প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষে প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য বদল

14

এম এ খালেক: অনেকটা হঠাৎ করেই গত ৬ জানুয়ারি শিক্ষা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন কার্যক্রমের (শিসউক) নির্বাহী পরিচালকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দাউদকান্দি গিয়েছিলাম। সংস্থাটির উন্নয়ন কার্যক্রম, বিশেষ করে প্লাবন ভূমিতে সমবায়ের ভিত্তিতে মাছ চাষ কার্যক্রমের বিস্ময়কর সাফল্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেয়াই ছিল আমাদের এ সফরের মূল উদ্দেশ্য। খুব ভোরে আমরা দাউদকান্দির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। সাপ্তাহিক ছুটি এবং রাস্তায় তেমন কোনো যানজট না থাকায় স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই উদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যাই। আমরা শিসউক স্থানীয় কার্যালয়ে অবস্থান গ্রহণ করি। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর প্রকল্প পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ি। শিসউক কার্যালয়ের সঙ্গেই রয়েছে একটি বড় প্রকল্প যেখানে মাছ চাষ করা হয়েছে। যেহেতু বর্ষার পানি নেমে গেছে অনেক আগেই, তাই এখন এ প্রকল্পের মাছ তুলে নিয়ে সেখানে ধান রোপণের উদ্যোগ-আয়োজন চলছিল। অনেকেই তাদের জমিতে ধান বা অন্যান্য ফসল বোনার উদ্যোগ গ্রহণ করছিলেন।

প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ কার্যক্রম চলছে দাউদকান্দি এবং সংলগ্ন এলাকাজুড়ে। দাউদকান্দি এলাকায় এভাবে মাছ চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই অন্য পেশা বাদ দিয়ে প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ করাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট মৎস্য বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যেখানে সকালবেলা পাইকারি মাছ বিক্রি হয়। অনেকেই এখান থেকে তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে মাছ কিনে নিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকা, এমনকি রাজধানীতেও সরবরাহ করছেন।

প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ কোনো পুরনো ধারণা নয়। তবে নিকট অতীতে এ ধরনের মাছ চাষ আমাদের দেশে হয়নি। কাজেই এটাকে একটি নতুন উদ্ভাবন বলা যেতে পারে। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। অনেকেই এখন প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ করার ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষের এ কার্যক্রমকে ‘দাউদকান্দি মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। শিসউকের নির্বাহী পরিচালক সাকিউল মিল্লাত মোর্শেদ জানালেন, প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ প্রকল্প ইতিমধ্যে এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তারা মোট ৫টি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া আরও অনেকেই এ কার্যক্রম শুরু করেছে। দাউদকান্দি এবং এর আশপাশের এলাকায় ৯০টির মতো প্রকল্প গড়ে উঠেছে, যেখানে প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। সাধারণ কৃষক যারা এতদিন শুধু ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তারা এ প্রকল্পে অংশ নিয়ে লাভবান হচ্ছেন।

প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ প্রকল্প চলে সাধারণত ৫ থেকে ৬ মাস। অর্থাৎ বর্ষা শুরু হলে তারা মাছ চাষ শুরু করেন এবং শীতকালে পানি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত এ প্রকল্প থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ আহরণ করা হয়। এর সঙ্গে পাশাপাশি হাঁস পালনও করা যেতে পারে। এতে বাড়তি লাভ হবে। সাধারণত বড় আকারের জলাভূমি যেখানে বর্ষাকালে পানি প্রবেশ করে এবং সেই পানি বেশ কয়েক মাস স্থায়ী হয়- এমন জমিকে মাছ চাষের জন্য নির্ধারণ করা হয়। বিরাট এলাকার ফসলি জমিকে এ জন্য বেছে নেয়া হয়। প্রয়োজনে জমির চারদিকে উঁচু বাঁধ দেয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কোনো স্থান খোলা থাকলে সেখানে তারা নিজ উদ্যোগে বাঁধ দিয়ে দেন, যাতে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে ইচ্ছামতো পানি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষের জন্য সাধারণত কোনো কৃত্রিম খাবার প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিকভাবে যে খাবার উৎপাদিত হয়, তা-ই মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আগে এখানে ধান চাষের পর বর্ষাকালে জমি অব্যবহৃত থাকত। ফলে কৃষক বাড়তি আয় থেকে বঞ্চিত হতো। কিন্তু প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকে এলাকার কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বাড়তি আয় করার সুযোগ পাচ্ছে।

প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ প্রকল্পে এলাকার ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের সীমিত পরিমাণে শেয়ার প্রদান করা হয়। মাছ চাষ করে যে আয় হয় তা শেয়ারের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়। প্রকল্প এলাকার জমির মালিকদের নির্ধারিত হারে শেয়ার প্রদান করা হয়। যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, কোনো জমির মালিক নন, তাদেরও কিছু পরিমাণ শেয়ার প্রদান করা হয়। এ শেয়ার প্রদান করা হয় ক্রেডিটে। অর্থাৎ শেয়ার পাওয়ার জন্য তাদের প্রাথমিকভাবে কোনো অর্থ প্রদান করতে হয় না। বাকিতে তারা শেয়ারের মালিক হয়ে যানে। বছরান্তে মাছ চাষ করে যে লাভ হয় তা দিয়ে তাদের শেয়ারের টাকা সমন্বয় করা হয়। প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে এখানকার মানুষ সাধারণত বর্ষাকালে তাদের জমি কোনো আয়বর্ধক কাজে ব্যবহার করতে পারতেন না। এলাকায় প্রাকৃতিক উপায়ে যে সামান্য মাছ উৎপাদিত হতো তা দিয়ে অল্প কিছু টাকা তারা আয় করতে পারতেন। কিন্তু এখন পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করার ফলে তাদের এলাকায় মাছের উৎপাদন অনেকগুণ বেড়ে গেছে। এ প্রকল্প থেকে তারা প্রচুর পরিমাণ অর্থ আয় করছেন। এলাকায় প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষের যেসব প্রকল্প গড়ে উঠেছে তা থেকে বছরে গড়ে ৪০০ কোটি টাকার মাছ উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমবায়ের ভিত্তিতে প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ করছে। এ ছাড়া অনেকে ব্যক্তিতগত উদ্যোগেও এভাবে মাছ চাষ করছেন।

দাউদকান্দি এলাকায় প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ প্রকল্পের কারণে এক ধরনের কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু এলাকার সব মানুষই ন্যায্যতার ভিত্তিতে এসব প্রকল্প থেকে মুনাফা পাচ্ছেন তাই তারা নিজেরাই এ প্রকল্প দেখাশোনা করছেন। কোনো প্রকল্প থেকেই মাছ চুরি হয় না। কারণ এটি তাদের নিজেদের সম্পত্তি বলেই তারা মনে করেন। আগে এলাকায় যারা চুরি-ডাকাতি বা অন্যান্য সমাজবিরোধী বৃত্তি গ্রহণ করে জীবিকা নির্বাহ করত, এখন তারা সেই কাজ ছেড়ে দিয়ে মাছ চাষে মনোযোগী হয়েছে। এলাকায় এখন চুরি-ডাকাতি হয় না বললেই চলে। প্রকল্প এলাকার সাধারণ অংশীদারদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বলেন, আগে আমাদের আয়-রোজগার ছিল খুবই কম। এখন মাছ চাষের কল্যাণে আমাদের আর্থিক অবস্থা আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। এলাকায় অভাব-অনটন অনেকটাই দূর হয়েছে। অনেক বাড়িতেই নতুন টিনের ঘর উঠতে দেখা যায়। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হচ্ছে, এ প্রকল্পের অংশীদাররা বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে মাছ কিনে তাদের দৈনন্দিন আমিষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে। এলাকার মানুষের মাঝে রোগ-শোকের প্রবণতাও আগের চেয়ে কমে গেছে।

প্রকল্প এলাকার বাঁধের উপর নানা জাতের ফলের গাছ রোপণ করা হয়েছে। এসব গাছ থেকে যে ফল উৎপাদিত হয় তা দিয়ে এলাকার মানুষের ফলের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। প্রকল্পভুক্ত এলাকার মানুষ এখন কোনো কাজের জন্যই কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকে না। তারা নিজেরাই রাস্তাঘাট মেরামত করছে। প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ প্রকল্পে কোনো কৃত্রিম সার অথবা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। ফলে এলাকার জমির স্বাভাবিক গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকছে। কচুরিপানা বা ফসলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এ ধরনের কোনো উদ্ভিদ প্রকল্প এলাকায় জন্মাতে দেয়া হয় না। এতে পরবর্তী মৌসুমে ধান চাষের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। উপরন্তু নানা জাতের স্থানীয় ও বিদেশি পাখি এসব প্রকল্পে খাবার গ্রহণ করার জন্য আশ্রয় নেয়। ফলে তাদের পরিত্যক্ত বিষ্ঠা ও খাবার প্রকল্প এলাকার জমির উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। এতে ধান আবাদ মৌসুমে জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের তেমন কোনো প্রয়োজন পড়ে না। প্রকল্প এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনমান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এলাকায় দোকানপাট গড়ে উঠেছে। যুবক শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা এসব প্রকল্পে শ্রম দিচ্ছে। কেউ বা মাছ পাহারা দিচ্ছে। এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত উন্নত হয়েছে।

শিসউকের নির্বাহী পরিচালক জানান, এলাকার মানুষ তাদের সঙ্গে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। ফলে তাদের পক্ষে এ ধরনের ব্যতিক্রমী প্রকল্প পরিচালনা করতে মোটেও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, আগামীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ প্রকল্প সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় তারা ইতিমধ্যে দেশের ৮টি জেলায় প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামীতে দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে চান। প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া গেলে বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের প্রকল্প স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। অনেকেই এ প্রকল্প সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আসছেন। তিনি আরও জানান, প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ প্রকল্পের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের আমিষের অভাব পূরণ করা সম্ভব। দাউদকান্দি এলাকায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের মাঝে প্রোটিনের অভাবজনিত রোগের প্রবণতা আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও নিচু অনেক জমি বর্ষাকালে পতিত থাকে। এগুলোয় প্রাকৃতিক উপায়ে কিছু মাছ করা সম্ভব হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু তার পরিমাণ খুবই কম। অথচ এগুলোকে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষের আওতায় আনা গেলে দেশে মাছ উৎপাদনে বিপ্লব সাধিত হতে পারে। আগামীতে দেশে মাছ তথা আমিষের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। সেই বর্ধিত চাহিদা পূরণের একটি সহজ পন্থা হতে পারে প্লাবন ভূমিতে মাছ চাষ। এটা একান্তভাবেই বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবন। এ উদ্ভাবনের সুফল যাতে সবাই ভোগ করতে পারে, তারা সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, সাকিউল মিল্লাত মোর্শেদ মাছ চাষে বিশেষ সাফল্য প্রদর্শন করায় জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক লাভ করেছেন।

এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক