জাতির জন্য বিপর্যয়কর কিছু ঘটে যায় নি

9

ড. মীজানুর রহমান:

জাতি হিসেবেই আমাদের আগ বাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস আছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার রায় নিয়েও আগ বাড়িয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। অনেকে বলেছে রায় সরকারের দ্বারা প্রভাবিত হবে আবার সরকার বলেছে বিচারককে ভয় দেখানো হচ্ছে যাতে তিনি যথাযথ রায় দিতে না পারেন।যদিও এটা কোন বিচারকের বিবেচ্য বিষয় না। বিষয়টা সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়।আদালত কি রায় দিবে এটা কারো জানার কথা না। আর কারো কথা দ্বারা বিচারকের ইনফ্লুয়েন্সড হওয়ারও কথা না। রায়ে আসামীর সাজা হলে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে,অথবা রায় আসামীর পক্ষে গেলে সরকারের থেকে চাপ আসবে, এসব যদি কোন বিচারকের বিবেচ্য বিষয় হয় তাহলে তার বিচারকই থাকার কথা না। কারন বিচারক শপথ গ্রহণের সময় শপথ করেন যে সমস্ত ভয়ভীতি, স্বজনপ্রীতি, প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে মামলার মেরিট দিয়ে বিচার কাজ পরিচালনা করবেন। এই রায়ে হয়েছেও তাই। মামলার যে বিচারক ছিলেন তিনি একজন জেলা জজ। এর আগেও এরকম বহু মামলার রায় তিনি দিয়েছেন। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই এ রায়টিও দিয়েছেন তিনি।

তবে আদালতে দোষী প্রমাণিত বেগম জিয়া এদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তার বড় একটা সমর্থক শ্রেণী আছে। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর কর্মীরা আবেগপ্রবণ হবেই। আবেগ দেখানোর কথা ছিল, কর্মীরা আবেগ দেখিয়েছে। কিন্তু এ রায়কে কেন্দ্র করে সকল জনতা রাস্তায় নেমে আসবে, রায়ে বিরাট একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে বলে যে প্রচার প্রচারণা চলছিল এরকম কোন কিছু রায়ের পর চোখে পড়ে নাই । সাধারণ জনগণ যা করেছে তা হল কৌতুহল বশত উৎসুক হয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে থেকেছে কি হয় তা দেখার জন্য।কিন্তু এটা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দেশে যে একটা অচলাবস্থা সৃষ্টির কথা অনেকে বলেছিল তা হয়নি। আমি আগেই একাধিকবার বলেছিলাম এরকম হওয়ার সম্ভাবনা নাই। কারণ মানুষ এখন নিজের কাজেই সারাদিন ব্যস্ত। কোথাও কাজ করলে প্রতিদিন পাঁচশো সাতশো টাকা টাকা আসে। কিছু হলেই রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর মতত সময় তাদের নাই।

রায়ের ব্যাপারে বলতে গেলে রায়টি হয়েছে নিম্ন আদালতে। এরপর এটি উচ্চ আদালতে যাবে, এর চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে। সেখানে যদি সাজা টিকে যায় তাহলে তো সাজা ভোগ করতেই হবে। আর যদি দেখা যায় যে এখানে আইনি দুর্বলতা আছে বা যে রায় হয়েছে তা যথাযথ হয়নি তাহলে প্রতিকার পাওয়ারও সুযোগ আছে বিবাদীপক্ষের। একটা ব্যাপারে হচ্ছে অনেকের মধ্যে বিচারের সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে হয়ত জিজ্ঞাসা থাকতেও পারে তবে রায়ের মাধ্যমে এটা তো পরিস্কার হল যে, টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বা আত্মসাৎ এর চেষ্টার একটা ঘটনা এখানে ঘটেছে।

রাজনীতির গতিপ্রকৃতির কথা বলতে গেলে রাজনৈতিক মাঠে আরো অনেক ঘটনাই সামনে ঘটবে। সে অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ।

কিন্তু যে আশঙ্কা টা ছিল যে রায়ের পরপরই বড়ধরণের রাজনৈতিক ডামাডোল বা অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে সে আশঙ্কা আমরা অতিক্রম করেছি। ভবিষ্যতেও তাদের নেওয়া কোন কর্মকান্ডে দলীয় কিছু কর্মী ছাড়া সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততার কোন সম্ভাবনা নাই।নাশকতার চিন্তা পরিহার করা বিএনপির জন্যও ভাল। কারণ সংগ্রাম করতে যেয়ে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারির পরে তিন মাস ধরে তারা যে পেট্রোল বোমা ও আগুন সন্ত্রাস করেছে তার মাধ্যমে তাদের যে জনবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে আজ একই রুপ বিধ্বংসী কার্যক্রম শুরু করলে সেই জনবিচ্ছিন্নতা আরো বাড়তো। আমি মনে করি বিএনপি নেতৃবৃন্দ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে, তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে।

নিজস্ব স্ট্যান্ডের উপর রাজনীতি করলে এটাই তাদের স্ট্যান্ড। আর বাইরের শক্তি বা অন্য কোন দলের সাহায্যে যদি তারা নাশকতা শুরু করে তাহলে দেখা যাবে দুই চারদিন পর উস্কানিদাতারা তাদের সাপোর্ট সরিয়ে নিয়েছে। তখন আগের বারের মত অবরোধ সমাপ্তি ঘোষনাও সুযোগও পাবে না। এর আগেই জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।

মূলত আগে যে হরতাল অবরোধের রাজনীতি ছিল আমাদের দেশে সেই দিন এখন শেষ হয়ে গেছে।এখন আর রাস্তায় রস্তায় হরতাল অবরোধ করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং আমি মনে করি না যে এ রায়ে জাতির জন্য বিপর্যয়কর কিছু ঘটে গেছে।

লেখকঃ রাজনৈতক বিশ্লষক ও উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়