ভাল থেকো আবিদ! ভাল থেকো পৃথুলা!!

22

ইঞ্জিঃ সরদার মো: শাহীনঃ ১৪ বছরের ফুটফুটে কিশোর; বাবামায়ের একমাত্র সন্তান! আদরের ছেলে, সোহাগের ধন। চেহারায় বড় সুন্দর এবং মায়াবী গড়ন। বাবা-মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিতে খুবই প্রাণোচ্ছল এবং ভারী মিষ্টি লাগছে দেখতে। ছবিটা কবে তোলা হয়েছিল জানি না। তবে এটা নিশ্চিত জানি, তখন কেউই জানতো না, এই ছবিটি অচিরেই জাতীয় সংবাদের পাতায় জায়গা পাবে; শিরোনাম হবে। হবে সারা দেশের মানুষের কষ্টের কারণ।
বলছিলাম তানজিব বিন সুলতান মাহির কথা। আমার শোনিমের মতই। বয়সে বড়জোর এক বছরের বড় হবে। নেপালে প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান পাইলট আবিদ সুলতানের একমাত্র সন্তান মাহি। স্বাচ্ছল্যে ভরা সুখের সংসার ওদের। আমার বাসার খুব কাছাকাছিই ওরা থাকতো। আমি জনতাম না। ঢাকার শহরে জানার উপায়ও নেই। একই বিল্ডিং এ থাকলেও জানা যায় না। আমরা জানার চেষ্টাও করিনা। সবাই আমরা কেমন যেন পাথরের মত হয়ে গেছি। মায়া, ভালবাসা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিকতা সবই শহর থেকে উঠে গেছে। দিনদিন আমরা উন্নত হচ্ছি বটে। তবে পশুত্ব ভর করছে আমাদের মন এবং মানসিকতায়। প্রকৃত মানুষের সংখা দিনেদিনে কমে যাচ্ছে। অবস্থা এমন যে, আমরা কোরবানীতে বিরাট পশুর হাট বসাতে পারি। পশু আছে বলেই পারি। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে চাইলেও প্রকৃত মানুষের হাট বসাতে পারবো না।
আমরা অনেক কিছুই পারিনা! ক্যাপ্টেন আবিদের এমন করুণ মৃত্যুও মেনে নিতে পারেননি স্ত্রী আফসানা খানম। স্বামীকে হারিয়ে কখনও বাকরুদ্ধ, কখনও অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। তার স্বামী মারা যাননি, সবাই মিথ্যা কথা বলছে, আবিদ ফিরে আসবে, আবিদ তাকে সঙ্গে না নিয়ে একা চলে যেতে পারে না-এমন প্রলাপ বকতে লাগলেন। অবশেষে স্বামীর শোকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হলেন। এরপর থেকে তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটে।
অবস্থা হয় সংকটাপূর্ণ। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আফসানাকে। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বিঘ্ন ঘটায় করা হয় অস্ত্রোপচার। কিন্তু পরে আবার স্ট্রোক করে। করতে হয় আরেকটি অপারেশন। অপারেশনে সারাক্ষনের জন্য খুলে রাখতে হয় মাথার খুলি। এটি তখনই করা হয় যখন কারো মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ যায়। প্রাণপ্রিয় স্বামীকে হারানোর বিষয়টি তিনি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাই প্রলাপ বকেছেন; প্রচন্ড মানসিক চাপে পড়েছেন।
মায়ের মতই মানসিক চাপে থেকেই অশ্রুসজল একমাত্র সন্তান মাহি যখন বাবার লাশ গ্রহণ করছে বাসায়, তখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন মা আফসানা। শেষ পর্যন্ত পারেননি! শেষ রক্ষা হয়নি! সহমরণেই গেছেন! আর পুরোপুরি এতিম করে গেছেন আদরের একমাত্র সন্তানকে। যে সময়ে বাবা-মাকে সবচেয়ে বেশী পাশে দরকার, ঠিক তখনই বাবা-মাকে একসাথে হারিয়ে এতিম হয়ে গেল ১৪ বছরের ছোট্ট মাহি!
এতো গেল কেবল মাহির আম্মুর গল্প! গল্পের যেন শেষ নেই! ক্যাপ্টেন আবিদের সহকারী পাইলট পৃথুলা। তিনিও আত্মত্যাগের মহিমাময় গল্প সৃষ্টি করে গেছেন। মৃত্যুর আগে নিজের জীবনের বিনিময়ে তিনি বাঁচিয়ে গেছেন দশ জন নেপালী যাত্রীকে। আমাদের মতো স্বার্থপর হলে তিনি নিজের জীবন বাঁচানো নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আদতে তো তা-ই করার কথা। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করাটাই স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু সমাজে কিছু মানুষ থাকেন, মনুষ্যত্বের বিপুল বোধে উজ্জীবিত হয়ে নিজেকে উজ্জ্বল করেন; সেই সাথে তাঁর বিচরণের পথটিকেও আলোয় ভরে তোলেন।
আলোয় ভরা পৃথুলা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বিমানের প্রথম নারী পাইলট। সব থেকে প্রিয়, সব থেকে মূল্যবান অমূল্য জীবনকে উৎসর্গ করেছেন যাত্রীদের জন্য। এভাবেই মৃত্যুকে বরণ করে পৃথুলা যেন বাংলাদেশকে আবারও গর্বিত করেছেন। এ কারণে নেপালের গণমাধ্যম পৃথুলাকে আখ্যায়িত করেছে ‘ডটার অব বাংলাদেশ’ নামে। তিনি আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব।
গর্ব সবারই থাকে। নেপালের গর্ব হিমালয়। ২০০৬ এ একবার হিমালয় দেখতে গিয়েছিলাম। হিমালয়ের সর্ব্বোচ চূড়া এভারেষ্ট নিজ চর্মচোখে দেখার স্বাদ মিটাতেই গিয়েছিলাম। সারাবিশ্ব থেকে ফিবছর হাজার হাজার পর্যটক যায়। দুই বছরের শোনিমকে নিয়ে আমরাও গিয়েছিলাম। মাউন্টেন ফ্লাইটে করে কাঠমুন্ডু এয়ারপোর্ট থেকে একঘন্টার ভ্রমণে গিয়েছিলাম এভারেস্টকে খুব কাছে থেকে দেখতে। মাত্র দশ মিনিটে মেঘের রাজ্য পেরিয়ে এভারেষ্টের খুব কাছে পৌঁছে যাই। ছোট্ট বিমানখানি এভারেষ্টের চারিদিক ঘুরে ঘুরে আমাদেরকে প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে খুবই কাছ থেকে দেখিয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া। মেঘেরও অনেক উপরে মাথা উঁচু করে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে এভারেষ্ট। ভীষণ মনোমুগ্ধকর সেসব দৃশ্য রেখে ফিরে আসতে কষ্ট হচ্ছিল কাঠমুন্ডু এয়ারপোর্টে।
শুধু সেবার নয়, ট্রানজিট যাত্রী হিসেবেও এই কাঠমুন্ডু এয়ারপোর্টে অনেকবার গেছি। ঢাকা থেকে একঘন্টার জার্নি। আবার এয়ারপোর্টে একঘন্টা অপেক্ষা করে একই বিমানে অন্য দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা। খুবই বোর লাগতো। তবুও উপায় থাকতো না। বেশী খারাপ লাগতো এয়ারপোর্টের অব্যবস্থাপনা। ল্যান্ডিং এ সব সময় বাড়তি সময় নিত। সারা এয়ারপোর্টে প্লেন নেই দু’টো, অথচ ট্রাফিক জ্যাম। চারিদিকে পাহাড় ঘেরা পৃথিবীর অন্যতম বাজে এয়ারপোর্টের একটি। খুবই বিপদজনক। পাইলটরা সব সময় জান হাতে নিয়ে ল্যান্ডিং প্রিপারেশন নেয়। এ পর্যন্ত ৭২ টি দূর্ঘটনা ঘটার রেকর্ডও আছে এই এয়ারপোর্টের।
তারপরও এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ কোন তদন্ত ছাড়াই দলবেঁধে সেদিনের দূর্ঘটনার দোষ দিল আমাদের পাইলটদের। দোষ দিল পৃথুলা আর আবিদের। নেট দুনিয়ায় কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে পাইলটদের কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পরেও ওরা ব্যর্থ চেষ্টা অব্যহত রাখলো। কাজটা দলবেঁধেই করলো। নির্লজ্জের মত করলো। ক্ষতিগ্রস্ত হলাম আমরা, কোটি কোটি টাকার প্লেন ধ্বংস হলো আমাদের; নিহত হলো আমাদেরই লোকজন! অথচ এসবে দুঃখ প্রকাশ নেই ওদের; সহমর্মিতা নেই। ছিল শুধু আমাদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর ব্যর্থ চেষ্টা।
শুধু নেপাল কেন? আশেপাশের সব দেশের মানসিকতাই একই রকম। আমরা সার্ক পরিবারভুক্ত দেশ। এরপরেও সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে বন্ধুসুলভ আচরন পাই না। ন্যাককারজনকভাবে ওরা দল বাঁধে। ইস্যু একটা পেলেই দল বাঁধে। মুখে যা আসে তাই বলে। যেন বাংলাদেশর বিরূদ্ধে যা কিছু মনে আসে বলে ফেলা একদম সোজা। বাছবিচারের দরকার নেই; মনে আসলো তাই বলে ফেললাম। কী রাজনীতি বা অর্থনীতি, কী বিনোদন বা খেলাধূলা; সবখানেই একই দৃশ্য।
সাকিব আল হাসান ক্রিকেট মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুটা আবেগী অভিমান করে ব্যাটসম্যানদের বাইরে চলে আসতে বললে গাভাস্কারের গায়ে লাগে। তিনি বিবৃতি দিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন; সাকিবকে জ্ঞান দেন, প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেন। কেবল ভুলে যান, উনি নিজেই হুবহু একই কাজ করেছিলেন তার খেলোয়ারী জীবনে। বাংলাদেশী সাকিব রাগ দেখালে তার গায়ে লাগে। শ্রীলঙ্কান আম্পায়ার নো বলের সিদ্ধান্ত দিতে ভুল করলে তার চোখে লাগে না।
তারা অন্ধ সাজেন। অন্ধের মত ইদানীং যে কোন বিষয়ে দল বাঁধেন। বাংলাদেশের বিষয়ে সবাই যেন একাট্টা। কী অপরাধ আমাদের? আমরা বাংলাদেশ নামক ছোট্ট একটি দেশের মানুষ এটাই আমাদের অপরাধ? আমরা ভাল খেলতে পারি, সকল প্রতিকুলতা কাটিয়ে দেশের উন্নতি করতে পারি, নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বানাতে পারি; এটাই দোষের? নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় ঢুকে পড়েছি, এটাই ঈর্ষার্ণিত হবার মূল কারণ?
হয়ত তাই! হয়ত তাই ওদেরই ভুলে ওদের এয়ারপোর্টের মাটিতে আমাদের প্লেনের ধ্বংসস্তুপ দাউদাউ করে জ্বলতে দেখে একটু মায়াও লাগে না। বাংলার সোনার সন্তানদের পুড়তে দেখে একটু দয়াও হয় না। কী নিষ্ঠুর আচরণ ওদের! এই নিষ্ঠুরতায় পৃথুলা-আবিদদের বিদেহী আত্মা নিশ্চয়ই কাঁদে। অসহায়ের মত এসব মানতে কষ্ট হয়, দেখতে কষ্ট হয় আমাদের। খুব কষ্ট! আর বুকফাটা সেই চাপা কষ্ট নিয়ে মুখ ফুটে বলতে ইচ্ছে হয়, কেঁদোনা তোমরা! দুঃখ পেওনা! তোমাদের ত্যাগের মহিমায় বাংলা আজ উজ্জীবিত। ত্যাগের এই শিক্ষা নিয়েই দেশকে নিয়ে এগিয়ে যাবো আমরা সামনের দিকে। আরো অনেক সামনে। দেশকে করবো গর্বিত। নিন্দুকের তথাকথিত গর্বকে খর্ব করে অচিরেই বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো উন্নত এক জাতি হিসেবে! ভাল থেকো আবিদ! ভাল থেকো পৃথুলা!! -লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।