে এগুলো রেখে দেন অনেকেই। কেউ ভুলে যান, কেউ ফেলে যান নতুন বাসা বা ফ্ল্যাটে যাওয়ার সময়। ফ্ল্যাট কমিটিগুলোকে এদিকে নজর দিতে হবে। কোনো টবে, ফলের খোসায়, ভাঙা বালতি বা ক্যানে পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। গণমাধ্যমগুলোকে এখনই এদিকে নজর দিতে হবে। একবার এডিসের উপহার দেওয়া শুরু হলে, তখন আর চিল্লাচিল্লি করে কোনো কাজ হবে না।

নতুন তথ্য বলছে, এডিস মশা গত কয়েক বছরের চর্চায় এখন পুকুর-ডোবাতেও দিব্যি বংশবিস্তার লাভ করছে। কলকাতার দক্ষিণ দমদমের ১০, ১১, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন পুকুর আর জলাশয়ে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ থেকে কলকাতা বেশি দূর নয়। রাজনৈতিকভাবে না হলেও ভৌগোলিকভাবে আমরা একই ভূখণ্ডের। আমাদের শুধু ডাবের খোসায় জমা পানির দিকে চোখ রাখলে চলবে না। করপোরেশনগুলোকে তাদের অধীনের পুকুর-ডোবাগুলো নজরদারিতে রাখতে হবে। গণমাধ্যমের নানা সূত্র এবং কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। বর্ষা মৌসুম এলে এদের বিস্তার ঘটবে অবলীলায়।

গত বছরের মাঝামাঝি সময় এভাবেই চিকুনগুনিয়া ভুগিয়েছিল প্রথমে রাজধানীর মানুষকে; তারপর ঈদের ছুটিতে মানুষ গ্রামেগঞ্জে ছুটলে চিকুনগুনিয়া ক্রমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তার আগের বছর এডিস উপহার দিয়েছিল ডেঙ্গু। গত বছর সীমিত আকারে হলেও জিকা ভাইরাসের ভীতি মানুষের মনে উঁকি দিয়েছিল। পৌর কর্তৃপক্ষগুলো প্রথমে এসবের গুরুত্ব বুঝতে সক্ষম হয়নি। যে জ্বরে মানুষ মরে না, সে আবার কেমন জ্বর! কিন্তু ভুক্তভোগীরা, বিশেষ করে প্রবীণেরা জানেন সে জ্বর কেমন ছিল। এখনো অনেকের ভোগান্তির শেষ হয়নি। এবার সে পরিস্থিতি এড়ানোর সময় শেষ হয়নি। সময় গেলে সাধন হবে কি?-লেখকঃ ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-প্রথমআলো