স্নায়ুযুদ্ধের পর বিশ্ব এখন সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ

4

যুগবার্তা ডেস্কঃ বর্তমান বিশ্বে সহিংস পরিস্থিতির অবস্থা নব্বইয়ের দশকের স্নায়ু যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না হলে বিশ্বে দরিদ্র্য মানুষের সংখ্যা বাড়বে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গেল ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালে। এসময় যুদ্ধের কারণে মৃত্যুর হার এগারো বছরের ব্যবধানে দশগুণ বেড়েছে। স্নায়ু যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালের পর ২০১৬ সালে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বে মৃত্যুর হার দশগুণ বেড়েছে। শুধু তাই নয়, এ সময়কালে সন্ত্রাসী আক্রমণ এবং এর ফলে মৃত্যুর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যুদ্ধ ও সহিংসতার ফলে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গড়ে ১৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই অর্থের পরিমাণ বিশ্বের জিডিপির (মোট দেশজ উত্পাদন) আকারের ১৩ দশমিক ৩ ভাগ। মাথাপিছু দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৭৬ ডলার।

‘শান্তির পথ: সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ সম্মিলিতভাবে সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। সংঘাতপূর্ণ বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য এবং বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু ২০১৭ সালে ৩৭টি দেশে ১৪ কোটি ১১ লাখ মানুষকে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা দিতে হয়েছে। বৈষম্য, বঞ্চনা আর সুবিচারের অভাবে বিশ্বে সংঘাত বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বড় অংশজুড়ে রয়েছে, সিরিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির অবস্থা নিয়ে। এ ছাড়া, বিশ্বের অন্যান্য দেশেরও অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। সেইসাথে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের ফলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থাও তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাদের কিভাবে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে তার বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গাদের বাস্ত্যুচ্যুত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সাধারণ মানুষ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সহায়তা করছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে উগ্রবাদ প্রতিরোধে সরকার, সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজের ভূমিকাও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ও সংঘাতের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি ছাড়াও এর ব্যাপকতা বোঝাতে বিভিন্ন উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। যেমন- ৭০ এর দশকে সোমালিয়ায় সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির ফলে তাদের মাথাপিছু আয় ৪০ ভাগ কমেছিল। সহিংসতার ফলে ইয়েমেন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়ার লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগেছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে মানব পাচার, অর্থপাচারসহ নানা অপকর্ম বৃদ্ধি পায় যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ ও সহিংসতা প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বাড়ানো গেলে বিশ্ব যে উপকার পাবে তার আর্থিক পরিমাণ বছরে ৭০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এই অর্থ বিশ্বের দরিদ্র্য বিমোচনে ব্যবহার করা সম্ভব হবে সেই সাথে মানব কল্যাণ বাড়বে।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এক দিনের হিসাবে জনপ্রতি ৫ ডলার ব্যয় হচ্ছে যুদ্ধ ও সংঘাতে। অন্যদিকে বিশ্বের দশ ভাগের বেশি মানুষ প্রতিদিন মাত্র ২ ডলারের নিচে আয় করছে।

আশংকা করা হচ্ছে, বিশ্বে সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে দরিদ্র্য হার বাড়বে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেটি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বকে দারিদ্র্য মুক্ত করার যে লক্ষ্য সেটি বাধাগ্রস্ত হবে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিশ্বের মোট দরিদ্র্য মানুষের অর্ধেকের আবাস হবে এসব সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে। শুধু সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতিই নয়, তথ্য প্রযুক্তি, যোগযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, সাধারণ মানুষের স্থানান্তর এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অনুযায়ী দারিদ্র্য নির্মূল প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে তথ্যের বিনিময়, কূটনীতি, মধ্যস্থতা এবং সংঘাতের বিরদ্ধে নেওয়া নানা পদক্ষেপ দেশগুলোতে সংঘাত কমিয়ে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেশগুলোর উন্নয়ন নীতি কাঠামোর উন্নতি করে সংঘাতের ঝুঁঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে আরো জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, নারী ও তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।-ইত্তেফাক