পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ৩ শাখা সম্মেলন

3

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিঃ “আত্মকেন্দ্রীকতা, দোদুল্যমানতানয়, অস্তিত্ব রক্ষার শপথে আত্মবলিদানের মন্ত্রই হোক জুম্ম ছাত্র সমাজের চেতনা” এই স্লোগানকে সামনে রেখে রোববার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনীর চৌধুরী মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, মিরপুর শাখা ও বাসাবো শাখার “বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিল”অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক অরুণ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় এবং সভাপতি অমর শান্তি চাকমার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার বিভাগের সদস্য ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জুয়েল চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মনিরা ত্রিপুরা, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক পলাশ মাহাতো এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক রাজীব দাশপ্রমুখ। এছাড়াও সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাগাছাসসহ বিভিন্ন গ্রগতিশীল রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রী দীপায়ন খীসা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আদর্শ রয়েছে। সেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করলে সেখানে আত্মকেন্দ্রীকতা ও দোদূল্যমানতার কোন স্থান থাকতে পারে না। সে কারণে আজকে যারা আত্মকেন্দ্রীকতা ও দোদূল্যমানতা থেকে দূরে থাকতে পারেন তারাই এই অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রগামী হতে পারেন। পাহাড়ী ছাত্রপরিষদের এক ঝাঁক রাজনৈতিক কর্মী রয়েছে। যাদেরকে পেশাদার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এই কাজটা কিন্তু সহজ কাজ নয়। এই মোহময় চাকচিক্য জীবন সবাই ত্যাগ করতে পারে না। সে কারণে কঠোরভাবে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টা আজকে ক্লাস ফোর ফাইভের ছাত্রদেরকে সরল সুদ-কষার শতকরা অংক শেখানোর মত করা হচ্ছে। সেই সুদ-কষার অংক কখনো সেনাবাহিনীরা আর কখনো সরকারের এমপি, মন্ত্রীরা আর কখনো খোদ প্রধানমন্ত্রীই শেখাচ্ছেন। আমরা তো সরকারের কাছে অংক শেখার জন্য পার্বত্য চুক্তি করিনি। চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে একটা মর্যাদার ভিত্তিতে। সেজন্য আমাদেরকে সেই হিসাবের জবাব দিতে হবে। সেই জবাব দেওয়ার সূর্য সৈনিক হল পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের এক ঝাঁক রাজনৈতিক কর্মী । সেজন্য শাসক গোষ্ঠীকে জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রসমাজকে সঠিক দর্শনে দীক্ষিত হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এবং দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি নিজেকে একজন বিপ্লবী কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জুয়েল চাকমা বলেন, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ মানেই আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ মানেই এম এন লারমার আদর্শে দীক্ষিত এক ঝাঁক তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ মানেই তের ভাষাভাষী চৌদ্দটি জাতির মুক্তির আলোর দিশারী। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ জুম্ম জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে এবং যতদিন পর্যন্ত অধিকার আদায় না হয় ততদিন পর্যন্ত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ সঠিক আদর্শে দীক্ষিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াই সংগ্রাম করে যাবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মণিরা ত্রিপুরা বলেন, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এখনো পর্যন্ত দোদুল্যমান চিন্তাভাবনা বিদ্যামান রয়েছে। সে কারণেই আন্দোলন সংগ্রামে নারীসমাজ এখনো এগিয়ে আসতে পারছে না। শুধুমাত্র মুখে আন্দোলন সংগ্রামের কথা বললে আমরা যদি আন্দোলন সংগ্রাম না করি, আন্দোলন বিমুখ হই তাহলে কিভাবে আমরা অধিকার পাবো। তাই দোদুল্যমানতার মধ্যে না থেকে আত্মবলিদানের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজীব দাশ বলেন, আজকে পাহাড়ে ও সমতলে আমাদের আদিবাসী বন্ধুদের সাথে যে ধরণের নিপীড়ন চলছে তার প্রতিবাদ করার জন্য পাহাড়ী জনগণের সাথে আমরাও আছি। দেশে নিপীড়নের ধারা পরিবর্তিত হচ্ছে। সেখানে শুধু পাহাড় নয়, সমতলে ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়ের যে কোন আন্দোলন সংগ্রামে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন অতীতেও পাশে থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পলাশ মাহাতো বলেন, বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারলেই অধিকার আদায় সম্ভব। তাই বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ব্যক্তির ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়াগুলোকে বিসর্জন দিয়ে পাহাড় ও সমতলের ছাত্র সমাজকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এগিয়ে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি কিংশুক চাকমা এবং সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন সাংগঠনিক সম্পাদক রিবেং দেওয়ান। মিরপুর শাখার সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন মিরপুর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রিপ রিপ চাকমা এবং বাসাবো শাখার সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন বাসাবো শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক উমংহ্লা মারমা।

উক্ত সম্মেলনে অমর শান্তি চাকমাকে সভাপতি, অরুণ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে সাধারণ সম্পাদক এবং কৌশিক তঞ্চঙ্গ্যাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ২১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। তুর্বান রায়কে সভাপতি, অনেশ চাকমাকে সাধারণসম্পাদক, নরেশ চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট মিরপুর শাখা কমিটি; রুমেল তঞ্চঙ্গ্যাকে সভাপতি, উমংহ্মা মারমাকে সাধারণ সম্পাদক, জনি ত্রিপুরাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট বাসাবো কমিটি এবং জ্যাকশন তঞ্চঙ্গ্যাকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট ঢাকা পলিটেকনিক্যাল শাখার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।