অন্তু আহমেদ, জবি প্রতিনিধি : রাজধানীর পুরান ঢাকার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাহাদুর শাহ পার্কটিতে নগরবাসীর বিচরণের সুযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে নানাদিক থেকে। নানা সমস্যায় জর্জরিত পার্কটির পর্যাপ্ত যত্নের অভাবে স্থাপত্য সমৃদ্ধ রূপ দিনদিন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পার্ক সংলগ্ন রেলিং ঘেঁষে ফুটপাতে বসেছে ফল বিক্রেতা, মুচি, মুদি দোকানিসহ অস্থায়ী হোটেল। বেড়ে গেছে বখাটেদের উৎপাত। আশেপাশ থেকে শুরু করে পার্কের ভিতরে ছিনতাইয়ের মত ঘটনাও ঘটছে অহরহ। সন্ধ্যার পর বসছে মাদবকসেবীদের আড্ডা। পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও প্রতিদিন ঘটতে থাকা অপরাধ বিষয়ে তাদের কোন তৎপরতা দেখা যায় না বলে অভিযোগ এলাকাবাসী ও জনপ্রতিনিধির।
অপরাধপ্রবণতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ৪২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, এখানে পুলিশের দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে। টহলরত পুলিশের সামনেই ঘটছে নানা অপরাধ। তারা এ ব্যাপারে উদাসীন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সূত্রাপুর থানার দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, ওখানে প্রতিদিন নতুন নতুন টিম পাঠানো হয়। প্রতিদিন তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তারা যথাযথভাবে চেষ্টা করছে তাদের দায়িত্ব পালনের। নতুন করে সৃষ্ট সমস্যা সম্পর্কে জানার পর তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।
ঢাকার অন্যতম প্রধান নৌবন্দর সদরঘাট এলাকায় ঢুকতেই লক্ষ্মীবাজারের ঠিক মাথায় অবস্থিত পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত। পার্কটির চারপাশে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বেশ কিছু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারণে এটি পুরান ঢাকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। পার্কটি খোলা থাকা অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজারের বেশি লোক আসা যাওয়া করে। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করার পর এস্থানে একটি ঘোষণা পাঠ করে শোনান ঢাকা বিভাগের কমিশনার। সেই থেকে এই স্থানের নামকরণ হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ এর নামানুসারে পার্কের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।
সরেজমিনে পার্কটির খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, পার্কের অভ্যন্তরে উত্তর পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা স্মৃতিস্তম্ভের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তরা খসে পড়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের ওপর জুতা পায়ে প্রবেশ করছে দর্শনার্থীরা। মাঝখানে আছে একটি জলহীন ফোয়ারা। অযত্নে অবহেলায় আর দীর্ঘদিন জলহীন থাকায় সেটিরও বেহাল দশা। ট্যাঙ্ক থেকে পানি নিচ্ছেন হকার-দোকানদাররা। শরীর চর্চার সরঞ্জামগুলোর বেশিরভাগই তালা বন্ধ। বাকীগুলোর বেহাল দশা। প্রায় ৪০ লক্ষাধিক টাকা খরচ করে ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত শৌচাগার (পাবলিক টয়লেট) চালু হয়। নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা সংবলিত টয়লেটের ভিতরের দুই অংশেই ছিল আলাদা করে বড় দু’টি ওয়াটার পিউরিফিকেশন মেশিন যা দীর্ঘদিন ধরেই অকেজো রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। পার্কে ভ্রমণকারীদের ব্যবহারকৃত বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোন জায়গা না থাকায় পার্কের ভেতরে জায়গায় জায়গায় জমে উঠেছে আবর্জনাস্তুপ। পার্কটির বাইরের দিকে বিভিন্ন স্থানের রেলিং কেটে নিয়েছে মাদকসেবীরা।
পার্কে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী রুমানা ইয়াসমিন বলেন, পার্কের পাশের ডাস্টবিনের দুর্গন্ধ পার্কের পরিবেশ নষ্ট করছে। দুর্গন্ধে পার্কে অবস্থানরত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সমস্যায় পড়ছে। ময়লার দুর্গন্ধে চলাচলকারী পথচারীদেরও সমস্যা হয়। যানজটে পড়ে থাকা গাড়ির হর্ন ও কালো ধোঁয়ায় পার্কে ঘুরতে আসা মানুষের সমস্যা হচ্ছে নানা ভাবে।
এলাকার দোকানি ও বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, পার্কের আশেপাশে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ ও আবর্জনার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে পার্কে আগত লোকজনসহ পথচারীরা। সন্ধ্যা থেকেই বেড়ে যায় নানা রকম অপরাধ। সন্ধ্যার পর পার্কটি চলে যায় মাদকাসক্ত আর বখাটেদের দখলে। রাত বাড়ার সাথে সাথেই শুরু হয় মাদকের আড্ডা। ভোর রাত পর্যন্ত পার্কটিতে চলে নানা অসামাজিক কাজ। পার্কটির পাশে পুলিশপাহারা থাকলেও এ ব্যাপারে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
পার্কটির সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ৪২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, পার্কটির অভ্যন্তরে তেমন কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। বাইরে থেকেও অনেকবার ভাসমান দেকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলের নতুন নতুন গজিয়ে ওঠা অঙ্গ-সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে দায়ী। নতুন করে তৈরি হওয়া সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি যতদ্রুত সম্ভব সমাধানের চেষ্টা করবেন বলে জানান। পার্কটির সংস্কারের জন্য নতুন করে বাজেট হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে পার্কের অভ্যন্তরীণ সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমি যতদূর জানি পার্কটির অবস্থা আগের চেয়ে বেশ ভাল। ভাসমান দোকান-পাট সরানোর জন্য বেশ কয়েকবার ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশবাহিনী নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। বর্তমান অবস্থা সর্ম্পকে জানতে পেরে তিনি বলেন, অতি দ্রুত সার্বিক বিষয়ে তিনি খোঁজ নিবেন এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সম্প্রতি ৩১টি পার্ক ও মাঠের সংস্কার কাজের জন্য বাজেট হয়েছে। অন্যগুলার সাথে খুব দ্রুতই এ পার্কের সংস্কার কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।