শিথিল নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষার্থে কোটা বাতিল হোক!

665

সুব্রত মণ্ডল:

চাকরীতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে অনেক অলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। যারা কোটা বিরোধী কথাবার্তা বলছেন, তা তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রকাশ করছেন।গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটাই স্বাভাবিক যে মত বিরোধ থাকবে। তবে এসবের মূলে রয়েছে অনেক গভীরের বিষয়। যা হুট করে আলোচনা করা যায় না। মনে রাখতে হবে, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশের শিক্ষিত অশিক্ষিত উভয় ধরণের লোক জাতির জনকের স্বাধীনতার আহ্বানে সারা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলাদেশকে শত্রু মুক্ত করেছেন। আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। দেশ স্বাধীন হবার পর অস্বচ্ছল, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকার যে সব উদ্যোগ নিয়েছিল তার মধ্যে সরকারি চাকরীতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা চালু ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা প্রদান অন্যতম।  এ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী সরকারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তবে দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধারা অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্চিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা চাকরীতে প্রবেশ করতে পারেন নি।জাতির এই সূর্য সন্তানদের সম্মান করার জন্য সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের চাকরীতে প্রবেশের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করেছে।যা প্রশংসার দাবি রাখে।

মনে রাখা দরকার, এদেশে গরিব রাজাকার পাওয়া দূরহ কাজ। কিন্তু হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা মিলবে ভূরি ভূরি। ফলে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা, বাড়তি সুবিধা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।যতটুকু দরকার, ততটুকু রাষ্ট্র বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তা পূরণ করতে পারছে না। তবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  দফায় ক্ষমায় আসার পর পর জাতির এই বীর সন্তানদের সম্মান দিয়ে চলেছেন । যা সবত্র প্রশংসা কুরিয়েছে।প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা জামাতের লোক জন প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে কৌশলে বাঁধা প্রদান করে চলেছেন। উদাহরণ হিসেবে চাকরী প্রত্যাশী যুব সমাজ সম্প্রতি শাহাবাগে সরকারী চাকরীতে কোটা কমিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন করেছেন। তাদের এ আন্দোলনের দাবির চাইতে বেশী দিয়েছে সরকার। আন্দোলনকারীরা চেয়েছিল, কোটা কমানোর জন্য। আর সরকার তাদের দাবি শতভাগ মেনে নিয়েছে। বলতে গেলে দাবির চেয়ে সরকার আন্দোলনকারীদের আরো বেশী দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের বলেছে, কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে পদগুলো খালি না রেখে মেধা দিয়ে পূরণ করতে হবে। সরকারে এ ঘোষণায় প্রমাণ করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা অযোগ্য ! অযোগ্য হলে তারা  চাকরী জন্য আবেদন করল কি করে?

বর্তমান সময়ে এসে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জাতির সূর্য সন্তানদের সরকারের ভিতর ঘাপটি মেরে থাকা জামায়েতের আর্শিবাদপুষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি চাকরী প্রত্যাশীরাও ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করছে। যা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ব্যথিত করছে। সম্প্রতি চাকরীতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী তরুণ সমাজে রাজপথে নামার দৃশ্য দেখে আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে । অথচ এই তরুণ শিক্ষিত অশিক্ষিত তরুণ সমাজই জাতির জনকের ডাকে সাড়া দিয়ে কাধে কাধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে করতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। তারা দেশ নামক পবিত্র ভূমিকে রক্ষা করেছেন।তরুণ সমাজকে রাস্তায় নামার পিছনে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বড় একটি শক্তি কাজ করছিল। স্বাধীনতা বিরোধীরা  ষড়যন্ত্র করে আসছিল । যার ফসল তারা ঘরে তুলেছে। চাকরী প্রত্যাশী যুব প্রজন্মরা জাতির সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদেরকে হেয়ভাবে কথা বার্তা বলতে দেখে  খুব কষ্ট পাচ্ছি। চাকরী না পেলে আমাদের যুব সম্প্রদায়ের হতাশা থাকাটাই স্বাভাবিক। তারা চাকরীর জন্য দাবি করবে। দাবি আদায়ে আন্দোলন করা অস্বাভাবিক নয়। তবে সরকারের কাছে তারা কর্মসংস্থান দাবি করতেই পারে। এটাই করা উচিৎ। তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটায় নয়। মনে রাখতে হবে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কারণেই এ স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীনভাবে বাক প্রকাশের অধিকার পেয়েছি।তরুণ যুব প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব । তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটায় কেন তরুণ প্রজন্মকে নিয়োগ দিতে হবে ? চাকরীর জন্য যারা আবেদন করে তারা সবাই যোগ্য। সরকারি দপ্তরগুলোতে যে পরিমাণ পদ খালি রয়েছে তা সরকার নিয়োগ দিলেই কেউ আর বেকার থাকবে না।

সম্প্রতি জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোটা পূরণে অপেক্ষাকৃত মেধাবীদের নিয়োগ করা হবে । এ সিদ্ধান্ত সাধুবাদ পাবার যোগ্য হলেও আমি সাধুবাদ জানাতে পারছি না। কারণ এখানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সাথে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। আমরা বেকার তরুণ যুব সমাজ, আমাদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকার চাপ দিতে পারি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সম্মানকে হেয় করতে পারি না। বাস্তবতা হল আমরা তাই করছি, প্রতিনিয়ত করে চলেছি। সরকার সর্বশেষ যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন, তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তাদের মেধাহীন বলে প্রতীয়মান করেছে। আসলে কি তাই ! আদো নয়। তারা শিক্ষাগত যোগ্যতায় সাধরণ চাকরী প্রত্যাশীদের মতই । তবে তারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে মেধাবী নয় বলে প্রমাণ করার চেষ্টা মাত্র। এরকম কোটা রাখার চেয়ে না রাখাই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বড় সম্মানের, বড় গৌরবের। সরকারের আরেকটি সিদ্ধান্ত আমাদের বিহ্বল করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরাও কোটা সুবিধা পাচ্ছেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাতিরা জামাত শিবির করেন বলে আমাকে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান জানিয়েছেন।

সরকার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা মোবাইলে দেবার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আসলে সিদ্ধান্তটির ইতিবাচক বিষয়ের চেয়ে নেতিবাচক দিকই বেশী। কারণ অনেক মুক্তিযোদ্ধা আজ বয়সের ভারে ন্যুজ। বয়সের কারণে তারা অনেকেই মোবাইল চালাতে অক্ষম। মুক্তিযোদ্ধার একাধিক সন্তান থাকলে এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিকটাই বেশী সবার সামনে প্রত্যক্ষ করবে । কারণ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয় প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার একটি মাত্র মোবাইল ফোনের সিম নম্বর নিবন্ধন করে নেবে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনে মোবাইলও কেনে দেবে সরকার। একাধিক মোবাইলের সিম নম্বর নিবন্ধের সুযোগ নেই।একটি মাত্র মোবাইল নম্বর হয় ওই মুক্তিযোদ্ধার নয় তো তার বড় ছেলের,নয় তো তার ছোট ছেলের কিংবা তার মেয়ের। একজন মাত্র জানতে পারবে মুক্তিযোদ্ধা বাবার ভাতা কতটাকা আসছে।যার কাছে সিম ও মোবাইল থাকবে কেবল মাত্র সেই টাকা তুলতে পারবে। অন্যরা যখন জানবে, তখন বাবার ভাতার অংশ তারা চাইবে । অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ভাতা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে জাতির এই সূর্য সন্তানের পরিবারে কলহই বাড়বে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আমাকে জানালেন, দেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই আর্থিকভাবে দুর্বল, অস্বচ্ছল। ফলে পারিবারিক কলহ সামাজিক বিচারে রুপ নেবে।বৃদ্ধ বয়সে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এ বিবাদ ব্যথাই দেবে।

তাই মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও মোবাইল ভাতা প্রদানের বিষয়ে নতুনভাবে, অন্যভাবে ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখক পরিচিতি: জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা কর্মকর্তা , ডা সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল লি: ।