জিয়াকে বললাম, চট্টগ্রামে যুদ্ধ চলছে আর আপনি পালিয়ে এলেন?

33

কামাল হোসেন চৌধুরীঃ ২৫ মার্চ রাতেই চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জামালউদ্দিন ফোনে জানালেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, তোমরা প্রস্তুতি নাও। ’ আমরা চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করি, তিনিও স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলেন।

এর পরই কক্সবাজারের ওয়্যারলেসের দায়িত্বে থাকা বাঙালি ইপিআর জোনাব আলীর মাধমে মেজর রফিকুল ইসলামের সিগন্যাল পাই, তিনিও খবর দেন—বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এ খবর পাওয়ার পর আমরা কক্সবাজার ওয়্যারলেস ঘেরাও করি এবং ১২ জন পাঞ্জাবি ইপিআরকে আটক করে জেলখানায় পাঠাই। ২৬ মার্চ সকালে আমি নিজে মাইকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা প্রচার করি এবং জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানাই।

এরই মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আফসার কামাল চৌধুরী, এমএনএ নুর আহমেদ, অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম, এমএনএ ওসমান সরোয়ার, নজরুল ইসলাম চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মওদুদ আহমদ ও আমাকে নিয়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে। আমার নেতৃত্বে গঠিত হয় জয় বাংলা বাহিনী। জয় বাংলা বাহিনী গঠনে আরো ছিলেন মোজাম্মেল হক, জহিরুল ইসলাম, মজিবুর রহমান, রাজা শাহ আলী প্রমুখ।

২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার থেকে আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পড়েন। আমি ঘোষণা নিজে শুনি। পরদিন ২৭ মার্চ জানতে পারি, মেজর জিয়া নামের একজনও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পড়েছেন।

২৮ মার্চ সকালের দিকের কথা। কক্সবাজার জেলার উত্তর সীমান্তে হারবাংয়ের আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মাদ আলীর কাছ থেকে খবর পাই, তাঁদের ব্যারিকেড ভেঙে বেশ কয়েক গাড়ি সন্দেহভাজন অস্ত্রধারী কক্সবাজারের দিকে এগোচ্ছে। আমি বাহিনীর লোকজন নিয়ে সেদিকে যাই। এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ জড়ো হয়ে অস্ত্রধারীদের ঘেরাও করে রাখে। তারা অস্ত্র উঁচিয়ে সারেন্ডার করে। তারা রামুর একটি রাবার বাগানে অশ্রয় নেয়। আমি সেখানে পৌঁছানোর পর একজন এসে পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি মেজর জিয়া। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কারণে নামটা তখন পরিচিত ছিল। জিয়াউর রহমানের গায়ে একটি সাদা গেঞ্জি।

জিয়াউর রহমানকে বেশ কড়া ভাষায় বললাম, আপনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা রেডিওতে পড়েছেন, আপনি আমাদের লোক। আপনি এভাবে এখানে পালিয়ে এসেছেন কেন? চট্টগ্রামে তো এখনো যুদ্ধ চলছে। মেজর রফিক আমাদের কাছে খবর পাঠিয়েছেন কক্সবাজারের ইপিআরদের চট্টগ্রাম যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। অথচ আপনি এখানে? জিয়াউর রহমানকে বললাম, পথে পথে জনতার প্রতিরোধ আছে, আপনারা বিপদে পড়তে পারেন। বরং আপনি রামু সদরে যান, সেখানে আমাদের এমএনএ ওসমান সরোয়ার আছেন, তাঁর কাছে গিয়ে পরিচয় দিন। জিয়া আমার কাছে গাড়ির তেল চাইলেন, বললেন, ‘রেকি করতে যাব। ’ আমি তেলের ব্যবস্থা করলাম। পরে ওসমান সরোয়ার জিয়াউর রহমানকে কক্সবাজার সংগ্রাম পরিষদের অফিসে নিয়ে আসেন।

আমি তখন জয় বাংলা বাহিনীসহ ছাত্রদের নিয়ে মেজর রফিকের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিতে গাড়ি জোগাড় করতে শুরু করেছি। তবে এর মধ্যে কক্সবাজারে পাকিস্তানি সেনা চলে এলে আমরা আর টিকতে পারলাম না।

আমার সঙ্গে থাকা বাহিনীর লোকজন নিয়ে বান্দরবানের ঘুনধুম এলাকা দিয়ে বার্মার (মিয়ানমার) টংবা এলাকায় প্রবেশ করি। প্রবেশের পরই বার্মার সীমান্তরক্ষীদের হাতে আমরা সবাই বন্দি হলাম। ওরা অস্ত্রগুলো কেড়ে নিল। আটকে রাখল একটি পাহাড়ে। থাকার জন্য পাহাড়ের গাছ কেটে খুপরি ঘর তৈরি করে নিলাম। মাঝেমধ্যে ওরা কিছু চাল-ডাল দিত। প্রচণ্ড খাদ্যাভাব শুরু হলো। এ সময়ে সীমান্তের এপার থেকে পরিচিতজনদের কাছ থেকে কিছু চাল ও তরকারি চেয়ে নিতাম। আমাদের বাইরে যাওয়া বারণ ছিল। একদিন আমি পালিয়ে বার্মার নাকফোড়া বলিবাজার হয়ে স্টিমারে মংডুতে যাই। সেখানে ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন মেজর হারুনসহ আমাদের কক্সবাজারের আরো নেতারা।

বার্মায় বন্দি থাকার সময়ে গোপনে আমি কলকাতায় আমাদের দূতাবাসে একটি চিঠি লিখি বার্মা সরকারের মনোভাব ও আমাদের বন্দিদশার কথা জানিয়ে। নভেম্বর মাসের ১৫ তারিখ ১৯৭১ সালে হাইকমিশনের পক্ষে আনোয়ারুল করিম চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি পত্র পাই। চিঠিতে বলা হয়—বিষয়টি নিয়ে আমরা বার্মা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। এর পরই বার্মা সরকার অনেকটা নমনীয় হয়ে যায়। অক্টোবর মাসে আমরা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসে ঘুনধুম, রামুর পূর্বাংশ ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় পাঁচটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিই।

১১ ডিসেম্বর জয় বাংলা বাহিনীর প্রধান হিসেবে আমি কক্সবাজার পাবলিক হল মাঠে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। ৩ মার্চ এ মাঠেই আমি জনসভা করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু করেছিলাম।-লেখক : ১৯৭১ সালে ছাত্রলীগ জাতীয় পরিষদ সদস্য, চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ-সভাপতি-সূত্র: কালেরকন্ঠ