ভাষার মাসে আশা ভাসে! স্বপ্নগুলো মুচকি হাসে!!

26

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমার শোনিম বাংলায় খুব একটা দূর্বল নয়। সাধারণত যারা ইংরেজী মাধ্যমে পড়ে তারা বাংলায় দূর্বল হয়। শোনিম যাতে মাতৃভাষায় কোনভাবেই দূর্বল না থাকে সেজন্যে বাংলা নিয়ে ওকে আলাদা কেয়ার নেই। প্রতিদিন পত্রিকা এবং গল্পের বই পড়াসহ নানা ধরনের পড়ায় ব্যস্ত রাখি। যেন নিজ ভাষায় দূর্বল না হয়; দখল থাকে বেশ। মাঝে মাঝে বিরক্ত হলেও শোনিম চেষ্টা করে। কোন কিছু না বুঝলে তৎক্ষনাৎ মায়ের কাছে জানতে চায়। বুঝতে চায় আমার কাছেও।
কাজটি প্রায়শই করে। না করে উপায়ও নেই। বাংলা ভাষায় এমন কিছু সমোচ্চারিত শব্দের ব্যবহার আছে যা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। আমরা অভ্যস্ত বলে কঠিন মনে হয় না। কিন্তু যারা অভ্যস্ত নয়, তাদের কাছে কঠিন লাগে, অস্বাভাবিক মনে হয়। সেদিন পত্রিকার এমনই একটি শব্দ নিয়ে বুঝতে সমস্যা হলো শোনিমের। জানতে চাইলো, আব্বু, প্রশ্নপত্রের সাথে ফাঁসির কি সম্পর্ক? মিডিয়ার কারনে ফাঁসি শব্দটি ওর খুব জানা শব্দ। ধরে নিয়েছে ফাঁসি আর ফাঁস একই শব্দ। তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে ফাঁসির সম্পর্ক খুঁজেছে।
ফাঁসি না হলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন জাতীয় সমস্যা। এর সমাধানের কোন লক্ষণ কোনভাবেই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে কখনো দায়িত্বহীন, আবার কখনো খুবই অসহায় মনে হয়। কথাবার্তায় কখনো কোন আশার বাণী শোনা যায় না। পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে যা বলেন, তা কেবলই দূরাশার নিঃশ্বাস। আশা দেবেন কি? তারা তো প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি স্বীকারই করেন না। তাই পাবলিক বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, সমস্যাটির কুলকিনারা করার মুরোদ তাদের নেই। পত্রপত্রিকাও হয়ত তাই মনে করে তাদেরকে তুলোধূনো করছে। সারা বছরই করে, বিশেষ করে ভাষার মাসে। ভাষার মাস তো বড় আবেগী মাস। আশা আকাংখার ফাগুন মাস। এ মাসে ভাষা নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে লেখালেখি হয় বিস্তর। তাই ঘুরে ফিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টিও চলে আসে।
বিষয়টি আসলেই ভয়াবহ এবং আতঙ্কের; সেই সঙ্গে লজ্জার। চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নয়, বরং এবার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির একজন শিশু শিক্ষার্থী প্রশ্ন ফাঁসের কী বোঝে? যদি না বোঝে, তাহলে এই প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে কি তার অভিভাবকরা জড়িত? যে অভিভাবক তার শিশুকে ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে উদ্বুদ্ধ করেন, সেই অভিভাবক ভবিষ্যতে এই সন্তানকে কী বানাবেন? আর বাকী থাকলো না কিছ! সবাই জড়িয়ে গেল। কেউ ফাঁস করে অপরাধ করে আর কেউ অগ্রিম প্রশ্ন টাকা দিয়ে কেনে অপরাধ করে। এভাবেই সবাই মিলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার এক বিধ্বংসী পন্থা প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে খেলছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা, ধ্বংস হচ্ছে জাতি ও দেশ। কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা? জাতিকে মেধাশূণ্য করার আরেকটা হাতিয়ার। বস্তুত প্রশ্নফাঁস এখন এক মহামারি এবং যেকোন সংক্রামক ব্যাধির চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে যখন খোদ শিক্ষামন্ত্রীও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রশ্ন ফাঁসকে বৈধতা দেন কিংবা বাস্তবতা অস্বীকার করেন বা করতে চান, তখন এই ব্যাধি থেকে মুক্তির আপাতত কোনো পথ পাওয়া যায় না। আমরা এ কারণে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও চাইতে পারি। তিনি পদত্যাগ করতেও পারেন। কিন্তু তাতেই কি সবকিছু বদলে যাবে?
যে পঁচন শুরু হয়েছে মানুষের মগজে, যে বাবা-মা তার নিজের সন্তানের প্রশ্ন ফাঁস করেন কিংবা পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে খাতা নিয়ে এসে উত্তর লিখে দেন, সেই অবক্ষয় আমরা রোধ করব কী করে? একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ কিংবা টেলিভিশনের টকশোতে বুদ্বিজীবীদের আহা, উহু অথবা ক্ষোভ ঝেড়ে পত্রিকার পাতা ভরে ফেললেই যে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং সমস্যাটা অন্যখানে।
এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের রাষ্ট্রে, সমাজে এবং পরিবারের মধ্যে ঘাতক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সেটি হলো, যে করেই হোক প্রথম হতে হবে। দ্বিতীয় শ্রেণির একটি শিশুকে পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে, তাকে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে হবে, চিত্রাঙ্কনে প্রথম হতে হবে, নাচেও প্রথম হতে হবে। আর সবখানে প্রথম হতে চাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অস্ত্র হিসেবে খোদ অভিভাবকরাই চোরাগলির সন্ধানে নেমে পড়েন।
জন্মসূত্রে সন্তান যে যোগ্যতা রাখে না, অভিভাবকগণ সন্তানের কাছ থেকে তার চেয়ে ঢের বেশী আশা করেন। বলা যায় আশা পূরনে সন্তানকে যমের মত চেপে ধরেন। গিলে গিলে পড়া খাওয়ান। প্রাইভেট টিউটর খাওয়ান, বাবা-মাও খাওয়ান। আসলে তারা কী চান সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। নিজের জীবনে যা হতে পারেননি সন্তানকে তাই বানাতে চান। সন্তানকে দিয়ে তার নিজের জীবনের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে চান। অনেকটা ছেলেবেলায় পড়া একটা ছোট্ট কবিতার মত, বাবার ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার, মায়ের ইচ্ছে ডাক্তারী। দাদুর ইচ্ছে উকিল হব, জেঠুর ইচ্ছে মাষ্টারী। ইচ্ছেগুলো কেমন যেন, ভেবেই আমি থ! কেউ আমায় বললে না তো, খোকা মানুষ হ!!
মানুষ হবার কথা কেউ বলে না! আসলেই বলে না; অভিভাবকগণও বলে না। অভিভাবকগণ বুঝতেই চান না, সন্তান মেধাবী হলেই তাকে দিয়ে সবকিছু করানো সম্ভব নয়। মেধাবীরা হয়ত চাইলে অনেক কিছুই পারে। কিন্তু সবকিছু পারে না। যে ডাক্তার হবার যোগ্যতা রাখে তাকে জোর করে ইঞ্জিনিয়ার বানানো ঠিক নয়। সে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করতে পারবে ভাল রেজাল্ট করে। কিন্তু ভাল ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে না। কারন ইঞ্জিনিয়ারিং এ তার মন বসবে না। বিষয়টি মনের। একইভাবে যে ইঞ্জিনিয়ার হবার যোগ্যতা রাখে তাকে জোর করে ডাক্তার বানানোও ঠিক নয়। সে ডাক্তারী পাশ করতে পারবে ভাল রেজাল্ট করে। কিন্তু ভাল ডাক্তার হতে পারবে না। আর এ কারনেই বাংলাদেশে প্রচুর ভাল রেজাল্ট করা ইঞ্জিনিয়ার আছে, ডাক্তার আছে। কিন্তু স্বনামধন্য ভাল ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তারের সংখ্যা হাতে গোনার মত। যোগ্যতা সম্পন্ন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সংখ্যায় কম। কারন তারা যতটা না নিজেদের শক্তি এবং মননশীলতার যোগ্যতায় হয়েছে, তারচেয়ে ঢের বেশী হয়েছে কেবলমাত্র বাবামার চাপিয়ে দেয়া ইচ্ছা শক্তিতে। এটাকে নিয়ন্ত্রন করা খুব জরুরী। সন্তান বড় হয়ে তাই হবে, জন্মসূত্রে যা হবার যোগ্যতা তার বেশী। ছোটবেলা থেকেই মোটামুটি বোঝা যায়, শিশুটির আগ্রহ কিংবা দূর্বলতা কোন বিষয়ে বেশী। মোটামুটি সেদিকেই তাকে নিতে হবে। তা না করে জোর করে বাবা-মায়ের খেয়ালখুশী মত নিতে গেলেই যত সব সমস্যার উদ্ভব।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে কমবেশী এটাও একটা কারন। তবে মূল কারন পরীক্ষা পদ্ধতিটাই। অত্যন্ত ভীতিকর এবং একেবারেই বাস্তবতা বিবর্জিত এই পরীক্ষা পদ্ধতি পুরো জাতিকে শিক্ষায় দূর্বল করে দিচ্ছে। জ্ঞানহীন করে দিচ্ছে। নিঃসন্দেহে জাতি মেধাবী শিক্ষার্থী পাচ্ছে প্রচুর। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত মেধাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন জাতি তৈরী হচ্ছে না। মেধার চর্চা হচ্ছে যেনতেন ভাবে; একেবারেই হাল্কা ভাবে। বলা যায় মেধা নিয়ে ছিঃ কুতকুত খেলা হচ্ছে। আর দিনকে দিন বাড়ানো হচ্ছে মেধাবী মূর্খদের সংখ্যা।
এই সমস্যা থেকে বের হওয়া খুবই জরুরী। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনার চেয়েও জরুরী। আর বের হতে হলে দরকার শিক্ষাব্যবস্থার একটা আমুল পরিবর্তন। যা করার দায়িত্ব এবং ক্ষমতা পূরোপুরি সরকারের। কিন্তু নাগরিক সমাজেরও এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই। নাগরিক সমাজকেও বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা দরকার, জোড়াতালি দিয়ে নয়; খুবই সিরিয়াসলি ভাবা দরকার। ভাবা দরকার কিভাবে প্রতিটি শিশুর মাঝে সুপ্তভাবে লুকায়িত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে শিশুটিকে তার মত প্রতিভাবান করে গড়ে তোলা যায়। মনে রাখা দরকার, সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকদের আকাঙ্খা থাকা দরকার সন্তানদের মেধা অনুযায়ী, মননশীলতা অনুযায়ী। অভিভাবকদের প্রয়োজন অনুযায়ীও নয়, স্বপ্ন অনুযায়ীও নয়।-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।