পুরুষ নয়, নারীই শ্রেষ্ঠ

10

প্রভাষ আমিনঃ বিশেষ বিশেষ দিবস পালন নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। ১৪ এপ্রিল ভালোবাসা দিবস মানে কিন্তু এই নয় যে বছরের অন্য দিনে ভালোবাসা যাবে না। বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ আপনি ভালোবাসতে পারবেন।

তবুও নারীদের জন্য একটি আলাদা দিবস পালনে আমার কেন যেন বাধো বাধো ঠেকে। নারী দিবস পালন নারীদের জন্য গ্লানির, অমার্যাদার, অপমানের মনে হয়। পুরুষদের জন্য তো আলাদা দিবস নেই, তাহলে নারীদের জন্য থাকবে কেন? আলাদা দিবস থাকা মানেই যেন, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া, এই নারী তোমরা কিন্তু আমাদের চেয়ে একটু আলাদা, একটু খাটো। তোমাদের আমরা ভালোবেসে (আসলে করুণা করে) একটা দিবস দিয়েছি। তোমরা পালন করো, আনন্দ করো। নারী দিবস পালনের মধ্যেই কেমন একটা পুরুষতান্ত্রিক ব্যাপার আছে। অনেক প্রগতিশীল পুরুষ খুব গর্বের সঙ্গে বলেন, আমি আমার স্ত্রীকে কোনো কাজেই বাধা দেই না। তাকে সম্পুর্ণ স্বাধীনতা দেই। এই বলার মধ্যেও একটা সাংঘাতিক পুরুষতান্ত্রিকতা আছে।

‘স্বাধীনতা দেই’ মানে চাইলেই স্বাধীনতা নাও দিতে পারি। মানে হলো, নারী তোমার স্বাধীনতা আমার হাতে, আমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

অথচ পুরুষরা কেন শ্রেষ্ঠ হবে, কেন তারা সবকিছুতে আধিপত্য বিস্তার করবে, এটা আমার মাথায়ই ঢোকে না। আমার বিবেচনায় হওয়ার কথা উল্টো। আমি নারী-পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি ন্যায্যতায়।

সেই সমতা আসতে পারে, মর্যাদার ভিত্তিতে। যুগে যুগে নারীরা বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত। তাই এখন সমান অধিকার দিলেও তো তারা পিছিয়েই থাকবে।

মর্যাদার ভিত্তিতে সমতা যেদিন গড়ে উঠবে, সেদিন আমি সমান অধিকারের কথা বলবো।

তবে মর্যাদার ভিত্তিতে সমতার সমাজ গড়ে না ওঠা পর্যন্ত তো নারীদেরই শ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা। কারণ সব বিবেচনায় নারীরা এগিয়ে। একটি বিচারে তো নারী অনন্য। পুরুষের চেয়ে নারী শ্রেষ্ঠ, কারণ তিনি গর্ভধারণ করতে পারেন।

নারীতেই সভ্যতার বিকাশ, অগ্রগতি।

কাজে কর্মেও কিন্তু নারীরা এগিয়ে। সাধারণভাবে নারীরা ভালো, ত্যাগী, পরিশ্রমী, উদ্যমী, সহনশীল, ডেসপারেট। এইসব বিশেষণ বইয়ে পড়া নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে কাজ করতে গিয়ে জেনেছি। অন্য সব ক্ষেত্র যাই হোক। ব্যতিক্রম নয় সাংবাদিকতাও। নারীরা রিপোর্টিঙে, নিউজরুমে, ক্যামেরায়, ভিডিও এটিডিঙে সমানতালে কাজ করছে। অনেক নিউজরুমে নারীরাই নেতৃত্ব দেয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো নারীরা অনেক বেশি সময়ানুবর্তী, দায়িত্বশীল, কর্মঠ, পরিশ্রমী। সাধারণভাবেই নারীদের মধ্যে মাতৃভাব প্রবল। তারা সবসময় সবকিছু আগলে রাখেন। বেড়াল এমনিতে খুব নিরীহ প্রাণী। কিন্তু বেড়ালের বাচ্চার দিতে হাত বাড়িয়ে দেখুন, মা বেড়াল মুহুর্তেই বাঘিনী বনে যাবে। প্রাণীকূলে, মানুষকূলে মায়েরা সবসময় সন্তানকে আগলে রাখেন। সন্তানের জন্য বাবারা যতটা ত্যাগ স্বীকার করেন, মায়েরা করেন তার হাজার গুণ।

এখন নারীদের কাজ, পুরুষদের কাজ বলে আলাদা কিছু নেই। সব কাজ সবাই করেন। বরং আমার অভিজ্ঞতা হলো, নারীরা কাজে অনেক মনোযোগী ও দক্ষ। স্বামী-স্ত্রী দুজন কর্মজীবী হলে স্বামী বাসায় ফিরেই ক্লান্ত হয়ে টিভি দেখতে বসে যান।

আর নারী ছোটেন রান্নাঘরে। অফিসে যাওয়ার আগেও তাকে স্বামী-সন্তানের নাস্তা গুছিয়ে, ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে যেতে হয়। তার মানে একজন কর্মজীবী নারীকে তার সহকর্মীর চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হয়। অনেক মেধাবী নারী স্বামী-সন্তান-সংসারের জন্য তার ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করেন। হয়তো তার ক্যারিয়ার তার স্বামীর চেয়ে ভালো হতে পারতো। কিন্তু একজন গড়পড়তা পুরুষও কখনো তার মেধাবী স্ত্রীর সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের জন্য নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করেন না। আমার স্ত্রী মুক্তি আমার চেয়েও বেশি ব্যস্তু।

সংসার, বাজার, ছেলের স্কুল-কোচিং, আত্মীয়-স্বজন, সামাজিকতা- সব মিলিয়ে তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াই কঠিন। অথচ কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, আপনার স্ত্রী কী করেন? আমি অবলীলায় বলে দেই, কিছুই করেন না।

আসলে আমি একটা ডাহা মিথ্যাবাদী। স্ত্রী মারা গেলে নানা অজুহাতে সর্বোচ্চ একবছরেরর মধ্যে পুরুষরা বিয়ে করে ফেলেন। কিন্তু ২৫/৩০ বছরে বিধবা হয়েও বেশিরভাগ নারী সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করেন নিজের গোটা জীবন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদদের বেশিরভাগের স্ত্রী অসম্ভব কষ্ট করে নিজের সন্তানদের মানুষ করেছেন। উল্টো উদাহরণ খুব বেশি নেই। এতকিছু করেও নারীরা সমান মর্যাদা পান না। এত গুণ থাকার পরও তারা পদে পদে বঞ্চিত। সমান কাজ করেও নারীরা পারিশ্রমিক পান কম।

সারাজীবন স্বামীর জন্য, সন্তানের জন্য উৎসর্গ করলেও নারীদের নিজের কোনো ঘর নেই। হয় বাবার বাড়ি, না হয় স্বামীর বাড়ি। শেষ বয়সে সন্তানের করুণা।

বছর দুয়েক আগে আমার ছেলে প্রসূন স্কুলে যাওয়ার সময় তার মায়ের কাছে আবদার করছিল, সে যেন স্কুল ছুটির অন্তত আধঘন্টা পর তাকে আনতে যায়। এই সময়টা সে স্কুলের মাঠে খেলবে। কিন্তু মুক্তি আমাকে ও প্রসূনকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখে। তাই প্রসূন আধঘণ্টা তার চোখের আড়ালে থাকবে, এটা মেনে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো ভাবেই মায়ের মন গলাতে না পেরে প্রসূন বললো, তুমি একটা ভীতু। আমিও সুর মিলিয়ে বলতে গেলাম, তুমি একটা কাপুরুষ।

কিন্তু কা… পর্যন্ত বলে থেমে গেলাম। মুক্তি কাপুরুষ হবে কিভাবে? তাই বললাম, তুমি একটা কামহিলা। কিন্তু বলার সময়ই বুঝতে পেরেছি এটা অভিধানের বাইরের শব্দ। ‘কু’ বা ‘কা’ এই নেতিবাচক বিশেষণ শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, নারীদের ক্ষেত্রে নয়। কুপুত্র হয়, কুকন্যা কখনো শুনেছেন?

বিদ্যান, বুদ্ধিমান’এর স্ত্রীবাচক শব্দ আছে; কিন্তু বোকা বা মূর্খের নেই।

প্রেমে ব্যর্থ হওয়া তরুণরা তাকে ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকার জন্য ‘ছলনাময়ী’

জাতীয় দুয়েকটি নেতিবাচক শব্দ খুঁজে বের করলেও নারীরাই আসলে শ্রেষ্ঠ।

মাতৃরূপ, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি- সব ভাবনা মাতৃকেন্দ্রিক, মাকে ঘিড়েই।

নারী দিবস আসলে আমাদের জন্য লজ্জার, অপমানের। আমি তেমন দিনের স্বপ্ন দেখি, যেদিন বছরের ৩৬৫ দিনই হবে নারীর, পুরুষের, আমাদের সবার। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। মূল্যায়নটা হবে যার যার যোগ্যতা, দক্ষতা, প্রজ্ঞার ওপর।-লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ