কার লাভ, কার ক্ষতি

5

যুগবার্তা ডেস্কঃ দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে দলের নেতাকর্মীরা তাকে দোষী মানতে রাজি নন। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপিতে ভাঙনের আশঙ্কাও দেখছেন কেউ কেউ। তবে সমর্থকরা দল ছেড়ে আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকবে সে সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। তাদের মতে, রায়ে কারও লাভ-লোকসান হয়নি। এখনও তা বলার সময় আসেনি। তবে দুই পক্ষেরই সুযোগ রয়েছে লাভবান হওয়ার।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও কলাম লেখকরা বলেছেন, রায় ঘোষণার আগে দেশজুড়ে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। রায়ের পর সরকার ও বিএনপির সংযত আচরণে তা কেটে গেছে। বিএনপি হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচির পথে না গিয়ে খালেদা জিয়ার আহ্বানে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে। একে ইতিবাচক বলছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতার প্রেক্ষাপট দেখা হলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জয় হয়েছে। হেরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু জ্ঞান করে এমন নির্মমতা দেখানো হয় না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কার লাভ-ক্ষতি হলো তা বলার সময় এখনও আসেনি। দুই দলেরই বড় কর্মীবাহিনী রয়েছে। একই সঙ্গে জনপ্রিয়তায়ও তারা অন্য সব রাজনৈতিক দলের তুলনায় এগিয়ে। তবে খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়ল। এতে করে রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তা হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

খালেদা জিয়ার সাজার কারণে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের সক্ষমতা হারিয়েছে বিএনপি; এমন অভিমত হাফিজ উদ্দিন খানের। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিকে এখন প্রাধান্য দিতে হবে বিএনপিকে। এই প্রেক্ষাপটে দলটির উচিত, যে পদ্ধতিতেই হোক আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। ২০১৪ সালের মতো ভুল করলে সাংগঠনিক অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হতে না পারলেও গণতন্ত্র সুসংহত হবে। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন উর রশীদ বলেছেন, সহিংসতায় না জড়ানো বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার লক্ষণ। খালেদা জিয়ার মামলায় অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণও এর কারণ। এ কারণে দলটি জনবিরোধী কর্মসূচিতে যায়নি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেলে গেলে নেতা-নেত্রীর জনপ্রিয়তা বাড়ে। কিন্তু খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়বে- এ ধারণা ঠিক না। দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে। উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার সাজা বহাল থাকলে, তার রাজনৈতিক জীবনও ঝুঁকিতে পড়বে। তবে বিএনপি নিঃশেষ হবে না। দলটি চ্যালেঞ্জে পড়লেও, তার আদর্শে বিশ্বাসী কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে টিকে থাকবে। তাদের সমর্থন আওয়ামী লীগের দিকেও যাবে না। তাই এখনই লাভ-লোকসানের হিসাব কষা যাবে না।

কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদেরও একই অভিমত। তিনি বলেন, ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারি, সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের হোতাদেরও যদি বিচার হতো তাহলে খালেদা জিয়ার সাজাকে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দেখা হতো। তা না হওয়ায়, জনগণের বড় একটি অংশের মনে হতে পারে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। কারাবন্দি খালেদা জিয়া ভোটের রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী হলেন কি-না তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা হলেও, বিএনপি আখেরে লাভবান হবে। তার কারাদণ্ডে আওয়ামী লীগেরও দৃশ্যমান কোনো লাভ না হলেও, বিএনপির সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে তারা সমর্থন পেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যাই ঘটুক, বাংলাদেশে বিচার হয় রাজনীতির নিক্তিতে। খালেদা জিয়ার সাজাও তার বাইরে নয়। পশ্চিমা দেশে দুর্নীতির দায়ে সাজা হলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি হবে না। রাজনীতিবিদদের মামলায় বিচার প্রক্রিয়া ও আদালতের ওপর সরকারের প্রভাবের বিষয়ে সন্দেহ থাকায়, সাজা হলেই বিরোধী রাজনীতিকদের দোষী হিসেবে দেখেন না তাদের সমর্থকরা। সরকারের প্রতিহিংসা হিসেবে দেখেন। পঞ্চাশের দশক থেকে এ ধারা চলে আসছে।-সমকাল